অন্তরা হালদার: বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের সম্পদ দিয়েছে এবং এটিকে অনেক দুর্যোগের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। বন্যা, খরা, জোয়ার-ভাটা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সারা বছরই সাধারণভাবে পরিচিত। দেশের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের অবস্থান বিশেষভাবে উদ্বেগজনক, কারণ এর ক্রমবর্ধমান জলের নেতিবাচক প্রভাব ইতিমধ্যেই স্পষ্ট। আগামী কয়েক দশকে, ঝুঁকিপূর্ণ সুন্দরবন এবং অধিক জনবসতিপূর্ণ উপকূলীয় এলাকা তলিয়ে গেলে লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারে। ২১০০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ০.৪- থেকে ১.৫-মিটার বৃদ্ধি পেতে পারে, যা বাংলাদেশের দ্বীপগুলোর পানির নীচে যাওয়ার সম্ভাবনাকে উপস্থাপন করে। এই পরিস্থিতিতে, এই সংকট মোকাবেলায় অন্যান্য দেশগুলো যে কৌশল ব্যবহার করছে তা থেকে আমরা শিক্ষা নিতে পারি। উদাহরণস্বরূপ, নিম্ন উচ্চতার কারণে নেদারল্যান্ডস সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধির জন্য বিশেষভাবে স্পর্শকাতর অবস্থায় আছে।
তাই সরকার বন্যার ঝুঁকি কমাতে নদীগুলোর জন্য বৃহত্তর স্থান তৈরি করে, নদীর ডাইক বা বাঁধগুলোকে শক্তিশালী করা, উপকূলীয় ডাইক বা বাঁধ এবং সীওয়াল নির্মাণ এবং পরিবেশ বান্ধব নগর উন্নয়নে বিনিয়োগের মতো ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। নেদারল্যান্ডসের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ প্রণয়ন করেছে। বাংলাদেশ এবং নেদারল্যান্ডস উভয় দেশেই নিম্ন-বদ্বীপের ল্যান্ডস্কেপ পাওয়া যায়। যাইহোক বাংলাদেশের কাছে উত্থিত সমুদ্র দুর্গ নির্মাণের জন্য আর্থিক, বৈজ্ঞানিক বা প্রযুক্তিগত সংস্থান নেই। অধিকন্তু জাতীয় এবং সেক্টরাল পরিকল্পনায় জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য অভিযোজন ব্যবস্থাগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা অপরিহার্য যদি এই পরিকল্পনাগুলো টেকসই উন্নয়নের জন্য দেশের সর্বাধিক উদ্দেশ্যগুলোর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। বারবার বন্যা ও জলবায়ু বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মুখোমুখি হওয়ার জন্য একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ এবং কৌশলগত পদ্ধতির প্রয়োজন।
আরেকটি উদাহরণ হল জাপান, যার নগর পরিকল্পনা ধারণা বাংলাদেশের দুর্যোগের পূর্বাভাস এবং প্রতিক্রিয়া জানার ক্ষমতাকে অনুপ্রাণিত করতে পারে। উপরন্তু টেকসই ভূমি ব্যবস্থাপনা এবং পুনর্নবায়নের উপর কোস্টারিকার মনোযোগ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমানোর ধারণা বা পদ্ধতি প্রদান করে। এই কৌশলগুলো বন্যা এবং জলবায়ু বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে কার্যক্রম বাড়ানোর লক্ষ্যযুক্ত পদক্ষেপের কার্যকারিতা প্রদর্শন করে, যদিও প্রতিটি সমাধানকে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটের সাথে মানানসই করার জন্য পরিবর্তন করতে হবে। সিদ্ধান্ত নিতে হবে কিভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা যায়, কারণ কৃষিকাজ এবং আবাসিক এলাকা ডুবে যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে খাদ্য উৎপাদনের ক্ষতি হচ্ছে, গবেষকরা এমন এক ধরনের ধান তৈরি করতে পারেন যা বন্যা ও লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে এবং উচ্চ ফলন দেয়। উপরন্তু ঘরগুলো আশ্রয়কেন্দ্র হিসাবেও কাজ করতে পারে, তাই বন্যার সময় মানুষের তাদের বাড়ি থেকে দূরে যেতে হবে না। স্থানীয় কিছু এনজিও ইতিমধ্যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি থেকে মানুষ ও অবকাঠামো রক্ষায় সরকার কিছু অগ্রগতি করেছে।
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত জাতিসংঘ ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশনে একাধিক প্রস্তাব জমা দিয়েছে এবং একটি ১০০ বছরের ব-দ্বীপ পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। এর পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে জল, বন্যা এবং ক্ষয় ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু-সহনশীল জীবিকা নিশ্চিত করা এবং বিভিন্ন আশ্রয়ন প্রকল্প। এসবের মধ্যে ব্রহ্মপুত্রে ব্যারেজ নির্মাণ এবং গড়াই নদী পুনরুদ্ধার প্রকল্প সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়াও জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত আন্তঃসরকারি প্যানেলের প্রধান লেখকদের মধ্যে বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা রয়েছেন, যারা অসামান্য গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকি কমাতে অনেক কৌশল ব্যবহার করা যেতে পারে। কিন্তু এগুলো ব্যবহার করার জন্য, সরকার এবং সম্প্রদায়গুলোকে অবশ্যই হাত মেলাতে হবে এবং দ্রুত কাজ করতে হবে। একই সময়ে তাদের আরও গ্লোবাল ওয়ার্মিং বন্ধ করতে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাস করার জন্য প্রচেষ্টা চালাতে হবে। আমাদের গ্রহকে বাঁচানোর এবং নিরাপদ ও টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার একমাত্র উপায় হলো জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া।
অন্তরা হালদারÑ বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ম্যানেজমেন্টের একজন প্রকল্প সহযোগী। সূত্র : ডেইলি স্টার। অনুবাদ : মিরাজুল মারুফ