আম, কাঁঠাল, আমলকী, জলপাই কিংবা মাশরুম প্রক্রিয়াজাত হয়ে রূপ নিচ্ছে চিপস, আচার, চাটনি, মোরব্বা, বার্গার, কাবাব, ফ্রেশ কাটসহ নানা ধরনের খাদ্যপণ্যে। অল্প পুঁজি ও ঘরে বসে শুরু করা এসব উদ্যোগে গত কয়েক বছরে তৈরি হয়েছে কয়েক হাজার উদ্যোক্তা। অনলাইনভিত্তিক বিপণন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে দেশে ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে খাদ্য প্রক্রিয়ায় এক নতুন অর্থনীতি। সূত্র: বিডি প্রতিদিন
শুধু দেশীয় বাজার নয়, বাংলাদেশের প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের চাহিদা তৈরি হচ্ছে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশের বাজারেও। তৈরি পোশাকের পর সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাত হিসেবে উঠে আসার সক্ষমতা রয়েছে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যশিল্পের। কৃষিপণ্যের অপচয় কমিয়ে একই সঙ্গে কৃষকের আয়, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন বাড়ানোর বড় সুযোগ তৈরি করছে এ শিল্প।
এই সম্ভাবনার পেছনে রয়েছে অসংখ্য ছোট উদ্যোক্তার ব্যক্তিগত সংগ্রাম। মো. মেহেদী হাসানের গল্পটিও তেমনই। মেহেদী হাসান বলেন, মাকে বাঁচানোর জন্য অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্তু পারিনি। সেই কঠিন সময়েই মাশরুমকে ঘিরে নতুন স্বপ্ন দেখি। বর্তমানে তাঁর প্রতিষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ মাশরুমের চিপস। বাংলাদেশে নিজস্ব উদ্ভাবনে চারটি ফ্লেভারে পণ্যটি বাজারজাত করছেন তিনি। তাঁর মতে, ফুড প্রসেসিংয়ের মাধ্যমে দেশের হাজারো তরুণ-তরুণী এখন স্বাবলম্বী হওয়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছেন।
মাশরুমের মতোই সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলেছে দেশের জাতীয় ফল কাঁঠালকে ঘিরে। একসময় মৌসুমে বিপুল পরিমাণ কাঁঠাল অবিক্রীত থেকে নষ্ট হলেও এখন এই ফল থেকে তৈরি হচ্ছে চিপস, ফ্রেশ কাট, আচার, বার্গারসহ অন্তত ৩০ ধরনের প্রক্রিয়াজাত পণ্য। এর একটি অংশ ইতোমধ্যে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন বাজারে রপ্তানি হচ্ছে।
কাঁঠালভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান প্রসপারিটির উদ্যোক্তা আসমা বলেন, বাংলাদেশে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ কাঁঠাল অপচয় হয়। তাঁর ভাষ্য, এই অপচয় ঠেকিয়ে একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের বড় সুযোগ তৈরি করছে ফুড প্রসেসিং শিল্প। তিনি বলেন, এমন দিনও গেছে, একদিনে ৫০০ কেজি কাঁচা কাঁঠাল বিক্রি করেছি। কাঁঠালের শিঙাড়া, সমুচা, চিপসসহ বিভিন্ন পণ্যের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে বলেও জানান তিনি।
শুধু কাঁঠাল নয়, দেশীয় ফলের বহুমুখী ব্যবহারে তৈরি হচ্ছে আরও নানা ধরনের পণ্য। আমলকী, জলপাই, আম ও রসুন থেকে তৈরি আচার, চাটনি ও মোরব্বার বাজারও বাড়ছে। একই সঙ্গে কাঁঠালের কাবাব, পাকোড়া, নকশি পিঠা, হালুয়া, সাসলিকসহ নানা উদ্ভাবনী খাদ্যপণ্য ক্রেতাদের আকৃষ্ট করছে।
খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতের বিস্তারে বড় ভূমিকা রাখছে অনলাইন ব্যবসা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। আগে খাদ্যপণ্য উৎপাদনের জন্য বড় কারখানা, বিপুল পুঁজি ও নিজস্ব বিপণনব্যবস্থা প্রয়োজন হলেও এখন ছোট পরিসরে উৎপাদন করে ফেসবুক, ওয়েবসাইট ও অন্যান্য অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পণ্য বিক্রি করছেন উদ্যোক্তারা।
ফুড প্রসেসিংয়ের সম্ভাবনা শুধু উদ্যোক্তাদের উদ্যোগে সীমাবদ্ধ নেই; গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোও দেশীয় কৃষিপণ্যকে নতুন খাদ্যপণ্যে রূপ দেওয়ার কাজ করছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) কাঁঠাল থেকে তৈরি করেছে ‘ভেজিটেবল মিট’, যা মাংসের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
প্রতিষ্ঠানটির বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তাদের মতে, প্রক্রিয়াজাত ফল, শুকনো ফল, চিপস, কাঁঠাল ও মাশরুমজাত বিভিন্ন পণ্য ইতোমধ্যে বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে বড় পরিসরে প্রবেশের জন্য সঠিক সংরক্ষণব্যবস্থা, আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা জরুরি।
উদ্যোক্তারা বলছেন, কৃষিপণ্যের মৌসুমি উৎপাদন, সংরক্ষণের সীমাবদ্ধতা, আধুনিক যন্ত্রপাতির উচ্চমূল্য, মান নিয়ন্ত্রণ, প্যাকেজিং এবং রপ্তানির জটিলতা এখনো এ খাতের বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে কৃষকের উৎপাদন থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাতকরণ ও আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছানো পর্যন্ত একটি সমন্বিত সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এসব সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারলে ফুড প্রসেসিং শুধু উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রই হবে না; এটি কৃষিপণ্যের অপচয় রোধ, কৃষকের আয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম শক্তিশালী খাতে পরিণত হতে পারে।
তাদের মতে, তৈরি পোশাকের ওপর রপ্তানি নির্ভরতা কমিয়ে নতুন পণ্য ও নতুন বাজার তৈরির যে প্রয়োজন বাংলাদেশে তৈরি হয়েছে, ফুড প্রসেসিং শিল্প সেখানে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। প্রয়োজন শুধু নীতিসহায়তা, আধুনিক প্রযুক্তি, মান নিয়ন্ত্রণ, সহজ অর্থায়ন এবং রপ্তানি সুবিধা নিশ্চিত করা।