শিরোনাম

প্রকাশিত : ৩০ মে, ২০২৩, ০১:২১ রাত
আপডেট : ৩০ মে, ২০২৩, ০১:২১ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

আমেরিকার নতুন ভিসানীতি নিয়ে কি উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু আছে?

ইমতিয়াজ মাহমুদ

ইমতিয়াজ মাহমুদ: [১] আমেরিকানরা ভিসা প্রদান নিয়ে কী সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটা নিয়ে আমার সেরকম কোনো উদ্বেগ নেই। উদ্বেগ নেই তার একাধিক কারণ আছে। প্রথমত, আমি কবে কখন কী উপলক্ষ্যে আমেরিকা যাবো আর আদৌ যাবো কিনা সেটার কোনো ঠিক ঠিকানা নেই। আর নিতান্ত যদি কখনো যেতেও হয়, ওরা ভিসা দিলে যাবো না দিলে যাবো না। ওদের দেশে না গেলে আমার খুব যে ক্ষতিবৃদ্ধি হবে সেরকম তো নয়। দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে যে আমেরিকানদের ভিসা নিয়ে এইসব নানাপ্রকার বায়নাক্কা এগুলোর খুব বেশি স্থায়িত্ব থাকে না এগুলো একদম পাথরে লেখা কোনো অলঙ্ঘনীয় বিধান নয়। 

এছাড়া, আমেরিকার সরকার ওদের নিজেদের প্রয়োজনে বা নিজেদের সুবিধামতো ওরা এইসব নিয়ম টিয়ম উপেক্ষা করে। একদম পূর্ণাঙ্গ নিষেধাজ্ঞা ভেঙেও মানুষকে ভিসা ফিসা দিয়েছে অতীতে এইরকম অনেকবার হয়েছে। নরেন্দ্র মোদীর কথা আপনাদের মনে আছে। নরেন্দ্র তো একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী, খুঁজলে আপনি এইরকম আরও ঘটনা পাবেন। কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা থাকলে ভিসা দেওয়া হবে না এরকম একটা সাধারণ নীতি ওদের আছে। সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা থাকলেও একই বিধান। কিন্তু এইসব বিধান নিয়মিতই উপেক্ষা করে ওরা। 

এসব ভিসা ফিসার নিয়মের বা নীতির চেয়ে আমার কাছে যেটা গুরুত্বপূর্ণ খবর মনে হয়েছে সেটা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের তুলা আমদানির ক্ষেত্রে আমাদের দেশের বন্দরে জীবাণুমুক্ত করার যে বিধানটা ছিলো সেটা সরকার তুলে নিয়েছে। আমার আশঙ্কা হচ্ছে এই বিধানটা তুলে নেওয়ার ফলে বাংলাদেশের ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। এই নিয়মটা পরিবর্তনের আগে আরেকটু পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও আলাপ আলোচনা করে নেওয়া দরকার ছিলো। ব্যাপারটা সংক্ষেপে একটু ব্যাখ্যা করে বলি।

[২] বাংলাদেশে একটা আইন আছে, Destructive Insects and Pests Act, ১৯৫২ এই নামে। ছোট আইন, বইয়ের দেড় দুই পৃষ্ঠার মধ্যে অল্প কয়েকটা ধারা। এই আইনটির উদ্দেশ্য হচ্ছে দেশে উদ্ভিদজাত দ্রব্যাদি আমদানির মাধ্যমে যাতে করে কোনো জীবাণু কীট বা বালাই প্রবেশ না করে সেইটার ব্যবস্থা করা। এইটা কীভাবে করা হবে তার জন্যে বিস্তারিত বিধান আছে এই আইনের অধীনে প্রণীত বিধিমালাতে। বিধিমালাটা বেশ বিস্তারিত এবং সেই বিধিমালার অধীনেই বন্দরগুলোতে যে কোয়ারান্টাইন বা পরীক্ষা নিরীক্ষা হয় সেইগুলোর বিধান করা আছে। 

আপনি যদি কখনো সড়ক পথে ভারতে যান, তাইলে দেখবেন সীমান্তের দুই পাশেই প্লান্ট কোয়ারান্টাইন অফিস আছে। সেগুলো হচ্ছে এই আইন প্রয়োগের দপ্তর। সমুদ্র বন্দরগুলোতেও ওদের অফিস আছে। যে কোনো উদ্ভিদজাত পণ্য বাংলাদেশে প্রবেশ করতে গেলে ওইসব অফিস থেকে ছাড়পত্র নিতে হয়। বিধিমালার অধীনে যে কোনো উদ্ভিদজাত পণ্য আমদানি করতে হলে আগে থেকেই সরকারের কাছ থেকে আমদানির পারমিট (আইপি) নিতে হয়। আর সেই পণ্যটি যে ওইরকম কীট জীবাণু বা বালাইমুক্ত সেই মর্মে যে দেশ থেকে আমদানি করা হচ্ছে সেই দেশ থেকে সার্টিফিকেটও আনতে হয়। সেগুলো দেখার পরেও প্ল্যান্ট কোয়ারান্টাইন বা সঙ্গনিরোধ অফিসাররা পণ্যগুলো পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে পারে। প্রয়োজনে সেগুলোর বাংলাদেশে প্রবেশ নিষিদ্ধ করতে পারে। 

উদ্ভিদজাত দ্রব্যের আমদানির ব্যাপারে এইসব কড়াকড়ি শুধু বাংলাদেশেই নয়, অন্যান্য দেশেও রয়েছে। আপনাদের মনে থাকার কথা, ভারতীয় ক্রিকেটার হরভজন সিং ও আরও কয়েকজনকে একবার ওরা অস্ট্রেলিয়ায় ঢুকতে দেয়নি কেন না ওদের জুতার তলায় ঘাস লেগে ছিলো। ওরা ওদের দেশে জুতার তলায় লেগে থাকা ঘাস বা তৃণ এইসবও পরীক্ষা নিরীক্ষা ছাড়া ঢুকতে দেয় না। উদ্ভিদজাত পণ্যের এইরকম নিয়ন্ত্রণের জন্যে একটা আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক সংস্থাও আছে।   

[৩] আমেরিকার তুলার কি সমস্যা? কটন বোল উইভিল Cotton Boll Weevil) নামে একটা কীট আছে। তুলা গাছের ফুল, কুড়ি এইসব খায় এইসব কীট। দেখতে অনেকটা গুবরে পোকার মতো। বলা হয় যে মেক্সিকো থেকে স দুয়েক বছর আগে এই কীট উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশে ছড়িয়েছে। মারাত্মক এই কীট যাতে আমাদের দেশে প্রবেশ করতে না পারে এইজন্যে আমাদের দেশের Destructive Insects and Pests Act, ১৯৫২এর অধীনে যে বিধিমালা আছে সেই বিধিমালাতে নিয়ম করা হয়েছে যে আমেরিকা থেকে কোন তুলা বাংলাদেশে আমদানি করতে হলে সেই তুলা বাংলাদেশের বন্দরে আসার পর ফিউমিগেট করে কীটমুক্ত করতে হবে। 

ফিউমিগেশন ব্যাপারটা হচ্ছে বিশ মেশানো তরল পদার্থ ধোয়ার আকারে পাম্প করে পণ্যগুলোতে ছড়িয়ে দেওয়া হয় যাতে করে সেই পণ্যের মধ্যে থাকা কীট বা জীবাণু ধ্বংস হয়ে যায়। এই ফিউমিগেশনের একটা খরচ আছে, এতে করে আমেরিকা থেকে আমদানি করা তুলার দাম সামান্য একটু বেড়ে যায়। তাই বলে যে বাংলাদেশে আমেরিকার তুলা আমদানি কম হয় সেরকম কিন্তু নয়। বাংলাদেশে যে পরিমাণ তুলা আমদানি হয় তার সিংহভাগই আমেরিকা থেকেই আসে। আমদানিকারকদের যে খুব একটা ক্ষতি হয় সেটা না, আমেরিকার বিক্রেতারাই এই বাড়তি খরচ মাথায় রেখে দাম একটু কমিয়ে নেয়। আর ওই কীট সমস্যা ছাড়া আমেরিকার তুলা গুণগত মানে বেশ ভালো। 

উদ্ভিদজাত পণ্যের ক্ষেত্রে এইসব নিয়ম খুব করাকরিভাবেই মানতে হয়। এটা করতে হয় দেশের কৃষি ও উদ্ভিদবৈচিত্র্য ইত্যাদি রক্ষা করার জন্যে। আপনি যদি একটু খোঁজ খবর রাখেন তাইলে জানতে পারবেন যে অস্ট্রেলিয়া নিউজিল্যান্ড ও অন্যান্য উন্নত দেশ মাঝে মাঝেই শশ্যবাহি বিশাল বিশাল জাহাজ ফেরত পাঠিয়ে দিচ্ছে। কেন? শস্যদানার মধ্যে-ধরেন গম বা ভুট্টা, সেগুলোতে হয়তো অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে একটু বেশি মাত্রায় মাটি বা ঘাস বা ওইরকম কিছু পাওয়া গেছে, ব্যাস, সেই শস্য ওরা আর নিজেদের দেশে ঢুকতে দিবে না। না জানি মাটিতে কোন ক্ষতিকারক উদ্ভিদের বীজ মেশানো আছে।  

[৪] আমাদের সরকার যম্প্রতি যেটা করেছে, আমেরিকা থেকে আমদানি করা তুলার ক্ষেত্রে ওই ফিউমিগেশন এর প্রয়োজনীয়তাটা তুলে দিয়েছে। ওই যে আইনটার কথা বলেছি, সেই আইনের অধীনে যে বিধিমালা রয়েছে সেই বিধিমালা সংশোধন করেছে সরকার, এখন আমেরিকা থেকে তুলা এলে আমাদের বন্দরে সেটাকে আর কীটমুক্ত করার দরকার নেই। বিক্রেতার পণ্যের জন্যে ওর নিজের দেশ থেকে একটা ফাইটোসেনিটারি সার্টিফিকেট বা সেরকম একটা কাগজ নিয়ে আসবে, ব্যাস আমেরিকা থেকে আসা তুলা বন্দরে আর পরীক্ষা হবে না, কীটমুক্ত করা হবে না। খবরের কাগজে আপনারা এই খবর হয়তো দেখেছেন। 

আমার শঙ্কা হচ্ছে যে, এই যে বিধিমালা সংশোধন করা হয়েছে সেই কাজটা করার আগে ঠিকমতো পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হয়েছে কিনা বা প্রাসঙ্গিক তথ্য ইত্যাদি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে কিনা। কটন বোল উইভিল কীট এখনো আমেরিকার তুলাতে রয়ে গেছে। এই কীটটি ওরা আমেরিকাতে খানিকটা নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে বটে, কিন্তু সেটা এখনো রয়েছে। আমেরিকা থেকে তুলা এলে সেটাতে যে এই কীট থাকবে এটা একরকম নিশ্চিত। আর এই কীট আমাদের এখানে ছড়িয়ে পড়লে আমাদের কৃষিতে বিরূপ প্রতিক্রিয়াও পড়বেই। তাইলে আমরা বিধিমালা পাল্টে ফউমিগেশনের প্রয়োজনীয়তা তুলে দিলাম কেন? 

অন্যান্য দেশ কি করেছে? সব দেশই কি আমেরিকার তুলার প্রবেশ এইরকম মুক্ত করে দিয়েছে? এই সংশোধনের ফলে আমেরিকার তুলা রপ্তানিকারকদের সুবিধা হবে, সেঁতা নিশ্চিত। এখনই ওরা বাজারের সিংহভাগ দখল করে আছে, এই পরিবর্তনের ফলে হয়তো আমাদের তুলার বাজার পুরোটাই ওদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। তার পরিবর্তে কি আমরা আমাদের কৃষি ও উদ্ভিদবৈচিত্র্য হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছি না? 

[৫] ভিসা নিয়ে আমার উদ্বেগ নেই। যারা নির্বাচনে বাধা দিতে চায় আর যাদের জন্যে আমেরিকায় যাওয়া জরুরি ওদের হয়তো ভিসা নিয়ে উদ্বেগ হবে। হোক। কিন্তু এর আড়ালে এইরকম একটা জরুরি প্রশ্ন চাপা পড়ে যাবে? কেউ কি এটা নিয়ে কোনো প্রশ্ন করবেন না? রাজনীতিবিদরা? সংবাদকর্মীরা? এনজিও গুলো? পরিবেশকর্মীরা? আপনারা কিছু বলবেন না? লেখক: আইনজীবী। ফেসবুক থেকে 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়