শিরোনাম
◈ আইসি‌সি‌তে কানাডার সদস্যপদ স্থগিত, ত‌বে খেলায় অংশ নি‌তে পার‌বে  ◈ ইউরোপের বাকস্বাধীনতা বিতর্ক: কার জন্য স্বাধীনতা, কার জন্য শাস্তি? ◈ তিন কোটি খুচরা ব্যবসায়ীকে করের আওতায় আনছে এনবিআর ◈ বাংলা‌দেশ দ‌লের অ‌ধিনায়ক জ্যো‌তি রোমাঞ্চকর বিশ্বকাপ যাত্রার অপেক্ষায়   ◈ বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ তোফায়েল আহমেদ মারা গেছেন ◈ লেবাননের হিজবুল্লাহর হামলায় ধ্বংস ইসরাইলের আয়রন ডোম ◈ সরকারের বিরুদ্ধে এখনও চক্রান্তের জাল বিস্তার করার চেষ্টা চলছে: রিজভী  ◈ ধর্ষণ করি নাই, শুধু লাশ কেটেছি, ধর্ষণ করেছে ডলার, মেয়েটাকে এনে দিলে দুই লাখ টাকা দিবে: রামিসা হত্যার প্রধান আসামি সোহেল ◈ পুনরায় ওমরাহ ভিসার আবেদন গ্রহণ ও ইস্যু কার্যক্রম শুরু করেছে সৌদি আরব ◈ ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা ফের সচল ইরানের ‘মিসাইল সিটি’, ইরানকে থামানো কতটা কঠিন তা দেখাল নতুন তথ্য

প্রকাশিত : ০১ জুন, ২০২৬, ০২:২৮ দুপুর
আপডেট : ০১ জুন, ২০২৬, ১০:০০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা ফের সচল ইরানের ‘মিসাইল সিটি’, ইরানকে থামানো কতটা কঠিন তা দেখাল নতুন তথ্য

ইরানের পুনরুদ্ধার করা মিসাইল ঘাঁটি, ব্যর্থতার ইঙ্গিত মার্কিন বোমা হামলা কৌশলে

ইরান দ্রুততার সঙ্গে মাটিচাপা পড়ে যাওয়া অস্ত্রভান্ডারগুলো পুনরুদ্ধার করেছে। ফলে দেশটি এখন আবারও ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের দিকে আবারও অনেক বেশি দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার অবস্থানে পৌঁছে গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের বোমাবর্ষণভিত্তিক কৌশলের সীমাবদ্ধতাও সামনে এনেছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের খবরে বলা হয়েছে, কয়েক সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের হামলায় ইরানের ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্রঘাঁটিগুলোতে প্রবেশের পথ সীমিত হয়ে পড়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল এসব ঘাঁটিতে যাওয়ার সড়ক ধ্বংস করে এবং সুড়ঙ্গের প্রবেশমুখ মাটিচাপা দেয়।

তবে সিএনএনের পর্যালোচনা করা স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, ইরান ব্যয়বহুল ওই সামরিক অভিযানের ফলাফল মোকাবিলায় বুলডোজার ও ডাম্প ট্রাকের মতো সাধারণ নির্মাণযন্ত্র ব্যবহার করেই সফলতা পেয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে বোঝা যায় যে—শুধু সুড়ঙ্গের প্রবেশমুখ লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করা সম্ভব নয়।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত রাখার বিষয়ে একটি প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছালেও চূড়ান্ত বিস্তারিত বিষয়গুলো ঠিক করতে এখনো কয়েক মাস কাজ করতে হবে। এই অবস্থায় যদি আবার সংঘাত শুরু হয়, তাহলে ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন বন্ধ থাকলেও ইরানের হামলা চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা থাকবে।

মার্কিন থিংক ট্যাংক জেমস মার্টিন সেন্টার ফর ননপ্রলিফারেশন স্টাডিজের গবেষণা সহযোগী এবং ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বিশ্লেষক স্যাম লেয়ার বলেন, ‘যতক্ষণ তাদের কাছে লঞ্চার ও সেগুলো পরিচালনার জন্য কর্মী থাকবে, ততক্ষণ তারা ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে পারবে। ইরানের হাতে এখনো যে বিপুল ক্ষেপণাস্ত্র মজুত রয়েছে, তা লঞ্চারগুলোতে বসিয়ে ব্যবহার করতে কোনো বাধা নেই।’

যুদ্ধ চলাকালে ইরান অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ খননের কাজ চালিয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল প্রায়ই খননকাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতিতেও হামলা চালাত। তবুও এই প্রচেষ্টার ফলে তেহরান পুরো যুদ্ধকালেই ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে সক্ষম হয়েছিল, যদিও সেই হার ছিল অনেক কম। সাত সপ্তাহেরও বেশি আগে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ভূগর্ভস্থ ঘাঁটিগুলো পুনরুদ্ধারের কাজ উল্লেখযোগ্যভাবে দ্রুত হয়েছে।

সিএনএনের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল ১৮টি ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনায় মোট ৬৯টি সুড়ঙ্গ প্রবেশমুখে হামলা চালিয়েছিল। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত ৫০টি পুনরায় খুলে ফেলেছে ইরান। ইরান ঘাঁটির অন্যান্য অংশও মেরামত করেছে। ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার চলাচল ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যেসব সড়কে বোমা হামলা চালিয়েছিল, সেগুলোও পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, অধিকাংশ গর্তই মাটি দিয়ে ভরাট করা হয়েছে এবং দুটি স্থানে নতুন করে পিচ ঢালাইও করা হয়েছে।

লেয়ার বলেন, ‘মার্কিন সামরিক বাহিনী কৌশলগত পর্যায়ে সাফল্য অর্জনে দক্ষ, আর ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনীকে মাটিচাপা দিয়ে কার্যক্রম সীমিত করে দেওয়া তার একটি ভালো উদাহরণ। কিন্তু যদি এর সঙ্গে বাস্তবসম্মত যুদ্ধলক্ষ্য এবং অর্জনযোগ্য বিজয়কৌশল না থাকে, তাহলে সেই সাফল্য শেষ পর্যন্ত কৌশলগত ব্যর্থতায় পরিণত হতে পারে।’

যুদ্ধের একটি প্রধান লক্ষ্য

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার বলেছেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডারই যুদ্ধের অন্যতম কারণ এবং সেটি ধ্বংস করা ছিল প্রধান লক্ষ্যগুলোর একটি। মার্চ মাসে ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্পের উল্লেখ করা যুদ্ধের পাঁচটি ‘লক্ষ্যে’র একটি ছিল, ‘ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা, লঞ্চার এবং এ-সংক্রান্ত সবকিছু সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করা।’

দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে গড়ে তোলা ইরানের ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্রঘাঁটির নেটওয়ার্ক ক্ষেপণাস্ত্র ও লঞ্চারগুলোকে উল্লেখযোগ্য সুরক্ষা দেয়। কিছু স্থাপনা শত শত মিটার পুরু শিলাস্তরের নিচে অবস্থিত হওয়ায় সেগুলোতে হামলা চালানোর ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর বিকল্প সীমিত।

তাই সংঘাতের প্রথম দিকেই দুই দেশ ঘাঁটির প্রবেশমুখ লক্ষ্য করে হামলা শুরু করে। একই সঙ্গে তারা ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার শনাক্ত ও ধ্বংসের চেষ্টাও চালায়। এর ফলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এই হামলায় ঘাঁটিগুলো ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অধিকাংশ সুড়ঙ্গের প্রবেশমুখ ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে এবং ঘাঁটিগুলোর দিকে যাওয়া সড়ক ভেঙে যায়।

সে সময় সিএনএনের পর্যালোচিত স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গিয়েছিল, গুরুত্বপূর্ণ ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা ইস্পাহান নর্থ মিসাইল বেস একাধিক হামলায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সুড়ঙ্গগুলো ধ্বংসস্তূপে ঢেকে গেছে এবং বাইরে থাকা লঞ্চারগুলো ধ্বংস হয়েছে।

এ ছাড়া ক্ষুদ্র ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানা থেকে শুরু করে রকেটের জ্বালানি ও ক্ষেপণাস্ত্রের মূল কাঠামো তৈরির কেন্দ্র পর্যন্ত ইরানের পুরো ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহব্যবস্থা ধ্বংস করার জন্যও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ব্যাপক অভিযান চালায়। ৮ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার পর মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, ইরান এখন ‘নিজেদের অবশিষ্ট লঞ্চার ও ক্ষেপণাস্ত্র মাটি খুঁড়ে বের করছে, কিন্তু সেগুলোর বিকল্প তৈরির কোনো সক্ষমতা নেই। আপনাদের আর কোনো প্রতিরক্ষা শিল্প নেই।’

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ইরানের ভূগর্ভস্থ ঘাঁটিগুলোতে এখনো প্রায় ১ হাজার ক্ষেপণাস্ত্র মজুত রয়েছে। তাদের মতে, মাটির অনেক গভীরে সংরক্ষিত এই মজুত ভান্ডার ভূ-পৃষ্ঠে চালানো হামলায় খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা নেই। বিশেষ করে গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধের সময়ও ইসরায়েল একই পদ্ধতিতে সুড়ঙ্গের প্রবেশমুখে হামলা চালিয়েছিল।

জার্মানির হামবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর পিস রিসার্চ অ্যান্ড সিকিউরিটি পলিসির জ্যেষ্ঠ গবেষক এবং ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বিশ্লেষক তিমুর কাদিশেভ বলেন, ‘তারা ২০ বছর ধরে এ ধরনের যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েছে। তারা অত্যন্ত প্রস্তুত।’

দ্রুত মেরামতের অভিযান

ঘাঁটিগুলো পুনরায় চালু করতে ইরান বিভিন্ন ধরনের নির্মাণ ও মাটি অপসারণকারী যন্ত্র ব্যবহার করেছে। স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যায়, ফ্রন্ট-এন্ড লোডার ধ্বংসস্তূপ সরাচ্ছে এবং ডাম্প ট্রাক গর্তগুলো মাটি দিয়ে ভরাট করছে। ইস্পাহানের বাইরে একটি ঘাঁটিতে যুদ্ধ চলাকালে চারটি সুড়ঙ্গের প্রবেশমুখ বন্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একাধিক হামলা চালায়। দুটি প্রবেশমুখের কাছে অন্তত ১৮টি বড় গর্ত দেখা যায়, যা প্রমাণ করে সুড়ঙ্গ বন্ধ করতে কত বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ ব্যবহার করা হয়েছিল।

মে মাসের শুরুতে তোলা একটি স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যায়, একটি ডাম্প ট্রাক গর্তগুলো ভরাট করছে। অন্য দুটি প্রবেশমুখ, যেগুলোও আগে গর্ত ও ধ্বংসস্তূপে আটকে ছিল, সেগুলো ইতোমধ্যে খুলে ফেলা হয়েছে। বোমা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলোও নতুন করে পাকা করা হয়েছে। এপ্রিলের মাঝামাঝি খোমেইনের কাছে একটি ঘাঁটির ছবিতে দেখা যায়, অন্তত ১০টি নির্মাণযান একটি প্রবেশমুখ পুনরায় চালু করার কাজে নিয়োজিত।

ইরান যখন তার ক্ষেপণাস্ত্রগুলো পুনরুদ্ধার করছে এবং ঘাঁটিগুলোকে আবার কার্যকর করছে, তখন বিশ্লেষকেরা আশঙ্কা করছেন যে—এই অস্ত্রভান্ডার থেকে আসা হুমকিকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থার ইন্টারসেপ্টর মজুত কমে আসার প্রেক্ষাপটে এ উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

ক্ষেপণাস্ত্র কারখানাগুলোতে চালানো হামলাও তেহরানের উৎপাদন সক্ষমতা দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ রাখতে পারবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ১২ দিনের যুদ্ধের সময়ও এসব কারখানার কিছু অংশে হামলা হয়েছিল। যদিও সাম্প্রতিক হামলাগুলো ছিল আরও বিস্তৃত, স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে গত জুনে লক্ষ্যবস্তু হওয়া কিছু স্থাপনা ইতোমধ্যেই ইরান পুনর্নির্মাণ করে ফেলেছিল।

মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ইরান ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠনের কাজ শুরু করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ড্রোন উৎপাদন পুনরায় চালু করা, নতুন ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার সংগ্রহ করা এবং উৎপাদন সক্ষমতা পুনঃস্থাপন। এক মার্কিন কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, ‘পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে গোয়েন্দা সম্প্রদায় যে সময়সীমা অনুমান করেছিল, ইরান তার সবগুলোই অতিক্রম করেছে।’

কাদিশেভের মতে, এ ঘটনাই ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের জটিলতাকে স্পষ্ট করে তোলে। তিনি বলেন, ‘এ ধরনের ক্ষতি করতে অত্যন্ত উন্নত ও ব্যয়বহুল অস্ত্র ব্যবহার করতে হয়। অথচ পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়াটা খুবই নিম্নপ্রযুক্তিনির্ভর। সেখানে শুধু বুলডোজারই যথেষ্ট।’ অনুবাদ: আজকের পত্রিকা

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়