শিরোনাম

প্রকাশিত : ২৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪, ০২:৫৫ রাত
আপডেট : ২৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪, ০২:৫৫ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

পপগুরু সুরময় জীবনে ‘নামা’ বলে কিছু ছিলো না 

অজয় দাশগুপ্তা

অজয় দাশগুপ্তা: সময় এখন ব্যক্তিকেন্দ্রিক। আমি আমি আমির ঠ্যালায় সবকিছু একপেশে, একঘেঁয়ে। এই বায়বীয় সোশ্যাল মিডিয়ার ভয়াবহ আমিত্বের কালে তাদের কথা বলার লোক পাবেন না। অথচ শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলি’র গল্প বলছে, ২০ অগাস্ট ৭১, মুক্তিযোদ্ধাদের একটি তাঁবুতে আলো জ্বলছিল। সেখান থেকে ভেসে আসছিলো সুর, হিমালয় থেকে সুন্দরবন হঠাৎ বাংলাদেশ কেঁপে কেঁপে ওঠে পদ্মার উচ্ছ্বাসে। বুঝলাম আজম খান গাইছেন। সুন্দর গলা অন্যদিকে অসীম সাহসী দুর্ধর্ষ এক গেরিলা যোদ্ধা। তার বয়স তখন একুশ। মায়ের কাছে এসে বললেন, যুদ্ধে যাবো। অনুমতি দাও। মা ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, যাবি? যা তবে, তোর বাপকে বলে যা। ভয়ে সংকোচে সরকারি চাকুরে পিতার কাছে এসে কাঁচুমাচু হয়ে অনুমতি চেয়ে ভেবেছিলেন, কপালে দুর্ভোগ আছে। তাকে অবাক করে দিয়ে তার বাবা বলেছিলেন, যাও, তবে স্বাধীন না করে এসো না।

অকুতোভয় দুঃসাহসী যুবক গেলেন ভারতে। স্বাধীন দেশে নিহত দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা অফিসার খালেদ মোশাররফের অধীনে প্রশিক্ষণ তারপর গেরিলা হয়ে ঢাকায় অপারেশান। অন্যতম গেরিলা যোদ্ধা নাট্য ব্যক্তিত্ব নাসিরউদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু ভাই বলেন, এই অসাধারণ যোদ্ধা ওপারে মেলঘরে থাকার সময় টিনের বাসনে চামচ ঠুকে ঠুকে গান গাইতেন আর তরুণদের উজ্জীবিত রাখতেন। স্বাধীন দেশে শুরু হয়ে গেছিল ষড়যন্ত্র। বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ ও  মুক্তিযোদ্ধাদের অসম্মান করার জন্য ভয়াবহ সব চক্রান্ত। হয়তো তারই এক অংশের নাম, ‘আবার তোরা মানুষ হ’। নামটা শুনলেই মনে হয়, কতোগুলো বখাটে বিভ্রান্ত যুবককে ফের মানুষ হতে বলা হচ্ছে। অথচ এই বীর মুক্তিযোদ্ধাদেরই একজন যার কথা লিখছি। তিনি দেশে ফিরে অসহায়, নতুন দেশে আশা ও স্বপ্নে হতাশ হতে থাকা তারুণ্যদের পাশে দাঁড়ালেন গান নিয়ে। তখন ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অনেক দূরের কোন শহর। পত্রিকা আসতে লাগতো দু’দিন। টিভি দেখা যেতো না ভালোমতো। রেডিও শোনার জন্য কতো কসরত। কিন্তু তিনি পৌঁছে গেলেন তরঙ্গের মতো। বুক কাঁপিয়ে গলা খুলে গাওয়া শুরু হলো, ওরে সালেকা ওরে মালেকা। একের পর এক হিট। হাইকোর্টের মাজারে কতো ফকির ঘোরে শেষ না হতেই এলো আলাল ও দুলাল। এমনই জনপ্রিয়তা প্রাতিষ্ঠানিক  শিক্ষাহীন গায়ক হয়ে গেলেন গুরু।

একজন গায়ক বা শিল্পীর জীবন মানেই ওঠা নামার গল্প। কিন্তু তাঁর সুরময় জীবনে নামা বলে কিছু ছিলো না। তাঁকে একপলক দেখার জন্য চট্টগ্রামের মুসলিম ইন্সটিটিউট হলের দেয়াল ভেঙে ঢোকার ইতিহাস আছে আমাদের। কিছুতেই ঢুকতে না পেরে পেছনের দেয়াল থেকে ইট খুলে সুড়ঙ্গ তৈরি করে গান শোনা গায়ককে দেখার নামই আজম খান। না আগে না পরে এমনটি হয়নি। পাঁপড়ি কেন বোঝে না, তাই ঘুম আসে না, এই ঘুমহীন  আবেশের গায়ক আবার কথা-টথা বলার লোক ছিলেন না। তিনি যখন অসুস্থ, বাক্যবাগীশ  কবীর সুমন সাবিনা ইয়াসমিনকে নিয়ে তাঁর বাড়িতে হানা দিয়েছিলেন। কথোপকথন বা সাক্ষাৎকারের জন্য। গুরুর বিনয় ও না জানার অপার সরল স্বীকারোক্তিতে সুমন বাবু কুপোকাত। এটাই  আজম খান। এখনো চোখ বন্ধ করলে শুনি, ও  আমার বাংলাদেশ বলে কেউ মন খুলে গাইছে বা কাঁদছে। তাঁর প্রভাব সময় কাল দেশ না পেরুলে  সিডনিতে বড় হয়ে ওঠা এই প্রজন্মের  ছেলে পুত্রের গাড়িতে তাঁর গান বাজবে কেন? কেন অর্ক বলে ও একদিন তাঁকে নিয়ে একটা স্বল্প দৈর্ঘের ছবি বানাবে? আমি গান পাগল মানুষ। রবীন্দ্রনাথ থেকে গজল, পঞ্চকবি থেকে জেমস সবার গান শুনি। হলপ করে বলছি,ব্যাকরণ মানা , আসন পেতে বসা, শুদ্ধতার সাথে সুর লাগানো সব ঠিক আছে। কিন্তু হাত নাড়িয়ে গান পাগলা গুরুর মতো/চুপ চুপ চুপ অনামিকা চুপ, কথা কয়ো না/তুমি আমি এখানে কেউ তো জানে না। এমন গান হগলে গাইতে পারে না। জানেও না। আজম খানের  জন্মদিন। শুভ জন্মদিন গুরু।
 লেখক ও কলামিস্ট

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়