স্পোর্টস ডেস্ক : ইরান ইঙ্গিত দিয়েছে যে তারা এই গ্রীষ্মের বিশ্বকাপে থাকবে, তবে টুর্নামেন্টে তাদের অংশগ্রহণ ঘিরে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার কারণে আন্তর্জাতিক ফুটবল ফেডারেশন (ফিফা) এবং আয়োজক দেশের কাছে তারা বেশ কয়েকটি বিষয়ে নিশ্চয়তা দাবি করেছে।
ফুটবল ফেডারেশন অব ইরান (এফএফআইআরআই) স্পষ্ট করেছে যে তারা "নিজেদের বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও প্রত্যয় বিসর্জন না দিয়ে" বিশ্বকাপে অংশ নেবে, পাশাপাশি তারা উল্লেখ করেছে, যে যে দেশে তারা ম্যাচ খেলবে সেই যুক্তরাষ্ট্রকে "অবশ্যই আমাদের উদ্বেগের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে। গত মাসে ফিফা কংগ্রেসে অংশ নিতে এফএফআইআরআই সভাপতি মেহেদি তাজকে কানাডায় প্রবেশে বাধা দেওয়ার পর এই দাবিগুলো করা হয়। --- বিবিসি বাংলা
তাজ জানিয়েছেন যে আগামী ১১ জুন যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডায় শুরু হতে যাওয়া বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের জন্য ইরান ফিফার কাছে দশটি শর্ত উপস্থাপন করেছে।
গত সপ্তাহের শেষে প্রকাশিত এসব দাবির মধ্যে অন্যতম হলো, দলের সাথে ভ্রমণকারী সকল খেলোয়াড়, কোচ এবং কর্মকর্তাদের যথাযথ ভিসা প্রদান নিশ্চিত করা। এর মধ্যে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরকে (আইআরজিসি) বাধ্যতামূলক সামরিক দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তিরাও রয়েছেন। এই বাহিনীটি কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর তালিকায় রয়েছে এবং আইআরজিসির সাথে তাজের সম্পর্কের কারণেই তাকে কানাডায় প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়েছিল। বিশ্বকাপ চলাকালীন বিমানবন্দরে, হোটেলে ও স্টেডিয়ামে নিরাপত্তা এবং ইরানের পতাকা ও জাতীয় সঙ্গীতের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের মতো দলটির প্রাপ্য আচরণের বিষয়েও ইরান নিশ্চয়তা চাইছে।
ফিফা ইভেন্টের লজিস্টিকস, আনুষ্ঠানিক প্রোটোকল এবং প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া প্রতিনিধি দলের সাথে আচরণের বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। তবে ভিসা, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলো আয়োজক দেশের—এই ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের—অধিকারভুক্ত।
ইরান তাদের ম্যাচগুলো ক্যালিফোর্নিয়ার ইঙ্গলউড এবং সিয়াটল শহরে খেলবে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইতোমধ্যেই বলেছেন যে টুর্নামেন্টে ইরানি ফুটবল খেলোয়াড়দের স্বাগত জানানো হবে, তবে তিনি সতর্ক করেছেন যে আইআরজিসির সাথে সম্পর্কযুক্ত ব্যক্তিরা এখনও যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধের সম্মুখীন হতে পারে।
এর ফলে যোগ্যতা অর্জনকারী সকল দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার সম্পর্ককে ঘিরে রাজনৈতিক বাস্তবতার সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার মধ্যে ফিফাকে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখার মতো পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়েছে।
গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর ব্যাপক হামলা চালায়। ইরানও এর জবাবে উপসাগরীয় অঞ্চলে ইসরায়েল ও মার্কিন মিত্রদের ওপর বোমা হামলা করে। এরপর থেকে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির অধীনে মূলত যুদ্ধ বন্ধ রয়েছে। তবে ইরানি ফেডারেশনের অন্য কিছু অনুরোধ বাস্তবে কার্যকর করা কঠিন হতে পারে। জানা গেছে, ইরানি কর্মকর্তারা সাংবাদিকদের "ফুটবলের প্রযুক্তিগত বিষয়" এর বাইরে অন্য কোনো প্রশ্ন না করতে অনুরোধ করেছেন।
কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে প্রায়শই ফুটবল এবং রাজনীতির মধ্যকার সীমানা অস্পষ্ট হয়ে যায়। দল নির্বাচন, জাতীয় দলের প্রতি জনসমর্থন বা ম্যাচগুলোকে ঘিরে থাকা পরিবেশ সম্পর্কে প্রশ্নগুলোর একই সাথে ক্রীড়া এবং রাজনৈতিক উভয় মাত্রাই থাকতে পারে।
মার্চ মাসে অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিত মহিলা এশিয়ান কাপে এর প্রমাণ পাওয়া যায়, যখন বেশ কয়েকজন ইরানি খেলোয়াড় আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করলে তীব্র কূটনৈতিক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। দলের সাতজন সদস্য অস্ট্রেলিয়ায় থাকাকালীন মানবিক ভিসা পেয়েছিলেন, তবে পাঁচজন মত পরিবর্তন করে ইরানে ফিরে যান।
ইরানের পুরুষ জাতীয় দলের কোচ আমির ঘালেনোয়ে সম্প্রতি স্বীকার করেছেন যে বিশ্বকাপে ইরানের কয়েকটি ম্যাচকে ঘিরে রাজনৈতিকভাবে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। উত্তেজনা সত্ত্বেও, ইরান এই টুর্নামেন্ট থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার কোনো ইঙ্গিত আপাতত নেই।
এর বিপরীতে, সাম্প্রতিক ঘটনাবলী ইতিহাসের বৃহত্তম বিশ্বকাপে ইরানের অংশগ্রহণের শর্তাবলী নিয়ে ফিফা, তেহরান এবং মার্কিন কর্তৃপক্ষের মধ্যে ক্রমশ জটিলতর আলোচনার দিকেই ইঙ্গিত করে।
অন্যান্য বিশ্বকাপে অনুপস্থিতি
ইরান স্পষ্ট করেছে যে তারা টুর্নামেন্টে যাবে যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি আক্রমণ শুরু হওয়ার সময় তারা অংশ না নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিল এবং ফিফা তাদের অংশগ্রহণকে সমর্থন করে। কিন্তু বিশ্বকাপের ইতিহাসে এমন বিশেষ ঘটনা রয়েছে যেখানে সশস্ত্র সংঘাত বা সামাজিক কারণে বিভিন্ন দল অংশ নিতে অস্বীকার করেছে অথবা তাদের অনুমতি দেওয়া হয়নি।
১৯৩৮ সালের বিশ্বকাপের জন্য আর্জেন্টিনা এবং উরুগুয়ের মতো দলগুলো অংশ নিতে অস্বীকার করেছিল কারণ ফিফা একটি দক্ষিণ আমেরিকান দেশকে আয়োজক হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েও শেষ পর্যন্ত তা ফ্রান্সকে দিয়েছিল। ১৯৫০ সালের বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে অন্যান্য দলগুলো প্রত্যাহার করে নেওয়ার কারণে ভারত যোগ্যতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু তারা এত দীর্ঘ সফর করে বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার মতো যোগ্য টুর্নামেন্ট হিসেবে বিবেচনা না করায় অংশগ্রহণ করেনি।
১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপে সব আফ্রিকান দেশ ইভেন্টটি বয়কট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কারণ তাদের টুর্নামেন্টে মাত্র অর্ধেক জায়গা দেওয়া হয়েছিল: মহাদেশীয় বাছাইপর্বে জয়ী দলকে একটি এশিয়ান দলের মুখোমুখি হতে হত।
এই টুর্নামেন্টের ইতিহাসেও সশস্ত্র সংঘাতের প্রভাব পড়েছে।
সবচেয়ে সাম্প্রতিক ঘটনা হলো রাশিয়ার, যারা ২০২২ সালে ইউক্রেনে আগ্রাসনের কারণে বর্তমানে ফিফা বা উয়েফা (ইউনিয়ন অব ইউরোপিয়ান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন) কোনো টুর্নামেন্টেই অংশ নিতে পারছে না।
১৯৯২ সালে বসনিয়া-হার্জেগোভিনা সংঘাতে ফেডারেল রিপাবলিক অফ যুগোস্লাভিয়ার (পরবর্তীতে সার্বিয়া ও মন্টিনিগ্রো নামে পরিচিত) সমর্থনের কারণে দেশটিকে নিষিদ্ধ করা হয় এবং তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে অংশ নিতে পারেনি।
আরেকটি অনুরূপ ঘটনা হলো দক্ষিণ আফ্রিকার, যাদের বর্ণবাদ নীতির কারণে প্রায় ৩০ বছর ধরে বিশ্বকাপ থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। ১৯৬১ সালে তাদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এবং ১৯৭৬ সালে কুখ্যাত সোয়েটো গণহত্যার কারণে ফিফা থেকে বহিষ্কৃত হওয়া প্রথম দেশে পরিণত হয় তারা, যে ঘটনায় ১৭৬ জন মারা গিয়েছিল, যাদের বেশিরভাগই ছিল কৃষ্ণাঙ্গ শিক্ষার্থী।