অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি), দ্য নেশন, থাইল্যান্ড: আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলন ঘিরে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে বিক্ষোভ করেছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। ঋণসংকটে থাকা নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর ঋণ বাতিল, বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের ভর্তুকি বন্ধ, সম্পদশালীদের ওপর বেশি কর আরোপ এবং অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
বৃহস্পতিবারের পর আজও (শুক্রবার) সম্মেলনস্থলের দিকে বিক্ষোভ মিছিল করেন আন্দোলনকারীরা।
থাইল্যান্ডের সংবাদমাধ্যম দ্য নেশন জানায়, শুক্রবার অ্যাসেম্বলি অব দ্য পুওর নামের সংগঠনের প্রায় ৫০০ সদস্য ব্যাঙ্ককের লুমফিনি পার্কের গেট-১ এলাকায় জড়ো হন। সেখান থেকে তারা কুইন সিরিকিত ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারের (কিউএসএনসিসি) দিকে মিছিল নিয়ে যাওয়ার কর্মসূচি নেন। সম্মেলনস্থলের আশপাশে পুলিশের কঠোর নিরাপত্তা ছিল। বিক্ষোভকারীরা সেখানে ছয় দফা দাবি তুলে ধরার উদ্যোগ নেন।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) জানায়, বৃহস্পতিবারও কয়েক ডজন বিক্ষোভকারী সম্মেলনস্থলের দিকে মিছিল করেন। তাদের কারো কারো মুখে ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভাসহ বিশ্বনেতাদের মুখোশ। ডলারের চিহ্নযুক্ত চোখসহ বড় গোলাপি শূকরের একটি প্রতীকী কাঠামো নিয়ে মিছিল করেন তারা।
এতে সম্মেলনস্থলের কাছাকাছি সড়কে কিছু সময়ের জন্য যান চলাচল ব্যাহত হয়। এ সময় পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তির ঘটনাও ঘটে।
ছয় দফা দাবি
বিক্ষোভকারীদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে ঋণসংকটে থাকা নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর ঋণ বাতিল, সরকারের বিদেশি ঋণের বিষয়ে জনসাধারণের নজরদারির সুযোগ এবং বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের জন্য ভর্তুকি বন্ধ করা। ভর্তুকির অর্থ কৃষি ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদনব্যবস্থায় ব্যয় করারও দাবি জানান তারা।
এ ছাড়া করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও সম্পদশালীদের ওপর প্রগতিশীল কর আরোপের মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব বাড়ানো, কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আরো গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক করা এবং অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে মানুষ ও পরিবেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান আন্দোলনকারীরা।
দ্য নেশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুক্রবারের মিছিলে শ্রমজীবী মানুষ, কৃষক, শহরের দরিদ্র জনগোষ্ঠী ও বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
এর আগের দিন বৃহস্পতিবার পিপলস নেটওয়ার্ক অ্যাগেইনস্ট দ্য ওয়ার্ল্ড ব্যাংক অ্যান্ড আইএমএফ এবং কয়েকটি নাগরিক সংগঠনের সদস্যরা ব্যাংককের রামা-৪ মোড়ের কাছে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন।
দ্য নেশন জানায়, শুক্রবারও তাদের একাংশের অবস্থান অব্যাহত ছিল। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সরকারের ঋণ ও উন্নয়ননীতি নিয়ে আলোচনা শুধু অর্থায়নের বিষয় নয়; এসব সিদ্ধান্ত দেশের উন্নয়নের গতিপথ, মানুষের অধিকার ও সামাজিক সুরক্ষার ওপরও প্রভাব ফেলে। তাই নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা ও জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
ঋণ ও বৈষম্য নিয়ে উদ্বেগ
বিশ্ব অর্থনীতিতে ঋণের চাপ, জ্বালানির উচ্চমূল্য এবং জলবায়ুজনিত ঝুঁকি বাড়ার প্রেক্ষাপটে এবারের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এসব চাপ উন্নয়নশীল ও নিম্ন আয়ের দেশগুলোর অর্থনীতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়কে আরো কঠিন করে তুলছে।
এপি জানায়, বৃহস্পতিবারের বিক্ষোভে পারিবারিক ঋণ, দারিদ্র্য, পরিবেশদূষণ ও জলবায়ুজনিত দুর্ভোগের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। আন্দোলনকারীদের মতে, অর্থনৈতিক সংকটের বোঝা সমাজের দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে বেশি বহন করতে হচ্ছে। তাই আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নীতিতে বৈষম্য কমানো, সামাজিক সুরক্ষা বাড়ানো এবং পরিবেশের ক্ষতি কমানোর বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া দরকার।
সম্মেলনস্থল ও আশপাশের এলাকায় পুলিশের কঠোর নিরাপত্তা ছিল। দ্য নেশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সমাবেশসংক্রান্ত বিধি-নিষেধের কারণে বিক্ষোভকারীদের পক্ষে সম্মেলনস্থলে সরাসরি গিয়ে তাদের দাবি তুলে ধরা কঠিন হয়ে পড়ে।
বিক্ষোভকারীদের এসব দাবি আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণনীতি, উন্নয়ন অর্থায়ন ও জবাবদিহি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ককে সামনে এনেছে। তবে এসব দাবির বিষয়ে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে বিক্ষোভের পরিপ্রেক্ষিতে কোনো নির্দিষ্ট প্রতিক্রিয়া পাওয়ার তথ্য সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ করা হয়নি।