স্পোর্টস ডেস্ক : ফুটবল এমন একটি খেলা, যাতে ২২ জন ৯০ মিনিট ধরে খেলে এবং শেষমেষ জার্মানি জেতে - ইতালিতে অনুষ্ঠিত ১৯৯০ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পশ্চিম জার্মানির কাছে হারের পর, হতাশ হয়ে এই মন্তব্যটি করেছিলেন ইংল্যান্ডের খেলোয়াড় গ্যারি লিনেকার।
ফুটবলের মাঠে জার্মানদের শারীরিক ও মানসিক দৃঢ়তা, কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্ব এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করার অবিশ্বাস্য ক্ষমতাকে নির্দেশ করতে এরপর এই উক্তিটি বহুবার ব্যবহার করা হয়েছে।
তবে, চারবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানির (তিনবার পশ্চিম জার্মানি নামে) জন্য সাম্প্রতিক সময়টা বেশ খারাপই যাচ্ছে। ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে দাপটের সাথে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর গত দুই আসরেই ইউরোপের এই পরাশক্তিটি প্রথম রাউন্ডেই বাদ পড়েছে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ আটবার ফাইনাল খেলে জার্মানি এর আগে মাত্র একবারই প্রথম রাউন্ডে বাদ পড়েছিলো, সেই ১৯৩৮ সালে, যখন দেশটিতে ছিল হিটলারের শাসন। ----- বিবিসি বাংলা
লিনেকারের উক্তিটি জার্মানি বহুবার প্রমাণ করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধংসস্তূপের উপর দাঁড়িয়ে ১৯৫৪ সালে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল সে যুগের সেরা দল হাঙ্গেরিকে ফাইনালে হারিয়ে। এর ২০ বছর পর আরেকটা ফাইনাল জেতে আধুনিক টোটাল ফুটবলের প্রতিষ্ঠাতাকারী দেশ নেদারল্যান্ডসকে পরাজিত করে।
ফলে, জার্মান সমর্থকেরা আশা করবেন যে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে জার্মানি আবার ঘুরে দাঁড়াবে। আর, এই ঘুরে দাঁড়ানোটা হবে ৩৯ বছর বয়সী কোচ হুলিয়ান নাগেলসম্যানের পরিচালনায়।
বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে একাধিক লীগ জেতা নাগেলসম্যানকে ধরা হয় ইউরোপের অন্যতম কোচিং প্রতিভা হিসেবে, যিনি অল্প বয়স থেকেই আধুনিক জার্মান ফুটবল দর্শনের একজন মনোযোগী ছাত্র। তার কৌশলের মূল ভিত্তি হচ্ছে হাই প্রেসিং, কৌশলগত নমনীয়তা, অবস্থানগত ফ্লুইডিটি এবং আক্রমণাত্মক কাউন্টার-প্রেসিং। ফলে জার্মানি দলটি এখন আধুনিক বুন্দেসলিগার তীব্রতা ও পজিশনাল ফুটবলের একটি সফল হাইব্রিড।
আর এই তীব্র গতিসম্পন্ন এবং বুদ্ধিদীপ্ত ফুটবল খেলার জন্য দরকার গতি এবং ম্যাচ রিড করতে পারার ক্ষমতা। নাগেলসম্যান ও জার্মানির জন্য সৌভাগ্য যে, তাদের দলে রয়েছেন দুইজন তরুণ প্রতিভা যারা এই কাজটি করতে পারঙ্গম।
জামাল মুসিয়ালা ও ফ্লোরিয়ান ভির্টজ কেবল দুইজন বিশ্বসেরা ফুটবলারই নন, তাদের মধ্যে রসায়নটাও জমাট। নাগেলসম্যান চাইবেন, এই দুইজনকে পরিকল্পনার কেন্দ্রে রেখে অর্কেস্ট্রার মতো একটি দল হয়ে উঠতে।
নাগেলসমানের জার্মানি কোনো নির্দিষ্ট ফর্মেশনে আটকে থাকে না। তারা মূলত ৪-২-৩-১ বা ৪-৩-৩-এ খেলে, কিন্তু খেলার প্রবাহ অনুসারে সহজেই ৩-৪-২-১ বা ৩-২-৫-এ রূপান্তরিত হয়।
পজেশনে থাকাকালীন ফুলব্যাকরা উঁচুতে উঠে যান, মিডফিল্ডাররা গতিশীলভাবে ঘোরাফেরা করেন, মুসিয়ালা ও ভির্টজ ভেতরের দিকে ড্রিফট করেন এবং স্ট্রাইকার প্রায়ই নিচে নেমে লিংক-আপ খেলেন। এই ফ্লুইডিটি জার্মানির আক্রমণকে বহুমাত্রিক করে তোলে।
পজেশন হারানোর পর দলটি দ্রুত কমপ্যাক্ট হয়ে উঠে এবং হাই প্রেসিংয়ের মাধ্যমে বল পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করে। এই কাউন্টার-প্রেসিং তাদের আক্রমণাত্মক দর্শনের মূল চালিকাশক্তি।
জার্মানির আক্রমণভাগ সম্ভাবনাময় হলেও পরীক্ষিত নয়।
নাগেলসমান দ্রুত ট্রানজিশন এবং পজিশনাল ফ্লুইডিটির উপর জোর দিয়েছেন। ফলে দলটি ছোট পাসিং কম্বিনেশন, ওয়ান-টু ওয়ান খেলা এবং লাইনের মাঝে সৃজনশীলতায় দক্ষ। তবে স্ট্রাইকার সমস্যা এখনও অমীমাংসিত।
কাই হাভার্টজের মুভমেন্ট ও লিংক-আপ ভালো, কিন্তু পেনাল্টি বক্সে ফিনিশিংয়ের ঘাটতি রয়েছে। ডেনিজ উন্ডাভ শক্তিশালী শারীরিক উপস্থিতি দিতে পারেন,ডর্ট্মুন্ডের তরুণ স্ট্রাইকার ম্যাক্সিমিলিয়ান বেইয়ার ও নিউক্যাসলের নিক ওল্টেমাডে নাগেলসমানের ফ্লুইড দর্শনের সাথে তাদের পুরোপুরি মানিয়ে নিতে কতটুকু পারবেন তা দেখার বিষয়।
জার্মানির রক্ষণাত্মক কৌশলও উচ্চ ঝুঁকির উপর নির্মিত। অ্যান্টোনিও রুডিগার, জোনাথন তাহ ও নিকো শ্লটারবেকের মতো সেন্টার-ব্যাকরা আগ্রাসন, এরিয়াল ডুয়েল এবং বল বিল্ড-আপে দক্ষ। কিন্তু ট্রানজিশন ডিফেন্স তাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। হাই প্রেসিং করতে গিয়ে পেছনে অনেক ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়। দ্রুত গতির উইঙ্গার ও ফরোয়ার্ডযুক্ত দলগুলো এই স্পেস সহজেই কাজে লাগাতে পারে।
ফুলব্যাকদের আক্রমণাত্মক ভূমিকা আরও ঝুঁকি বাড়ায়।
জোশুয়া কিমিখের হাইব্রিড রোল আক্রমণকে সমৃদ্ধ করে, কিন্তু রক্ষণাত্মক ভারসাম্য নষ্ট করে। আর, জার্মানির জন্য বড় সমস্যা হয়ে উঠতে পারে গোলকিপিং। দিনের পর দিন দলের ভরসার প্রতীক ম্যানুয়েল নয়ার এই দলে আছেন, কিন্তু তার বয়স ৪০ ছুঁয়েছে। ফর্মটাও আগের মতো নেই।
হফেনহাইমে খেলা অলিভিয়ার বাউম্যানের বয়সও ৩৫ আর দলের অন্য গোলকিপার আলেকজান্ডার নুবেল বায়ার্ন মিউনিখ দলে সুযোগ না পেয়ে গত ছয় মৌসুম ধারে খেলেছেন মোনাকো এবং স্টুটগার্টের হয়ে।
তবে, জার্মানির সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো জামাল মুসিয়ালা ও ফ্লোরিয়ান ভির্টজের জুটি। ফুটবলবিশ্বে যাদেরকে "Wusiala" বা উইসিয়ালা নামে ডাকা হয়। এই জুটির সৌন্দর্য তাদের পরিপূরকতায়।
জামাল মুসিয়ালা হলেন বিশৃঙ্খলার স্রষ্টা। সংকীর্ণ জায়গায় তার অসাধারণ ড্রিবলিং, প্রেস প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং অপ্রত্যাশিত গতিবিধি যেকোনো সংকুচিত ডিফেন্সকে ভেঙে দিতে পারে। তিনি শুধু একজন খেলোয়াড় নন, পুরো সিস্টেমের অস্থিতিশীলকারী।
অপরদিকে ভির্টজ হচ্ছেন সৃজনশীলতার নিয়ন্ত্রক। তার অসাধারণ সময়জ্ঞান, পজিশন সেন্স, ফাইনাল পাস এবং কম্বিনেশন খেলা মুসিয়ালার তৈরি করা বিশৃঙ্খলাকে গোলের সুযোগে রূপান্তরিত করে। দুজনের রসায়ন এতটাই প্রাকৃতিক যে, তারা মাঠে একে অপরের চোখের ইশারাতেই খেলতে পারেন।
তবে ২০২৬ সালে তাদের বয়স মাত্র ২৩ বছরের কাছাকাছি হবে। এখনো তাদের শীর্ষ সময় আসেনি। যদি তারা সুস্থ থাকেন এবং সেরা ফর্মে খেলেন, তাহলে এই জুটি এই বিশ্বকাপে না হোক এরপরের আসরগুলোতে জার্মানিকে আবার ফেভারিট হিসেবে গণ্য করতে বাধ্য করাবে।