এল আর বাদল : আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ ১১ দলীয় জোটের আসন সমঝোতার রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। যদিও দলগুলোর দাবি, তারা কিছু সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পরে গত বছরের মে মাসে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশ, খেলাফত আন্দোলন এবং নেজামে ইসলাম পার্টির মতো ইসলামভিত্তিক দলগুলো জোট হিসেবে যাত্রা শুরু করে।
পরে এতে জাগপা ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি যোগ দিলে আট দলীয় জোট হিসেবে বিভিন্ন সময় যুগপৎ কর্মসূচিতে এসব দলকে রাজনীতির মাঠে সরব হতে দেখা গেছে। ---- বিবিসি বাংলা
এরই মধ্যে অভ্যুত্থানের পরে তরুণদের নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ আরো দুইটি দলের এই জোটে অংশ নেওয়ার পর ভোটের রাজনীতি নিয়ে আবারো আলোচনা - সমালোচনা দেখা দেয়। এই ১১ দলের মধ্যে আসন সমঝোতা নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
আকাঙ্ক্ষিত সংখ্যায় আসন না পাওয়ায় এই জোটের পুরাতন সঙ্গী ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ কয়েকটি দলের অসন্তোষ যেমন রয়েছে, তেমনি জোটের প্রার্থীদের আসন দিতে গিয়ে বিভিন্ন আসনে জামায়াতে ইসলামীর নিজ দলের নেতা-কর্মীদেরও মধ্যেও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। বিষয়টি স্বীকারও করেছেন জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি দলের নেতারা।
আসন সমঝোতার বাইরে, এই জোটের নেতৃত্ব নিয়ে তরুণদের দল এনসিপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ দুই দলের মধ্যে অনেকটা ঠাণ্ডা যুদ্ধও চলছে। এরই মধ্যে সব দলের প্রার্থীরাই বিভিন্ন আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।
যদিও কয়েকটি দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতারা বিবিসি বাংলার কাছে দাবি করেছেন, আলোচনা এখনও চলছে। সমঝোতা সমন্বয় করেই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য জোটের সব দল নীতিগতভাবে একমত হয়েছে।
কিন্তু দলীয় সূত্রগুলো বলছে, সমঝোতা সিদ্ধান্তে বিলম্ব এবং আপাতত যেসব আসনে সমঝোতার সিদ্ধান্ত হয়েছে সেগুলো নিয়ে মাঠ পর্যায়ের অসন্তোষ বেশ প্রকট।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী এককভাবে কখনো নির্বাচনে সফলতা লাভ করেনি বলে তাদের পরিধি বাড়িয়েছে। যাতে নির্বাচন বা ভোটের মাঠে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী বা শত্রুর সংখ্যা বৃদ্ধি না পায়।
রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন যে পর্যায়ে
বাংলাদেশে আগামী বারোই ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এ বছর একই দিনে গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে।
সারা দেশে ৩০০ আসনে তিন হাজার ৪০৬ টি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা হয়েছিল। কিন্তু দলীয় ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে মোট দুই হাজার ৫৬৮ টি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে।
নিজেদের দাবি অনুযায়ী কমপক্ষে দেড়শ আসন না পাওয়ায় চরমোনাই পীরের রাজনৈতিক দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ অসন্তুষ্ট বলে বাংলাদেশের গণমাধ্যমে বেশ কিছু খবর প্রকাশিত হয়।
দলীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, জোটের নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৩৫ টি আসনে নির্বাচন করতে নাখোশ দলটির নেতা-কর্মীরা। ফলে ৩০০ আসনের মধ্যে ২৭২ টি আসনেই মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে দলটি।
যেটি স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয় দলটি জোটের ভেতরে আসন বণ্টন নিয়ে শক্ত অবস্থান থেকে দর কষাকষি করতে চায় কিংবা এককভাবে নির্বাচন করে নিজেদের রাজনৈতিক সক্ষমতা আলাদাভাবে প্রমাণ করতে আগ্রহী।
কিন্তু কত আসন চেয়েছে এবং কতগুলো পেয়েছে এমন প্রশ্নে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এর মুখপাত্র ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমানের দাবি, আসন নিয়ে কোনো দাবি নাই তাদের।
মি. রহমান বলেন, "আমাদের কোনো দাবি নাই। আলোচনায় যৌক্তিকভাবে আমরা কিছু ক্রাইটেরিয়া ঠিক করছি। সেটার আলোকেই সমঝোতা সমন্বয় হবে।
নেতৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব?
কয়েকটি দলের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন নেতার দাবি, জোটে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় জামায়াতে ইসলামীর প্রাধান্য চোখে পড়ার মতো। যা নিয়ে অন্য দলের নেতাদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে।
যদিও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মুখপাত্র ও যুগ্ম মহাসচিব জালালুদ্দীন আহমেদের দাবি, "এখানে ১১টি দল আসন সমঝোতা করছে। এখানে কেউ কারো নেতৃত্বে না। অর্থাৎ ইলেকশনে আমরা বিজয়ী হওয়ার জন্য একটি আসনে একজন প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া হবে এটাই আমাদের পলিসি।"
এদিকে, এনসিপি জোটে যোগ দেওয়ার পর রাজনৈতিক আলোচনায় এমন বিষয়ও উচ্চারিত হয়েছে যে, জোট নেতৃত্বে জামায়াতে ইসলামীর শফিকুর রহমান নাকি এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম থাকবেন?
এমন প্রশ্নে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের দাবি করেন, এমন বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে কোনো ভুল বোঝাবুঝি নেই। এটা সেরকম কোনো জোট না।
সমঝোতার অগ্রগতি কতদূর?
নির্বাচনী সমঝোতার অংশ হিসেবে গত ২৮ শে ডিসেম্বর এনসিপি, এলডিপি এই জোটে যোগ দেয়। পরে এবি পার্টিরও যুক্ত হওয়ার খবর শোনা যায়।
জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতা মি. জুবায়ের আট দলের পূর্ব প্রেক্ষাপট উল্লেখ করে জানান, শেষ পর্যায়ে আরো তিনটি দল জোটে যোগ দেওয়ায় আলোচনা যে অবস্থায় ছিলো ওই অবস্থায়ই সকলের সম্মতিতে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
" গত মাসের নয় তারিখ থেকে আমরা আসন সমঝোতা নিয়ে আলোচনা আরম্ভ করলাম। শেষদিকে এসে আরো তিনটি দল আমাদের সাথে এখানে জয়েন করলেন। এই অবস্থায় এসে প্রথম দিকের যে আলোচনা ছিলো গতমাসের ২৪ - ২৫ তারিখের সেটাকে আবার নতুন করে সাজাতে হলো " বলেন মি. জুবায়ের।
পরে সকলে একমত হয়ে জোটের সিদ্ধান্তেই ২৯ শে ডিসেম্বর মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয় বলে জানান তিনি। দুই - তিন দিনের মধ্যেই আসন সমঝোতার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পাওয়া যাবে বলে জানান জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় এই নেতা।
স্বার্থের সংঘাত হলেই ভেঙে যাবে জোট
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটের মাধ্যমে এককভাবে জামায়াতে ইসলামীর সফলতা বা সরকার গঠনের নজির একেবারেই নেই। তবে, ২০০১ সালে বিএনপি - জামায়াত চার দলীয় জোট সরকারে এই দলের দুই নেতা মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পেয়েছিলো।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জামায়াতে ইসলামী নিজেদের দুর্বল বিবেচনা করে অন্যান্য ইসলামী দলগুলোকে নিজেদের সাথে বা পাশে পেতে এই জোট করেছে।
কেননা এবারের নির্বাচনে দলটির সবচেয়ে বড় ও একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি।
এগারো দলীয় এই জোটের অন্য দলগুলোও সে কারণে জামায়াতে ইসলামীকে চাপ প্রয়োগ বা দর কষাকষি করে যতদূর যেতে পারে সেই চেষ্টা করছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, " জামায়াতে ইসলামীর নিজেদের আস্থাহীনতা থাকতেই পারে, সেজন্যই জোট। যাদের সাথে জোট করেছে তাদেরও একক শক্তিতে কিছু করার নাই। তাদের দরকার ছিল নিজেদের চেয়ে জামায়াতের মতো অপেক্ষাকৃত বড় দল। পরস্পরই পরস্পরকে ব্যবহার করছে নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী। সুতরাং এখানে একটা স্বার্থের সংঘাত হলেই জোট ভেঙে যাবে। "
তিনি মনে করেন, আদর্শগত কোনো জায়গা না থাকার কারণে এ ধরনের জোট বেশি দিন টেকে না।
ফলে আসন নিয়ে সমঝোতা সম্পর্কিত স্বার্থগত দ্বন্দ্বের কারণেই নির্বাচনের আগেই এই জোট ভেঙে যেতে পারে অথবা নির্বাচনের পরে তা ভেঙে যেতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
জামায়াতের ইসলামীর বড় প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি উল্লেখ করে তিনি বলেন, জামায়াতে জোটের এসব দলকে ধরে রাখতে মরীয়া প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।
মি. আহমদ বলছেন, " জামায়াত অবশ্য চাচ্ছে যাদের সঙ্গে জোট করছে এরা যেন আলাদা জোটে চলে না যায়। কারণ তাহলে জামায়াতের শত্রু বাড়বে। অর্থাৎ ভোটের মাঠে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী বেড়ে যাবে। সুতরাং জামায়াত চাচ্ছে মতের মিল না হলেও যত বেশি সংখ্যক দলকে শত্রুশিবিরে যাতে না যায় সেই চেষ্টা করা।