শিরোনাম
◈ যুক্তরাষ্ট্র–ইরান শান্তিচুক্তির ৯ দফা: যা থাকছে সমঝোতায় ◈ ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করলে দেশে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যেত: জামায়াত আমির ◈ সেবায় অবহেলা ও অনিয়মের অভিযোগে ২১ ওমরাহ কোম্পানির লাইসেন্স স্থগিত করল সৌদি ◈ বেরোবির সাবেক ভিসি কলিমুল্লাহকে জামিন দিল হাইকোর্ট ◈ চীনা বিনিয়োগ টানতে বিশেষ পরিকল্পনা, জানালেন বিডা চেয়ারম্যান ◈ শেষ পর্যন্ত থামেনি উত্তেজনা, ২–২ ড্রয়ে শেষ জাপান-নেদারল্যান্ডস লড়াই ◈ গভীর রাতে টেকনাফে গুলিবর্ষণ, আতঙ্কে নির্ঘুম জুম্মাপাড়ার মানুষ ◈ দিল্লিতে প্রবেশে বাধা প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাকে, ফয়েজের ফেসবুক স্ট্যাটাস ◈ দেড় লাখ মানু‌ষের দেশ কুরাসাও বিশ্বকাপ খেল‌ছে, জার্মা‌নির বিরু‌দ্ধে গোলও ক‌রে‌ছে ◈ ইসলামী ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে প্রশাসক নিয়োগ দিল বাংলাদেশ ব্যাংক

প্রকাশিত : ০৫ জানুয়ারী, ২০২৬, ০৯:২৭ সকাল
আপডেট : ১২ জুন, ২০২৬, ১০:০০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

ঢাকাবাসী কেন আন্দোলনের জিম্মি

প্রথম আলো: বিভিন্ন প্রয়োজনে পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে যাঁরা ঢাকায় আসেন, তাঁদের কথায় প্রায়ই ফুটে ওঠে ঢাকাবাসীর জন্য এক মায়াময় বিরক্তি। মায়া আর বিরক্তি শব্দ দুটোকে পাশাপাশি রাখা ভাষাজ্ঞান এমনকি কাণ্ডজ্ঞানের জায়গা থেকেও দুষ্কর। এরপরেও এই দুষ্কর ব্যাপারটা ঘটে ঢাকার সড়কের কুখ্যাত যানজটের কারণে।

শুধু বিদেশি নয়, ঢাকার বাইরে থেকে যাঁরা এই রাজধানী শহরে কোনো কাজের জন্য আসেন, তাঁদের মুখেও ফুটে ওঠে একই অভিব্যক্তি। ঢাকার যানজট তাঁদের অতিষ্ঠ করে দেয়, এবং এই অতিষ্ঠ যানজট যাঁদের নিয়মিত জীবনের সঙ্গী, সেই সব দুর্ভাগার জন্য মায়া হওয়াই স্বাভাবিক। আর জাতিসংঘের তথ্য বলছে, এমন দুর্ভাগার সংখ্যা এখন অন্তত সাড়ে তিন কোটি।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়-অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটসহ বেশ কিছু সংস্থার জরিপ অনুসারে, গত কয়েক বছরে ঢাকার মূল সড়কগুলোতে যানবাহনের গড় গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার। সবশেষ ট্রাফিক পুলিশের তথ্য অনুসারে, ২০২৫ সালে ঢাকার সড়কে যানবাহনের গড় বেড়ে পৌঁছেছে ১১ কিলোমিটারে। ঢাকার যানজট নিরসন ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে ট্রাফিক পুলিশের চেষ্টা অস্বীকার করা যায় না। আবার বাস্তবতাকে সামনে রেখে বিশ্বাসও করা যায় না ঢাকায় ঘণ্টায় ১১ কিলোমিটার গতিবেগের দাবি।

অবশ্য এই অবিশ্বাসের দায় যতটা না ট্রাফিক বিভাগের, তার চেয়ে বেশি নানা বর্গের আন্দোলনকারীদের। একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নানা ইস্যুতে আন্দোলন হবে, সেটাই স্বাভাবিক। গণতন্ত্র অবরুদ্ধ থাকলে আন্দোলন আরও বেশি হবে, সেটাও স্বাভাবিক। তৃতীয় বিশ্বের ইতিহাসে আন্দোলনগুলোই তো জনস্বার্থ রক্ষা ও আদায়ের প্রাণ।

ফলে বিভিন্ন আন্দোলনে যখন নানা পক্ষ সড়ক অবরোধ করে, তখন সড়কপথে চলাচলকারীরা চেষ্টা করে বিরক্তি বা অসহায়ত্বকে চেপে যেতে।

ঢাকার এই অবস্থার কারণে দৈনিক নষ্ট হয় প্রায় ৮২ লাখ কর্মঘণ্টা। অর্থমূল্যে যা দৈনিক প্রায় ১৩৯ কোটি এবং বছরে ৫০ হাজার কোটি টাকার অধিক।

যেহেতু আন্দোলনও হচ্ছে তাঁদের স্বার্থ রক্ষার্থেই। কিন্তু সব আন্দোলন মোটেই জনস্বার্থের আন্দোলন না। নানা বর্গের পেশাজীবীদের দেখি কেবল পেশাগত স্বার্থ রক্ষা করতেই সড়ক অবরোধ করতে। কেন? তাঁদের পেশার সঙ্গে অনেক সময় সাধারণ মানুষের সরাসরি স্বার্থেরও সম্পৃক্ততা থাকে না।

এরপরেও জিম্মি করার জন্য তাঁরা বেছে নেয় ঢাকার রাস্তায় চলাচল করা সাধারণ যাত্রীদের। যাত্রীদের সঙ্গে এতে জিম্মি হয় তাঁদের পেশাজীবন, সামাজিক সম্পর্ক, মানসিক স্বাস্থ্য, এমনকি জাতীয় অর্থনীতিও।

উন্নয়নশীল অন্যান্য দেশের রাজধানীর সঙ্গে তুলনা করলে ঢাকার যান চলাচলের নাজুক অবস্থা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। টমটম ট্রাফিক ইনডেক্স ২০২৪ অনুযায়ী, ম্যানিলায় রাস্তায় গাড়ির গড় গতি ১৯ দশমিক ৩ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টায়। জাকার্তায় ২৪ দশমিক ৪ কিলোমিটার। নয়াদিল্লিতে যানবাহন চলে গড়ে ২৬ দশমিক ৬ কিলোমিটার গতিতে এবং কায়রোতে গতি প্রায় ৩০ কিলোমিটার। ব্যাংকক, হ্যানয় ও লাগোসের অবস্থাও ঢাকার চেয়ে ভালো।

আর ঢাকার এই অবস্থার কারণে দৈনিক নষ্ট হয় প্রায় ৮২ লাখ কর্মঘণ্টা। অর্থমূল্যে যা দৈনিক প্রায় ১৩৯ কোটি এবং বছরে ৫০ হাজার কোটি টাকার অধিক। এই তথ্য ২০২৪ সালের অক্টোবরে দিয়েছিল ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্ট।

এর পুরোটার দায় অবশ্যই যাত্রীদের জিম্মি করে পেশাগত স্বার্থ আদায়ে মগ্ন থাকা আন্দোলনকারীদের নয়। কিন্তু এটাও সত্য যে ঢাকার যানজটের সম্ভাব্য সব প্রস্তুতি মাথায় নিয়েই যাত্রীরা মানসিকভাবে ঘর থেকে বের হন, কিন্তু কারোরই অনুমানে থাকে না, অমুক পেশাজীবীরাও তাঁদের পথরোধ করতে পারে।

টমটম ট্রাফিক ইনডেক্স ২০২৪ অনুযায়ী, ম্যানিলায় রাস্তায় গাড়ির গড় গতি ১৯ দশমিক ৩ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টায়। জাকার্তায় ২৪ দশমিক ৪ কিলোমিটার। নয়াদিল্লিতে যানবাহন চলে গড়ে ২৬ দশমিক ৬ কিলোমিটার গতিতে এবং কায়রোতে গতি প্রায় ৩০ কিলোমিটার। ব্যাংকক, হ্যানয় ও লাগোসের অবস্থাও ঢাকার চেয়ে ভালো।

সম্প্রতি ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেনটিটি রেজিস্টার বা এনইআইআর সংস্কারের দাবিতে দেশের মুঠোফোন ব্যবসায়ীদের একাংশ পরিবার নিয়ে ঢাকার সড়কে নেমেছে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন ১ জানুয়ারি এনইআইআর কার্যক্রম চালু করার পরপরই তাঁরা এই সিদ্ধান্ত নেন। এর আগের দিনগুলোতেই তাঁদের একাংশ বিটিআরসি ভবনে হামলা চালিয়েছে। কোথাও সহিংস হামলা চালানোর চেয়ে রাস্তায় শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি করা অবশ্যই উত্তম।

এই ব্যবসায়ীদের অবশ্য আরেকটা অনানুষ্ঠানিক পরিচয়ও আছে। এই পুরো নেটওয়ার্কটা কোনো আনুষ্ঠানিক নীতি অনুসরণ না করেই বিদেশ থেকে বাণিজ্যিক স্বার্থে দেশে মুঠোফোন নিয়ে আসে। আইনি ভাষায় যাকে বলা হয় পাচার।

মুঠোফোন পাচার শুধু রাষ্ট্রের শুল্কই ফাঁকি দেয় না, বরং জননিরাপত্তার ঝুঁকিও তৈরি করে। কারণ, পাচার হয়ে আসা মুঠোফোনগুলোর কোনো নিরাপত্তা নিশ্চয়তা থাকে না। জানার উপায় থাকে না সেগুলোতে আগে থেকেই কোনো নজরদারি, আড়ি পাতা বা নিরাপত্তাঝুঁকির প্রযুক্তি ইনস্টল করা রয়েছে কি না। কিংবা সেগুলো আগে কোনো অপরাধ সংঘটিত করতে ব্যবহৃত হয়েছে কি না।

এনইআইআর বাস্তবায়ন এসব ঝুঁকি কমাতে নিশ্চয়ই সহায়ক। কিন্তু ব্যবসায়ীদের মনে হচ্ছে, এনইআইআর বাস্তবায়ন হলে তাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বা তাঁদের লাভ কমে যাবে। শেষ পর্যন্ত তাঁদেরও তো জীবিকা, হাজারো মানুষের জীবন বহনের খরচ এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। ফলে তাঁদের দাবি আমলে নিয়ে কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে এনইআইআরের রূপরেখায় বেশ কিছু শিথিলতাও এনেছে।

কিন্তু এরপরেও তাঁদের দাবি মেটেনি। রোববার তাঁরা পরিবার নিয়ে ঢাকার রাস্তায় নামেন কিছু দাবি নিয়ে। দাবিগুলো গুরুত্বহীন নয়। যেমন গুরুত্বহীন নয় ঢাকার রাস্তায় যাত্রীদের মূল্যবান সময়।

ঢাকার সাধারণ যাত্রীদের সঙ্গে মুঠোফোন ব্যবসায়ীদের কোনো স্বার্থ-সংঘাত নেই। তাঁদের দাবিদাওয়ার সঙ্গে নেই প্রত্যক্ষ সম্পর্কও। মুঠোফোন আমদানির কর কমবে কি বাড়বে, এনইআইআর সংস্কার হবে কি হবে না—এসব নীতিগত প্রশ্নে ঢাকার পরিবহনে বসে বা দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীর কোনো ভূমিকা রাখার সুযোগ নেই। তবু সবচেয়ে বড় মূল্যটা দিতে হচ্ছে তাঁদেরই।

সকাল থেকেই রাজধানীর বেশ কিছু প্রধান সড়ক অবরোধ করেন মুঠোফোন ব্যবসায়ীরা। একই সময় নানা সড়কে সহপাঠী হত্যার বিচার ও রাজনৈতিক নেতা হত্যার বিচারের দাবিতে কর্মসূচিতে অবরোধের মুখে পড়ে রাজধানীবাসী। একপর্যায়ে কিছু এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে মুঠোফোন ব্যবসায়ীদের সংঘর্ষেরও ঘটনা ঘটে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাঁদানে গ্যাসের শেল, লাঠিপেটাসহ সহিংস বলপ্রয়োগের শিকার হন মুঠোফোন ব্যবসায়ীরা।

এটা এক আশ্চর্য বিষয়ে যে সহিংস মব ও সংঘবদ্ধ অপরাধের সামনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দায়িত্ব ভুলে যতটা নিষ্প্রাণ দর্শকের ভূমিকায় দাঁড়িয়ে থাকে, আন্দোলন দমনের ক্ষেত্রে তাঁরা যেন হয়ে ওঠে ততটাই সপ্রতিভ, ততটাই বর্বর। মুঠোফোন ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এমন আচরণ অবশ্যই নিন্দনীয়, অমানবিক ও অসহনীয়। কিন্তু সেই নিন্দার আড়ালে কোনোভাবে ঢাকাবাসীকে জিম্মি করার মানসিকতাকে প্রশ্রয় দেওয়ার সুযোগ নেই।

রাজধানীবাসীকে জিম্মি করে তাৎক্ষণিক কিছু দাবি হয়তো আদায় করা সম্ভব। কিন্তু এই ব্ল্যাকমেলের সংস্কৃতি কখনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান বা গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথ তৈরি করতে পারে না।

যে শহরে স্বাভাবিক দিনেই পরিবহনের ঘণ্টায় গড় গতির চেয়ে হাঁটার গতি বেশি থাকে, সেখানে পরিকল্পিত সড়ক অবরোধ কার্যত অচলাবস্থা তৈরি করে। নাগরিকেরা যানজটের সম্ভাব্য সব কারণ মাথায় রেখেই ঘর থেকে বের হন—বৃষ্টি, দুর্ঘটনা, নির্মাণকাজ। কিন্তু তাঁদের অনুমানে কখনো থাকে না, আজ হয়তো আরেকটি পেশাজীবী গোষ্ঠী তাঁদের দৈনন্দিন জীবনকে দর-কষাকষির হাতিয়ার বানাবে। এই বাস্তবতাকে যদি এখন নিয়মিত অভ্যাস ও অনুমানে পরিণত করতে হয়, তবে এই শহরের সাড়ে তিন কোটি মানুষের জন্য এর চেয়ে দুঃখজনক আর কিছু হতে পারে না।

সৈকত আমীন প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়