ড. নাসিম আহমেদ: অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক চাহিদা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের প্লাস্টিক পণ্যের বাজার দ্রুত বিকাশ লাভ করছে। প্লাস্টিক শিল্প দেশের অন্যান্য অনেক সেক্টরের সঙ্গে ফরোয়ার্ড ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ হিসেবে কাজ করে। পণ্যগুলো অবকাঠামো, নির্মাণ, কৃষি, ভোগ্যপণ্য, টেলিকম ও প্যাকেজিং-এ ব্যবহৃত হয়। প্রধান উৎপাদিত প্লাস্টিক পণ্য হলো পিভিসি পাইপ, গার্মেন্টস আনুষাঙ্গিক, হ্যাঙ্গার, পলি ব্যাগ, পলিথিন ব্যাগ, প্লাস্টিকের গৃহস্থালী পণ্য, পাট ও টেক্সটাইল খুচরা, খেলনা, ক্রোকারিজ আইটেম, প্লাস্টিক বর্জ্য পুনর্ব্যবহার, কম্পিউটার আনুষাঙ্গিক, প্লাস্টিকের আসবাবপত্র, পলি প্রোপিলিন বোনা, নমনীয় প্যাকেজিং, চিকিৎসা ক্লিনিকাল আনুষাঙ্গিক।
বাংলাদেশ প্লাস্টিক গুডস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিপিজিএমইএ) দাবি করে যে প্লাস্টিক পণ্যের উৎপাদন ও বিপণন প্রায় কোটি টাকার, অভ্যন্তরীণভাবে ৪০,০০০ কোটি টাকা। দেশের সামগ্রিক প্লাস্টিক পণ্যের বাজারের মূল্য প্রায় ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার মধ্যে ৮৩.৪ শতাংশ অভ্যন্তরীণভাবে তৈরি করা হয় ও বাকি ১৬.৬ শতাংশ আমদানি করা হয়। এ খাত থেকে প্রায় কোটি টাকা রাজস্ব পাওয়া যায়। রাজকোষে বছরে ৩৫০০ কোটি টাকা। প্লাস্টিক খাতের রপ্তানি (প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ) ১.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান। দেশে বড়, মাঝারি ও ছোট মিলিয়ে প্রায় ৬০০০ প্লাস্টিক শিল্প চালু রয়েছে। ১.২ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ এই খাতের উপর নির্ভরশীল। বিপিজিএমইএ ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্ব বাজারের ৩ শতাংশ দখলের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। স্ট্যাটিস্টা ইনকর্পোরেশন, ইউএসএ-এর তথ্য অনুসারে (১৫ নভেম্বর, ২০২৩-এ প্রকাশিত), ২০২৩ সালে বিশ্বব্যাপী প্লাস্টিক বাজারের মূল্য ছিলো ৭১২ বিলিয়ন ডলার।
প্লাস্টিক বাজার ২০২৩ থেকে ২০৩৩ সালের মধ্যে চার শতাংশের একটি চক্রবৃদ্ধি বার্ষিক বৃদ্ধির হার (সিএজিআর) নিবন্ধন করে, ২০৩৩ সালের মধ্যে ১,০৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি মূল্যে পৌঁছাবে বলে অনুমান করা হয়েছে। ইন্ডাস্ট্রি ইনসাইডার অনুমান করেন যে বাংলাদেশ যদি বাজারের ১% দখল করতে পারে, তাহলে ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি পণ্য রপ্তানি করা সম্ভব হবে যা প্রতি বছর ৬,০০০ কোটি টাকা। বার্ষিক বৃদ্ধির হার শীঘ্রই ২৫% এ পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। কৃষি খাতে প্লাস্টিক ব্যবহার, অটোমোবাইল, ইলেকট্রিক ও ইলেকট্রনিক্সে বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্লাস্টিক রেজিন আমদানি বার্ষিক ১০% বৃদ্ধি পাচ্ছে ও অভ্যন্তরীণ চাহিদাও ২০% বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্লাস্টিকের গড় বিশ্বব্যাপী ব্যবহার মাথাপিছু ৫০ কেজি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই হার মাথাপিছু ১০৯ কেজি, চীনে ৩৮ কেজি ও ভারতে ১১ কেজি। বাংলাদেশে মাথাপিছু প্লাস্টিকের ব্যবহার মাত্র ৯ কেজি। অতএব, এই বাজারে একটি বিশাল সম্ভাবনা আছে। ইউরোপ ও অন্যান্য দেশগুলো চীনের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে বাংলাদেশের মতো দেশে স্থানান্তর করছে, যা শিল্পের জন্য একটি উৎসাহব্যঞ্জক কারণ। প্লাস্টিক খাত বাংলাদেশের ১২তম সর্বোচ্চ আয়কারী রপ্তানি খাত। দেশটি ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২০৯.৮৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের প্লাস্টিক পণ্য রপ্তানি করেছে যা উচ্চ প্রবৃদ্ধির প্রবণতা দেখাচ্ছে ২০২৩-২৪ আর্থিক বছর (ইপিবি) এর জন্য ২৭৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
বাংলাদেশ বর্তমানে ১৪২টি প্লাস্টিক আইটেম উৎপাদন করে ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ইইউ, চীন, পোল্যান্ড, ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল সহ ১২৬টি দেশে রপ্তানি করছে। সরকারি সহযোগিতায় প্লাস্টিক খাতের সম্ভাবনা আরও বাড়ছে। ২০১৬ সাল থেকে, সরকার প্লাস্টিক পণ্য রপ্তানির জন্য ১০% নগদ প্রণোদনা দিচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে প্লাস্টিকের খেলনা ও সংশ্লিষ্ট জিনিসপত্রসহ প্লাস্টিক পণ্যের শীর্ষ ৪৩তম বৃহত্তম রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশকে অন্তর্ভূক্ত করার লক্ষ্য অর্জনের লক্ষ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় প্লাস্টিক খাতের রপ্তানি রোডম্যাপ তৈরি করেছে। বাংলাদেশের প্লাস্টিক শিল্প উন্নয়ন নীতি ২০২৩ ২০২৮ সাল নাগাদ প্লাস্টিক ও প্যাকেজিং শিল্পের বাজারকে ৪ বিলিয়ন ডলার থেকে ১০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে যাতে ২০২৮ সালের মধ্যে জিডিপিতে প্লাস্টিক খাতের অবদান কমপক্ষে দুই শতাংশ বাড়ানো যায়। বর্তমানে এটি এক শতাংশের নিচে। নীতিটি ২০২৮ সালের মধ্যে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে ১০,০০০ জনকে চাহিদা ভিত্তিক প্রশিক্ষণ প্রদানের আকাক্সক্ষা করে ও ২০২৮ সালের মধ্যে এই সেক্টরে ৫০০,০০০ নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করার লক্ষ্য রাখে। নীতিমালার অধীনে সরকার প্লাস্টিক পার্ক ও ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ শিল্পে প্রথম ১০ বছরের জন্য আয়কর থেকে ছাড় দেবে মূলধনী সরঞ্জাম, খুচরা যন্ত্রাংশ ও আনুষাঙ্গিক শুল্কমুক্ত আমদানি করবে। সরকার শিল্প পার্ক বা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলও তৈরি করবে।
এ খাতের টেকসই উন্নয়নের জন্য স্থানীয় শিল্প বৃদ্ধি, সক্ষমতা বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি ও দক্ষতা উন্নয়নের ওপর জোর দিয়ে এই পরিকল্পনায় নয়টি কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে। নীতির লক্ষ্য একটি বিশেষ তহবিল থেকে ৩% সুদে প্লাস্টিক খাতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগকে ঋণ প্রদানের মাধ্যমে দেশিয় শিল্পের জন্য পর্যাপ্ত আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা। এছাড়া শিল্প আমদানিকৃত মূলধনী যন্ত্রপাতি, খুচরা যন্ত্রাংশ বা আনুষাঙ্গিক পণ্যের ওপর শুল্ক ছাড় কাঁচের উপকরণ ও সরবরাহের ওপর ট্যাক্স ক্রেডিট পাবে। শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক অবকাঠামো উন্নয়ন কাজের জন্য প্রয়োজনীয় কর ছাড়ও দেওয়া হবে। এছাড়াও সরকার প্লাস্টিক শিল্পকে টেলিযোগাযোগ, বিদ্যুৎ, ইউটিলিটিসহ স্থানীয় পণ্য ও সেবা ক্রয়ের ক্ষেত্রে ভ্যাট হ্রাস ও বন্ডেড গুদাম সুবিধা প্রদান করবে। শিল্পমন্ত্রীর নেতৃত্বে প্লাস্টিক শিল্পের ওপর ২৭ সদস্যের জাতীয় শিল্প উন্নয়ন পরিষদ জাতীয় পর্যায়ে নীতির বাস্তবায়ন তদারকি ও পর্যবেক্ষণ করবে। কাউন্সিল জাতীয় উন্নয়ন নীতির মধ্যে নীতিগত সমন্বয় ও অন্যান্য জাতীয় নীতির সঙ্গে তাদের একীকরণের জন্য দায়ী থাকবে। ইন্ডাস্ট্রি ইনসাইডারের মতে, বড় চ্যালেঞ্জ গ্যাস-বিদ্যুৎসহ জ্বালানি সংকট। প্লাস্টিক শিল্পের বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও, মান নিয়ন্ত্রণ পরীক্ষার সুবিধার ঘাটতি, উদ্ভাবনী প্রযুক্তি, প্লাস্টিক বর্জ্যরে সঠিক ব্যবস্থাপনা, কম ব্যবসা-বান্ধব কর ও শুল্ক সুবিধা ইত্যাদি শিল্পের জন্য প্রধান বাঁধা। ব্যবহৃত প্লাস্টিকের অগমেন্টেড রিসাইক্লিং কাঁচামাল আমদানির পরিমাণ হ্রাস করবে, উদ্যোক্তাদের নিট মুনাফা বাড়াবে ও পরিবেশবান্ধব হয়ে উঠবে। প্লাস্টিক শিল্পগুলোকে বৈশ্বিক প্লাস্টিকের বাজারের একটি বড় অনুপাত দখল করতে চাইনিজ ও তাইওয়ানের অভিজ্ঞতা থেকে শেখার নতুন ব্র্যান্ডের পণ্যগুলোকে বৈচিত্র্যময় ও উদ্ভাবন করতে হবে। প্রতিযোগীতামূলক প্রসারিত বাজারে উন্নতির জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ বিনিয়োগ সহ তাদের আপডেট ও নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করা উচিত।
লেখক : যুক্তরাজ্যের আলস্টার ইউনিভার্সিটি থেকে পাবলিক পলিসিতে পিএইচডি করেছেন ও বর্তমানে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট, ঢাকায় সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। সূত্র : নিউনেশন। অনুবাদ : মিরাজুল মারুফ