মনিরুল ইসলাম: দারিদ্র্য বিমোচন, ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম এবং নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ মর্যাদাপূর্ণ ‘হিলারি রোডহ্যাম ক্লিনটন অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছেন শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশের সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) ওয়াশিংটন ডিসির জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তাঁর হাতে এ পুরস্কার তুলে দেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন।
পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, উদ্যোক্তা, শিক্ষাবিদ ও গবেষকসহ প্রায় ৪০০ অতিথি উপস্থিত ছিলেন। আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্যাস্টন হলরুমে অনুষ্ঠিত এ আয়োজনে প্রায় ২৫টি দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানে ড. ইউনূসের নাম ঘোষণার পর উপস্থিত অতিথিরা দাঁড়িয়ে দীর্ঘ সময় করতালির মাধ্যমে তাঁকে সম্মান জানান।
চারজন পেলেন সম্মাননা
এ বছর ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ মোট চারজনকে এ সম্মাননা দেওয়া হয়েছে। অন্য পুরস্কারপ্রাপ্তরা হলেন ভারতের ‘সেলফ-এমপ্লয়েড উইমেনস অ্যাসোসিয়েশন’ (সেবা)-এর পরিচালক রিমা নানাবতী, ফ্যাশন ডিজাইনার ও ‘টোরি বার্চ ফাউন্ডেশন’-এর প্রতিষ্ঠাতা টোরি বার্চ এবং জর্ডানের ‘মাইক্রোফান্ড ফর উইমেন’-এর বোর্ড চেয়ার মুনা সুখতিয়ান।
মুনা সুখতিয়ানকে বিশেষ ‘জর্জটাউন অ্যাম্বাসেডরস অ্যাওয়ার্ড’ দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে ড. ইউনূসের কাজের প্রশংসা করেন হিলারি ক্লিনটন। তিনি বলেন, গ্রামীণ ব্যাংকের কার্যক্রম তিনি নিজে দেখেছেন। এ ব্যাংকের মাধ্যমে নারীরা কীভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন, নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন এবং ক্ষমতায়নের পথে এগিয়েছেন, তা অভূতপূর্ব।
হিলারি ক্লিনটন বলেন, শুধু বাংলাদেশের নারীদের মধ্যেই ড. ইউনূসের কাজ সীমাবদ্ধ থাকেনি; তাঁর উদ্যোগ ও ধারণা ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে।
৫০ বছরের কাজের স্বীকৃতি
পুরস্কার গ্রহণের পর বক্তব্যে ড. মুহাম্মদ ইউনূস তাঁর দীর্ঘ পাঁচ দশকের কাজের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এ সম্মাননা তাঁদের ৫০ বছরের কাজের স্বীকৃতি। জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত এ অনুষ্ঠান বাংলাদেশের মানুষের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পৌঁছে দেবে এবং গ্রামীণ পরিবারের সদস্যদের আরও অনুপ্রাণিত করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
দারিদ্র্য বিমোচন ও নারীর ক্ষমতায়নে গ্রামীণ ব্যাংকের ভূমিকা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ড. ইউনূস বলেন, ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে থাকা মানুষকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। বিশেষভাবে নারীদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানো, নিজেদের দায়িত্ব নিজেরা গ্রহণ করা এবং পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নয়নে তাঁদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তাঁর মতে, এই উদ্যোগের ফলে অনেক দরিদ্র নারীর জীবনে পরিবর্তন এসেছে। আগে যাঁরা নিজেদের প্রয়োজন বা সমস্যার কথা বলতে সংকোচ বোধ করতেন, তাঁদের অনেকেই এখন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজেদের অধিকার ও প্রয়োজন তুলে ধরছেন।
ড. ইউনূস বলেন, গ্রামীণ ব্যাংকের নারী সদস্যরা এখন নিজেদের ব্যাংক পরিচালনায় ভূমিকা রাখছেন। তাঁর বক্তব্যে নারীদের আর্থিক স্বাধীনতা ও আত্মনির্ভরশীলতার বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে আসে।
‘আমরা চাকরিপ্রার্থী নই, আমরা চাকরিদাতা’
বক্তব্যে তরুণদের কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা হওয়ার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। ড. ইউনূস বলেন, ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত পরিবারগুলোর সন্তানদের তিনি একটি বিশেষ বার্তা দিয়েছেন—‘আমরা চাকরিপ্রার্থী নই, আমরা চাকরিদাতা।’
তাঁর মতে, কর্মসংস্থান তৈরির জন্য শুধু চাকরির পেছনে ছুটলে হবে না; নিজের উদ্যোগে ব্যবসা ও প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মানসিকতা তৈরি করতে হবে।
ড. ইউনূস মনে করেন, তরুণদের মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়ার প্রবণতা বাড়াতে পারলে তাঁরা নিজেরাই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারবেন। এতে ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক উন্নতির পাশাপাশি সমাজ ও দেশের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সামাজিক ব্যবসার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান
সামাজিক ব্যবসার ধারণা তুলে ধরে ড. ইউনূস বলেন, এ ধরনের ব্যবসার মূল উদ্দেশ্য ব্যক্তিগত মুনাফা অর্জন নয়; বরং সমাজের বিভিন্ন সমস্যা সমাধান করা।
তিনি জানান, স্বাস্থ্যসেবা খাতে সামাজিক ব্যবসার তহবিলের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন এলাকায় হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও চক্ষু হাসপাতাল গড়ে তুলতে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের উদ্বৃত্ত অর্থ আবার স্বাস্থ্যসেবা খাতেই বিনিয়োগ করা হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
ড. ইউনূসের বক্তব্যে সামাজিক ব্যবসার মাধ্যমে মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ, স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং সামাজিক সমস্যার কার্যকর সমাধান খোঁজার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তনের আহ্বান
বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা নিয়েও নিজের মতামত তুলে ধরেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তাঁর মতে, প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রে তরুণদের চাকরিপ্রার্থী হিসেবে গড়ে তোলে। অথচ শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মানুষের সৃজনশীলতা, উদ্ভাবনী ক্ষমতা ও উদ্যোগী মনোভাব বিকশিত করা।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব শুধু শিক্ষার্থীদের সনদ দেওয়া নয়; বরং তাঁদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি করা।
এ প্রসঙ্গে চলতি বছরের শেষ নাগাদ ‘গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়’ চালুর আশাও প্রকাশ করেন তিনি।
‘তিন শূন্যের পৃথিবী’ গড়ার প্রত্যাশা
ড. ইউনূসের বক্তব্যে গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্ভাব্য ভূমিকার বিষয়টিও উঠে আসে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এ বিশ্ববিদ্যালয় ‘তিন শূন্যের পৃথিবী’ গড়ে তোলার প্রচেষ্টায় নেতৃত্ব দিতে পারবে।
ড. ইউনূসের বহুল আলোচিত ‘তিন শূন্যের পৃথিবী’ ধারণার মূল লক্ষ্য হলো শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব এবং শূন্য নিট কার্বন নিঃসরণ। এ ধারণার মাধ্যমে তিনি এমন একটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা বলেন, যেখানে মানুষ শুধু চাকরি খোঁজার পরিবর্তে নিজের উদ্যোগে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এবং পরিবেশের প্রতিও দায়িত্বশীল থাকবে।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের শুধু সনদ অর্জনের পেছনে না ছুটে উদ্যোক্তা হওয়ার বিষয়ে উৎসাহিত করতে হবে। ব্যবসা শুরু করার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়নসহ অন্যান্য সহায়তা নিশ্চিত করার বিষয়টিও গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনায় গুরুত্ব পাবে বলে তিনি জানান।
ড. ইউনূসের আশা, শিক্ষাক্ষেত্রে এ উদ্যোগ নতুন সম্ভাবনার সূচনা করবে এবং তরুণদের নিজস্ব উদ্যোগে কর্মসংস্থান তৈরিতে উৎসাহিত করবে।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও বাংলাদেশের জন্য বার্তা
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের হাতে ‘হিলারি রোডহ্যাম ক্লিনটন অ্যাওয়ার্ড’ তুলে দেওয়ার ঘটনা তাঁর দীর্ঘদিনের ক্ষুদ্রঋণ, সামাজিক ব্যবসা ও নারীর ক্ষমতায়নবিষয়ক কাজের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা, নারীদের আর্থিক স্বাধীনতা বাড়ানো এবং তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়ে তাঁর বক্তব্য অনুষ্ঠানে গুরুত্ব পেয়েছে।
পুরস্কার গ্রহণের পর ড. ইউনূস যে বার্তাটি সামনে এনেছেন, তার কেন্দ্রে রয়েছে আত্মনির্ভরশীলতা, সামাজিক সমস্যার সমাধান এবং উদ্যোক্তাভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলার ধারণা। তাঁর মতে, শিক্ষা, অর্থায়ন ও সামাজিক উদ্যোগকে সমন্বিতভাবে কাজে লাগানো গেলে দারিদ্র্য হ্রাস এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির নতুন পথ তৈরি হতে পারে।
জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের এ অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে ড. ইউনূস বাংলাদেশের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা ও ক্ষুদ্রঋণের ভূমিকা তুলে ধরার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য উদ্যোক্তাবান্ধব শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেছেন। তথ্য সূত্র : বাসস