হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর প্রতিনিধি: একসময় বর্ষা আর ঈদ মানেই ছিল আতঙ্ক। কখন ঘরবাড়ি, ফসলি জমি কিংবা বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়— সেই শঙ্কায় দিন কাটাতেন ফরিদপুরের মধুখালী ও আলফাডাঙ্গা উপজেলার মধুমতি নদীপাড়ের মানুষ। তবে স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর সেই নদীভাঙনের ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন থেকে মুক্তির আশা দেখছেন হাজারো মানুষ।
মধুমতি নদীর ভয়াল ভাঙন রোধে নির্মিত হচ্ছে প্রায় সাড়ে ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ স্থায়ী বাঁধ। ঈদের আগেই প্রকল্পের প্রায় ৯০ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ায় নদীপাড়জুড়ে এখন স্বস্তি, আনন্দ আর নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন।
দীর্ঘ কয়েক যুগ ধরে মধুমতি নদীর ভাঙনে মধুখালী ও আলফাডাঙ্গার বিস্তীর্ণ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে অসংখ্য ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। অনেক পরিবার হারিয়েছে তাদের শেষ সম্বলটুকুও।
এ অবস্থায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের উদ্যোগে প্রায় ৪৮৭ কোটি টাকা ব্যয়ে দুই উপজেলার ৮টি ভাঙনপ্রবণ পয়েন্টে স্থায়ী তীর সংরক্ষণ বাঁধ নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ২০২৩ সালের ১ জুলাই শুরু হওয়া প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত থাকলেও নির্ধারিত সময়ের আগেই দ্রুতগতিতে কাজ এগিয়ে চলছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের আওতায় নদীতীর সংরক্ষণ, ব্লক স্থাপন, ড্রেজিং এবং নদীর নাব্যতা রক্ষাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর ফলে ভাঙন রোধের পাশাপাশি বন্যা পরিস্থিতিও নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
স্থানীয়রা বলছেন, একসময় মধুমতি ছিল আতঙ্কের আরেক নাম। বর্ষা মৌসুম এলেই রাত জেগে কাটাতে হতো নদীভাঙনের শঙ্কায়। কিন্তু এখন দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করেছে।
নদীপাড়ের বাসিন্দা রাবেয়া বেগম বলেন,“প্রতিবছর বর্ষা আর ঈদের সময় আতঙ্কে থাকতে হতো। কখন ঘর নদীতে চলে যায় সেই ভয় ছিল। এখন বাঁধ হওয়ায় অনেক শান্তিতে আছি।”
স্থানীয় কৃষক আব্দুল কাদের বলেন, “আমাদের অনেক জমি নদীতে গেছে। এবার বাঁধ হওয়ায় অন্তত বাকি জমিগুলো রক্ষা পাবে। আমরা সরকারের কাছে কৃতজ্ঞ।”
মধুখালী উপজেলার কামারখালী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান ইরান চৌধুরী বলেন, নদীর তীর সংরক্ষণমূলক কাজ বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভাঙন রোধ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে। পাশাপাশি ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও নাব্যতা বজায় থাকবে।
ফরিদপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক আবজাল হোসেন খান পলাশ বলেন,“এই প্রকল্পের মাধ্যমে মধুখালী ও আলফাডাঙ্গার অন্তর্গত ৮টি ভাঙনকবলিত এলাকায় সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা, বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ল্যান্স নায়েক মুন্সী আব্দুর রউফ স্মৃতি জাদুঘর, সংযোগ সড়ক, স্বপ্ননগর আশ্রয়ণ প্রকল্প, বিদ্যালয়, হাট-বাজার, কমিউনিটি ক্লিনিক, ধর্মীয় উপাসনালয় ও হাজারো মানুষের বসতভিটা রক্ষা পাবে।”
তিনি আরও বলেন,“মধুমতির তীরবর্তী মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ও স্বপ্ন বাস্তবায়ন হওয়ায় সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।”
ফরিদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী প্রকৌশলী মো. রাকিব হোসেন বলেন, “মধুমতি নদীর ভাঙন রোধে এটি একটি বড় ও গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। বাঁধ নির্মাণের ফলে হাজারো পরিবার, ফসলি জমি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষা পাবে। পাশাপাশি এলাকাটিকে দৃষ্টিনন্দন করতেও বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”
তিনি জানান, নদীপাড়কে আকর্ষণীয় করে তুলতে সেখানে স্থায়ী বেঞ্চ, ছাতা ও বসার স্থান নির্মাণ করা হয়েছে। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ সেখানে ঘুরতে আসছেন। ধীরে ধীরে এটি স্থানীয়দের জন্য একটি বিনোদন কেন্দ্রেও পরিণত হচ্ছে।
স্থানীয়দের ভাষায়, “যে নদী একসময় কেড়ে নিয়েছে সবকিছু, আজ সেই নদীর পাড়েই মানুষ নতুন স্বপ্ন দেখছে।”
আসন্ন বর্ষা মৌসুম সামনে রেখে এখন আর নদীভাঙনের ভয় নয়, বরং নিরাপদ ভবিষ্যতের আশাতেই বুক বাঁধছেন মধুমতি তীরের মানুষ।