শিরোনাম
◈ গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেই হবে সাইবার সুরক্ষা আইন: তথ্যমন্ত্রী ◈ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস  বাণিজ্যে আ‌মে‌রিকার পর রাশিয়ারও নজর এবার বাংলাদেশে ◈ নারী এশিয়া কা‌পের সে‌মিফাইনা‌লে আজ রা‌তে বাংলা‌দেশ-ভারত মু‌খোমু‌খি ◈ ভার‌তে ব্রিকস স‌ম্মেল‌নে যা‌চ্ছেন না প্রধানমন্ত্রী : হুমায়ুন কবির ◈ তৃতীয় এলএনজি টার্মিনালে খরুচে চীনা কোম্পানিকেই কেন সরকারের পছন্দ ◈ শিক্ষককে হানিট্র্যাপে ফেলে টাকা আদায়, নারীসহ গ্রেপ্তার ৪ ◈ যুদ্ধ শুরুর পর সবচেয়ে বড় আঘাত করল ইরান ◈ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় পরিচয় নয়, বৈধ প্রার্থিতাই মূল: প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম ◈ মির্জা ফখরুলের ঠাকুরগাঁও-১ আসনে ভোট ২৯ অক্টোবর ◈ প্রতি মাসে ভ্যাট রিটার্ন জমার বাধ্যবাধকতা ফিরছে, অনুমোদনের পর প্রস্তাব উঠবে সংসদে

প্রকাশিত : ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০২:৩৮ দুপুর
আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০২:৩৮ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

তৃতীয় এলএনজি টার্মিনালে খরুচে চীনা কোম্পানিকেই কেন সরকারের পছন্দ

যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানির যে প্রস্তাব ‘প্রত্যাখ্যাত’ হয়েছে, তার সঙ্গে চীনা কোম্পানির দরপত্রের নথি প্রায় হুবহু মিলে গেছে।

তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণে সরকার যে প্রস্তাবটি বিবেচনা করছে, ৩৮ দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি কোম্পানির দেওয়া আরেকটি প্রস্তাবের সঙ্গে প্রায় হুবহু মিলে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি এনএস এনার্জি নেভিগেশনের প্রধান নির্বাহী ক্ষমতাসীন দলের একজন সংসদ সদস্যের নাতি। ফলে বাছাই প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

দুটি প্রস্তাবের মধ্যে মিল এতটাই বেশি যে, চায়না ন্যাশনাল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি (সিএনইই) ১৯ জুন যে প্রস্তাব জমা দিয়েছে, তাতে থাকা একটি প্রকল্পের মানচিত্রে আগের প্রস্তাবদাতার নাম রয়ে গেছে: ‘প্রোপোজড এনএস এনার্জি এফএসআরইউ’।

অন্য কয়েকটি বৈশ্বিক কোম্পানি কম দর প্রস্তাব করলেও ২৮ জুলাই অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি সিএনইইর প্রস্তাবটি নীতিগত অনুমোদন দেয়।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকলেও নিউইয়র্কভিত্তিক কোম্পানি এনএস এনার্জি নেভিগেশন একই প্রকল্পের জন্য ১২ মে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে স্বতঃপ্রণোদিত একটি প্রস্তাব দেয়।

এনএস এনার্জি নেভিগেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তারিফ রহমান। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ আসনের সংসদ সদস্য এবং অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান মুশফিকুর রহমানের নাতি।

একটি জাতীয় দৈনিক তুলনামূলক পর্যালোচনা করে দেখেছে, প্রস্তাব দুটির বড় অংশ প্রায় হুবহু মিলে যায়। এর মধ্যে রয়েছে প্রকল্পটির যৌক্তিকতা, কারিগরি বৈশিষ্ট্য, চুক্তির কাঠামো, বাস্তবায়ন সময়সূচি এবং প্রকল্প বাস্তবায়নকারী ও সরকারের দায়িত্ব।

এই মিল কেবল অভিন্ন কারিগরি বিষয়গুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রস্তাব দুটিতে প্রায় একই ভাষা, একই বাণিজ্যিক বিকল্প, কাছাকাছি বাস্তবায়ন সময়সূচি এবং চুক্তির ব্যবস্থা ও পক্ষগুলোর দায়িত্বের অনুরূপ বর্ণনা দেখা গেছে।

অথচ ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) নির্মাণে পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকলেও চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটির প্রস্তাবই সরকার পরবর্তীতে জিটুজি (সরকার থেকে সরকার) ব্যবস্থায় এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

সিএনইই ১৫ বছরের জন্য প্রতিদিন ৩ লাখ ৪২ হাজার ডলার চাচ্ছে। বাংলাদেশ বিদ্যমান দুটি টার্মিনালের জন্য বর্তমানে যে অর্থ ব্যয় করে, এটি তার চেয়ে প্রায় ৩৫ থেকে ৩৭ শতাংশ বেশি এবং রাষ্ট্রায়ত্ত রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানির (আরপিজিসিএল) বেঞ্চমার্কের চেয়ে প্রায় ৪৩ শতাংশ বেশি।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তুলনামূলক মূল্যায়নে দেখা যায়, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে আরামকোর দেওয়া প্রতিদিন ১ লাখ ৯০ হাজার ডলারের প্রস্তাবের তুলনায়ও এটি প্রায় ৮০ শতাংশ বেশি।

সিএনইইর জমা দেওয়া প্রস্তাব তাদের প্রস্তাবের সঙ্গে কীভাবে মিলে গেল জানতে চাইলে এনএস এনার্জির প্রধান নির্বাহী তারিফ বলেন, তাদের ধারণা, সরকারি সংস্থায় জমা দেওয়া নথি প্রায়ই কপি করে তৃতীয় পক্ষের কাছে সরবরাহ করা হয়।

তিনি বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়ার পর তথ্য বা নথিপত্র কীভাবে ছড়িয়ে পড়ছে, তার ওপর আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।’

তবে তারিফ মনে করেন, একই প্রকল্পের চাহিদা, কারিগরি বিষয় ও কাজের পরিধির ভিত্তিতে কোম্পানিগুলো প্রস্তাব দেওয়ায় প্রস্তাবগুলোর মধ্যে কিছু মিল থাকা অস্বাভাবিক নয়।

দ্য ডেইলি স্টার তুলনা করে দেখেছে, এসব অভিন্ন বিষয় ছাড়াও প্রস্তাব দুটির মধ্যে উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রায় একই ভাষা, একই বাণিজ্যিক কাঠামো ও বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা এবং সিএনইইর প্রস্তাবে থাকা এমন একটি প্রকল্পের মানচিত্র, যাতে এখনো এনএস এনার্জির নাম রয়েছে।

সরকারে তার নানার পদ স্বার্থের সংঘাত (কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট) বা বিশেষ সুবিধা পাওয়ার সুযোগের ধারণা তৈরি করতে পারে কি না জানতে চাইলে তারিফ বলেন, ‘আমার নানা এনএস এনার্জির সঙ্গে যুক্ত নন, যেখানে আমি একজন কর্মচারী, এবং আপনি যে প্রক্রিয়ার কথা জানতে চাচ্ছেন, তাতে তার কোনো ভূমিকা নেই।’

তারিফ বলেন, মুশফিকুর অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান। এফএসআরইউ প্রকল্প মূল্যায়ন, বাছাই বা অনুমোদনে এই কমিটির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনো ভূমিকা নেই। এই কাজ করে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি এবং মুশফিকুর সেই কমিটির সদস্য নন।

আওয়ামী লীগ সরকার পাঁচ মাস আগে যে চুক্তি করেছিল, ২০২৪ সালের অক্টোবরে পেট্রোবাংলা সামিট পাওয়ারের সেই চুক্তি বাতিল করার পর তৃতীয় এফএসআরইউর জন্য অন্তর্বর্তী সরকার বা বর্তমান সরকার কেউই আগ্রহপত্র আহ্বান করেনি।

এনএস এনার্জি নেভিগেশন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে তাদের প্রস্তাব জমা দেয়। তবে কোনো জবাব পায়নি এবং প্রস্তাব জমা দেওয়ার পর সরকারের পক্ষ থেকে আর যোগাযোগও করা হয়নি।

তারিফ বলেন, ‘এখন আমরা গণমাধ্যমের মাধ্যমে জানতে পারছি যে, সরকার জিটুজি ভিত্তিতে একটি চীনা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এগোচ্ছে, যার অর্থ আমাদের প্রস্তাব বিবেচনা করা হয়নি।’

এ ব্যাপারে মন্তব্য জানতে দ্য ডেইলি স্টারের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলেও সিএনইই কোনো জবাব দেয়নি।

অন্যান্য বৈশ্বিক কোম্পানি তুলনামূলক অনেক ভালো প্রস্তাব দিলেও সিএনইইর সঙ্গে দ্রুত চুক্তি করতে সরকারের তৎপরতা রহস্যজনক।

গত ২৯ অক্টোবর একটি সরকারি তুলনামূলক মূল্যায়নে দেখা যায়, দেশে বিদ্যমান দুটি টার্মিনালের পাশাপাশি আরামকো, ওমানের ওকিউ ট্রেডিং, আজারবাইজানের সোকার ও চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশনের (সিএমসি) প্রস্তাবিত এফএসআরইউগুলোর মূল্যায়ন করা হয়েছিল। সিএমসি সিএনইইর একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান।

মূল্যায়নে উল্লেখ করা চারটি প্রস্তাবের প্রতিটির দৈনিক ফি পরবর্তীতে সিএনইইর সঙ্গে সমঝোতা করা প্রতিদিন ৩ লাখ ৪২ হাজার ডলারের প্রস্তাবের চেয়ে কম ছিল।

আরামকো ট্রেডিং সিঙ্গাপুর প্রতিদিন ১ লাখ ৯০ হাজার ডলারের সর্বনিম্ন ফি প্রস্তাব করে। এরপর ছিল সিএমসি—২ লাখ ২৫ হাজার ডলার, সোকার ২ লাখ ৮৮ হাজার ডলার ও ওকিউ ট্রেডিং ২ লাখ ৯৬ হাজার ডলার প্রস্তাব করেছিল।

নথিতে অনুসারে, আরামকো ১৫ বছরের চুক্তির আওতায় ১ লাখ ৭৩ হাজার ৬১১ ঘনমিটার এলএনজি ধারণক্ষমতা, প্রতিদিন ৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) রিগ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা এবং সর্বোচ্চ ৯৫০ এমএমসিএফডি সক্ষমতার একটি এফএসআরইউ প্রস্তাব করেছিল। এর নির্মাণকাল ধরা হয়েছিল ১২ থেকে ১৮ মাস।

বিপরীতে, সিএনইই প্রায় ১ লাখ ৭৪ হাজার ঘনমিটার ধারণক্ষমতা, ৬০০ এমএমসিএফডি বেস রিগ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা এবং সর্বোচ্চ ৭৫০ এমএমসিএফডি সক্ষমতার একটি এফএসআরইউ প্রস্তাব করছে। এর দৈনিক ফি ৩ লাখ ৪২ হাজার ডলার, যার মধ্যে ২ লাখ ৪৬ হাজার ডলার নির্ধারিত চার্জ, ৫৯ হাজার ডলার পরিচালন ব্যয় এবং ৩৭ হাজার ডলার বন্দর সেবা ফি।

২০২৫ সালের অক্টোবরের মূল্যায়নে আরামকোর প্রস্তাবিত জাহাজটি ২০১১ সালে নির্মিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে সিএনইইর প্রস্তাবিত জাহাজটি ২০১৬ সালে নির্মিত।

বিদ্যমান এক্সিলারেট এনার্জি ও সামিট টার্মিনালের কার্যকর দৈনিক ব্যয় যথাক্রমে ২ লাখ ৫৪ হাজার ও ২ লাখ ৪৯ হাজার ডলার।

প্রক্রিয়াটির সঙ্গে যুক্ত জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে দ্য ডেইলি স্টার জানতে পেরেছে, আরামকোর প্রস্তাব নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অন্তর্বর্তী সরকার ওই তুলনামূলক মূল্যায়ন ব্যবহার করেছিল।

পরবর্তীতে আরপিজিসিএল গত বছরের নভেম্বরে বিদ্যমান প্রস্তাবগুলো ব্যবহার করে একটি সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনা করে। এতে হিসাব করা হয়, পরিচালন ও বন্দর সেবা ফিসহ নতুন একটি এফএসআরইউর সম্মিলিত দৈনিক ব্যয় ২ লাখ ৪০ হাজার ডলারের সামান্য কম হতে পারে।

এই ব্যয় বাংলাদেশের বিদ্যমান দুটি এফএসআরইউর কার্যকর ব্যয় এবং সামিট গ্রুপের প্রস্তাবিত দ্বিতীয় এফএসআরইউর প্রতিদিন ৩ লাখ ডলারের চুক্তি মূল্যের চেয়ে কম ছিল।

কর্মকর্তাদের ভাষ্য, পরবর্তী সময়ে আরামকোর উদ্যোগটি মন্ত্রিসভা কমিটি পর্যায়ে নীতিগত অনুমোদন পেলেও অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে তা চূড়ান্ত করা হয়নি।

তৎকালীন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান পরে বলেছিলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে তৃতীয় এফএসআরইউসহ বেশ কয়েকটি বড় বিনিয়োগ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেন, আমরা আশা করেছিলাম, নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আরামকোর উদ্যোগটি পুনরুজ্জীবিত হবে।

কিন্তু এরপর ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হওয়ায় পরিস্থিতি বদলে যায়।

জ্বালানি বিভাগের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘যুদ্ধের কারণে আরামকো সবচেয়ে কম সময়ে এফএসআরইউ সরবরাহের নিশ্চয়তা দিতে পারেনি। এই কারণে বর্তমান সরকার সিএনইইর সঙ্গে এগোচ্ছে, কারণ তারা ১৮ মাসের মধ্যে এফএসআরইউ সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে।’

তবে ২০২৫ সালের অক্টোবরের তুলনামূলক মূল্যায়নে আরামকোর প্রস্তাবিত নির্মাণকাল ১২ থেকে ১৮ মাস উল্লেখ করা হয়েছিল। চূড়ান্ত বিনিয়োগ সিদ্ধান্তের পর ওকিউ ও সোকার ১৮ মাস করে সময় প্রস্তাব করেছিল, আর সিএমসি প্রস্তাব করেছিল ৩০ মাস।

তবে ৩০ আগস্টের সিএনইইর সঙ্গে আলোচনাসংক্রান্ত কমিটির প্রতিবেদনে দেখা যায়, চীনা কোম্পানিটির ১৮ মাসের লক্ষ্যমাত্রা চূড়ান্ত নয়।

এতে চলতি মাস থেকে ১৮ মাস হিসাব করে ২০২৮ সালের এপ্রিলে সম্ভাব্য চালুর তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বর্ষার কারণে এফএসআরইউ সংযুক্তি বিলম্ব হতে পারে বিবেচনায় সর্বশেষ চালুর তারিখ হিসেবে ওই বছরের নভেম্বর, অর্থাৎ ২৬ মাস পর্যন্ত সময় রাখার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

সিএনইইর সঙ্গে মূল্য নিয়ে আলোচনায় সরবরাহের সময়সীমা একটি বিবেচ্য বিষয় ছিল।

আলোচনা সংক্রান্ত কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতির পরিবর্তন, জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা, জাহাজ নির্মাণ সামগ্রীর বাড়তি ব্যয় ও বিশ্বব্যাপী এফএসআরইউর চাহিদা বৃদ্ধির পাশাপাশি ১৮ মাসের মধ্যে সরবরাহের বাধ্যবাধকতায় প্রস্তাবিত মূল্য আর কমাতে না পারা অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে সিএনইই।

এদিকে, সিএনইইর সঙ্গে আলোচনা চলার সময় আরেকটি চীনা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান চায়না মার্চেন্টস ইন্ডাস্ট্রি (সিএমআই) সরকারের কাছে পৃথক একটি প্রস্তাব জমা দেয়।

সিএমআই ও ইউ লিয়েন ডকইয়ার্ডস যৌথভাবে ১১ আগস্ট এমন একটি টার্মিনালের প্রস্তাব জমা দেয়, যাতে দুটি ভাসমান জাহাজ থাকবে—একটি স্টোরেজ ইউনিট এবং অন্যটি পৃথক স্টোরেজ ও রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট।

তারা প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার ঘনমিটার সম্মিলিত এলএনজি ধারণক্ষমতা এবং ৭০০ এমএমসিএফডি ধারাবাহিক গ্যাস সরবরাহ সক্ষমতার প্রস্তাব দেয়। বিপরীতে, সিএনইইর প্রস্তাবিত সক্ষমতা ১ লাখ ৭৪ হাজার ঘনমিটার ও ৬০০ এমএমসিএফডি।

সিএমআই দুটি বাণিজ্যিক কাঠামোর প্রস্তাব দেয়: একটি হলো ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রকিউরমেন্ট, কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ফিন্যানসিং ব্যবস্থা, যার আওতায় সরকার আনুমানিক ৩৫ কোটি ডলারে প্রকল্পটি কিনবে; অন্যটি হলো প্রতিদিন ১ লাখ ডলারে দুটি জাহাজ ১২ বছরের জন্য ইজারা নেওয়া, যেগুলো পরবর্তীতে পেট্রোবাংলার কাছে হস্তান্তর করা হবে।

তাদের মডেলে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় ধরা হয়েছে বছরে ২ কোটি ৪০ লাখ ডলার।

দ্য ডেইলি স্টারের হাতে আসা মন্ত্রণালয়ের এক তুলনামূলক মূল্যায়নে দেখা গেছে, ১৫ বছরে সিএনইইকে মোট পরিশোধ করতে হবে প্রায় ১ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলার।

সিএমআইয়ের ‘ক্রয় মডেলে’ ১৫ বছরের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৮১১ মিলিয়ন ডলার এবং ‘ইজারা বা লিজ মডেলে’ এই ব্যয় ধরা হয়েছে ৭৯৮ মিলিয়ন ডলার।

ওই মূল্যায়নে বলা হয়েছে, সিএমআইয়ের প্রস্তাবিত দুটির যেকোনো একটি বিকল্প বেছে নিলে সরকারের অন্তত ১ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় হতে পারে।

সিএনইইর ফি প্রতিদিন ৩৭ হাজার ডলারের মধ্যে বন্দর সেবা ব্যয় অন্তর্ভুক্ত থাকলেও সিএমআই আপাতত তা বাদ দিয়েছে। তাই আরও রক্ষণশীল তুলনার জন্য মূল্যায়নে সিএনইইর ব্যয় থেকে ওই চার্জ বাদ দিয়ে হিসাব করা হয়েছে।

সেই হিসাবেও দেখা যায়, ১৫ বছরে সিএমআইর বিকল্পগুলোতে ব্যয় প্রায় ৮৫ কোটি ৯০ লাখ থেকে ৮৭ কোটি ২০ লাখ ডলার কম হবে।

সিএমআই প্রায় ৬১ শতাংশ বেশি এলএনজি ধারণক্ষমতা এবং ১০০ এমএমসিএফডি বেশি ধারাবাহিক গ্যাস সরবরাহ সক্ষমতার প্রস্তাবও দিয়েছে।

কোনো দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি দেওয়ার আগে একই কারিগরি চাহিদা, বাণিজ্যিক পরিধি ও আর্থিক মডেলের ভিত্তিতে সিএমআই এবং অন্যান্য যোগ্য পক্ষকে প্রস্তাব জমা দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানোর সুপারিশ করা হয়েছে ওই মূল্যায়নে।

তবে দ্রুত আরেকটি এফএসআরইউ পেতে বেশি ব্যয় করাই যৌক্তিক বলে সরকার এখনো মনে করছে।

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে দ্রুত আরেকটি এফএসআরইউ নিশ্চিত করাই সরকারের অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তিনি বলেন, ‘দ্রুত একটি চীনা এফএসআরইউ পেতে কিছু অতিরিক্ত ব্যয় মেনে নিতে হতে পারে।’

বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ঘাটতির কারণে যে অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে, তা টার্মিনালের অতিরিক্ত ব্যয়ের চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে, যোগ করেন তিনি।

তবে সরকারের নিজস্ব আলোচনা সংক্রান্ত কমিটিই এর আগে স্বীকার করেছিল, বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রচলিত রিগ্যাসিফিকেশন ফি কিছুটা বাড়ানো যৌক্তিক হতে পারে, তবে আরও মূল্যায়ন ছাড়া সেই বৃদ্ধি কতটা যুক্তিসঙ্গত হবে তা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। উৎস: ডেইলি স্টার।

 

  • সর্বশেষ