শিরোনাম
◈ চার বছর পর বিধিনিষেধহীন মুক্ত পরিবেশে পহেলা বৈশাখ ◈ পহেলা বৈশাখে ইলিশের দাম চড়া ◈ নববর্ষ ১৪৩১ বঙ্গাব্দকে বরণে বর্ণাঢ্য র‌্যালি করবে আওয়ামী লীগ ◈ নতুন বছর মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রেরণা জোগাবে: প্রধানমন্ত্রী ◈ নতুন বছর মানে ব্যর্থতা পেছনে ফেলে সমৃদ্ধ আগামী নির্মাণ করা: মির্জা ফখরুল ◈ ইসরায়েলের তেল আবিব থেকে সরাসরি ঢাকায় ফ্লাইট অবতরণ ◈ বিএনপি গুম-নির্যাতনের কাল্পনিক তথ্য দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করছে: ওবায়দুল কাদের ◈ সরকারি খরচে ৩০৪৮টি মামলায় আইনি সহায়তা প্রদান ◈ রেল ভ্রমণে মানুষের আস্থা তৈরি হয়েছে: রেল মন্ত্রী  ◈ অস্ট্রেলিয়ায় শপিংমলে ছুরি হামলায় নিহত ৫, আততায়ী মারা গেছে পুলিশের গুলিতে

প্রকাশিত : ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪, ০২:০৩ রাত
আপডেট : ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪, ০২:০৩ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

অমর একুশে চাই সব মাতৃভাষার স্বীকৃতি

রাগিব হাসান

রাগিব হাসান: অমর একুশে ফেব্রুয়ারি। বাংলাদেশের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ভাষা আন্দোলন। ভাষার প্রতি আমাদের মমতা আর ভালোবাসা আস্তে আস্তে গড়ে তুলেছে আমাদের জাতিসত্তা। ভাষা আন্দোলনের ৭২ বছর পার হয়েছে। কিন্তু এখনও আমাদের সবার মাতৃভাষার প্রাপ্য সম্মান দেশে কি মিলেছে? বাংলাদেশ আসলে কিন্তু এক ভাষাভাষী দেশ না। আমি কিন্তু এখানে পাহাড়ি নানা জনগোষ্ঠীর ভাষার কথাই কেবল বলছি না। বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষ কথা বলেন যেসব ভাষায়, সেগুলোকে কি আমরা সম্মান দেখাই? নোয়াখালি, চট্টগ্রাম সিলেট, বরিশালÑ সব এলাকার ভাষা কিন্তু একেক রকমের। তথাকথিত ‘প্রমিত’ বাংলা ভাষার বড় ট্র্যাজেডি হলো, পুরো বাংলাদেশের কোনো অংশের ভাষার সাথেই ‘প্রমিত’ বাংলা ভাষার কোনোই মিল নেই (খেয়াল করে দেখুন, আমি সচেতনভাবে ‘শুদ্ধ’ কথাটা পরিহার করেছি, কারণ ভাষার কখনো শুদ্ধ-অশুদ্ধ হয় না, কেবল হতে পারে প্রমিত বা স্ট্যান্ডার্ডাইজড ভাষা)। 

তার উপরে যোগ হয়েছে আরও বড় একটা বিষয়Ñ চট্টগ্রাম আর সিলেটের ভাষা কিন্তু আসলে বাংলা না জোর করে আমরা তাদের বাংলার আঞ্চলিক রূপ বলে খেতাব দিলেও এই দুইটি ভাষা স্বতন্ত্র ভাষা হিসাবে ভাষাবিদদের কাছে স্বীকৃত। প্রমিত ভাষার প্রয়োজন আছে বটে। কারণ একজন নোয়াখালির বাসিন্দা তাহলে একজন রংপুরের মানুষের সাথে কথ্য বা লিখিতভাবে ভাব বিনিময় করতে পারবেন। অফিসিয়াল দলিল দস্তাবেজের জন্যও প্রমিত ভাষার দরকার আছে। কিন্তু যে ভাষাটি প্রমিত নয়? ঘরে বসে পরিবারের সাথে কথা বলার সময়ে একজন সিলটি কোন ভাষায় কথা বলবেন? অথবা একজন চিটাইঙ্গা? নিশ্চয়ই সেটা তারা বলবেন মাতৃভাষায়, যার সাথে প্রমিত বাংলার মিলটা কমই। আমরা যদি প্রমিত বাংলার সাথে আঞ্চলিক ভাষাগুলোকেও একই মর্যাদায় রাখতাম, তাহলে কোনো সমস্যাই হতো না। কিন্তু সমস্যাটা হলো আমরা কোনো অদ্ভূত কারণে ‘প্রমিত’ ভাষাকেই ধরে নিচ্ছি বাংলার একমাত্র ‘শুদ্ধ’ রূপ, আর বাকি সবকিছুকে নাম দিচ্ছি অপভ্রংশ অশুদ্ধ।  

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় ব্যাকরণ হিসেবে শেখানো হচ্ছে ২শ বছর আগের কপিপেস্ট করা সংস্কৃত ব্যাকরণের নিয়ম, যার সাথে দেশের ১৬ কোটি মানুষের মাতৃভাষার কোনো মিল নেই। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় বলা হচ্ছে, কারো মাতৃভাষা নয়, ভাষার এই রূপটিই একমাত্র ‘শুদ্ধ’ রূপ, বাকি সব ‘অশুদ্ধ’, যারা সেটা বলবে না, তারা অশিক্ষিত গেঁয়ো ভূত! ফলটা কী দাঁড়াচ্ছে? পুরো বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের সবাই ছোটবেলা থেকে যে ভাষায় কথা বলেন, সেই ভাষা নিয়ে তারা সবাই লজ্জ্বিত। কারণ তাদের বোঝানো হয়েছে, মায়ের ভাষাটা ‘অশুদ্ধ’, ব্যাকরণের ভাষায় চিবিয়ে চিবিয়ে সংস্কৃতের শুদ্ধ রূপে বলা ভাষাটাই শুদ্ধ এবং শিক্ষিত হতে হলে নিজের মাতৃভাষা ছাড়তে হবে, কারও কথায় টান থাকলে সেটা অশিক্ষিতের লক্ষণ। আমি আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চলে থাকি। এখানকার বাসিন্দাদের ইংরেজি বলার কায়দাটা অন্যান্য অঞ্চলের চাইতে আলাদা। কিন্তু নিজেদের ভাষা নিয়ে তারা গর্বিত। হাজার হলেও মায়ের ভাষা। তা নিয়ে লজ্জ্বিত হতে হবে কেন?    

এবারে আসি চট্টগ্রাম আর সিলেটের ভাষা নিয়ে। প্রমথ চৌধুরীর উদ্ধৃতি দিয়ে একটা বড্ড অভব্য কথা চালু আছে, ‘বাংলা ভাষা সিলেটে হয়েছে আহত, আর চট্টগ্রামে নিহত’! অথচ এই দুই অঞ্চলের ভাষা তো বাংলা না। চট্টগ্রাম আর সিলেটের মানুষেরা যে ভাষায় কথা বলেন, সেই চিটাইঙ্গা ভাষা আর সিলটি ভাষা বাংলার কাছাকাছি কিন্তু স্বতন্ত্র দুইটি ভাষা। সিলটির তো আলাদা লিপি (সিলটি নাগরি) পর্যন্ত ছিল। চিটাইঙ্গা ভাষার কথা খেয়াল করলে দেখবেন, বাক্য গঠন থেকে শুরু করে নানা দিক থেকে বাংলার সাথে এর বিশাল পার্থক্য। কিন্তু দুঃখের ব্যাপার হলো, আমরা জোর করে এটাকে বাংলার আঞ্চলিক রূপ বলছি, তার পরে সেটা বাংলার চাইতে এতো আলাদা কেন তা নিয়ে প্রমথ চৌধুরীর মতো ব্যঙ্গ করি এবং কোটি কোটি মানুষের মাতৃভাষাকে আঞ্চলিক বলে উপেক্ষা করছি। পাহাড়ের চাকমা, মারমা, এসব জনগোষ্ঠীর ভাষার কথা বাদই দিলাম বাংলাদেশের জনগণের এক বিশাল অংশকে আমরা আঞ্চলিকতার টান আছে বলে আলাদা করে রাখছি। 

অথচ একুশের চেতনা আসলে কী? মাতৃভাষার স্বীকৃতি, সেই ভাষায় কাজ করা, দাপ্তরিক নানা কিছু করার অধিকারের স্বীকৃতি। বাংলাদেশে চাই সবার মাতৃভাষার সমান মর্যাদা। প্রমিত ভাষা থাকুক তার মতো, কিন্তু বাকি সব ভাষাকে আঞ্চলিক বলে খেতাব দিয়ে নাটকের কমিক চরিত্রের মুখে সেটাকে ঢুকিয়ে দেওয়া হাসাহাসির জন্য, কোটি মানুষকে ভাষা নিয়ে লজ্জ্বা দেওয়া বা অচ্ছুত করে রাখার যে প্রবণতাÑ একুশের এই দিনে আসুন আমরা সেই অসুস্থ  উপহাসের চর্চা থেকে বের হই। বাংলাদেশের সব ভাষাকে সমান মর্যাদায় রাখি। প্রতিষ্ঠা করি সবার মাতৃভাষার চর্চার অধিকার। সেই মাতৃভাষায় বই লেখা, সাংস্কৃতিক চর্চার অধিকার। সেই মাতৃভাষাকে নিয়ে গর্বিত হবার অধিকার। ফেসবুকে ২১-২-২৪ প্রকাশিত হয়েছে। 

 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়