প্রায় ৯ বছর বিশ্বের অন্যতম বড় শরণার্থীসংকটের ভার বহন করছে বাংলাদেশ। একের পর এক দ্বিপক্ষীয় আলোচনা, আন্তর্জাতিক উদ্যোগ এবং জাতিসংঘের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের কোনো উদ্যোগই শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। হয়নি কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি। এবার সেই অচলাবস্থা ভাঙতে নতুন কূটনৈতিক কর্মপরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নেমেছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। এ লক্ষ্যে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছা, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে পাঁচটি অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নতুন অনুপ্রবেশ ঠেকানো, মিয়ারমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ জোরদার করা, জাতিসংঘের প্ল্যাটফর্মকে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার, মালয়েশিয়া-চীন-যুক্তরাষ্ট্র, ভারতসহ প্রভাবশালী দেশগুলোর সমন্বিত ভূমিকা নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখা। আগামী সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের অধিবেশনে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়ে জোরালো দাবি তুলে ধরবে বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
বাংলাদেশে কর্মরত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসনবিষয়ক কমিশনারের কার্যালয় সূত্রও জানায়, সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) অধিবেশনকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যে নতুন কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে ঢাকা। সরকারের লক্ষ্য, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে একই অবস্থানে এনে মিয়ানমারের ওপর কার্যকর ও সমন্বিত চাপ সৃষ্টি করা।
সূত্র জানায়, সম্প্রতি জাতিসংঘের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। তিনি ৮ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব বুঝে নেবেন। সভাপতির এই পদকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে শক্তভাবে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এ ছাড়া রোহিঙ্গা ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র, চায়না, মালয়েশিয়া, ভারতকে সঙ্গী করে একটি মিত্র জোট গঠন করে মিয়ানমারের ওপর বৈশ্বিকভাবে চাপ সৃষ্টির পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলেও জানা গেছে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসনবিষয়ক কমিশনার মিজানুর রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যা তো অনেক পুরোনো। নতুন সরকার এটাতে নতুনভাবে মোকাবিলা করতে চায়। আন্তর্জাতিক মহলের মাধ্যমে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করাকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সরকারি সূত্র জানায়, সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সভাপতি করে ১১ সদস্যের ‘রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতীয় কৌশল প্রণয়ন কমিটি’ গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রধান সমন্বয়কারীর দায়িত্বে রয়েছেন সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও)। সদস্যসচিব করা হয়েছে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) মহাপরিচালককে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের উপদেষ্টা, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি), জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) মহাপরিচালক, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর মহাপরিচালক, বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের মহাপরিচালক কমিটির সদস্য।
অর্থ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশ জোরালোভাবে তুলে ধরবে যে রোহিঙ্গাসংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে, তাই এর স্থায়ী সমাধানও সেখানেই। নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব, বসতভিটা এবং মৌলিক অধিকার নিশ্চিত না হলে কোনো প্রত্যাবাসন টেকসই হবে না- এ বার্তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরা হবে। এবার শুধু মানবিক সংকট নয়; রোহিঙ্গা ইস্যুকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সীমান্ত স্থিতিশীলতা, মানব পাচার, আন্তদেশীয় অপরাধ এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের নিরাপত্তার সঙ্গেও যুক্ত করে আন্তর্জাতিক মহলের সামনে উপস্থাপন করবে বাংলাদেশ।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, এককভাবে কোনো দেশের পক্ষে মিয়ানমারকে কার্যকরভাবে প্রত্যাবাসনে রাজি করানো সম্ভব নয়। বহুপক্ষীয় চাপই এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক হাতিয়ার। বিএনপি সরকারের নতুন উদ্যোগ বিষয়ে তাঁরা মনে করেন, নতুন কর্মপরিকল্পনা ইতিবাচক হলেও সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত এবং রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতির মধ্যে। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত না হলে অতীতের মতো ভবিষ্যতেও প্রত্যাবাসন উদ্যোগ স্থবির হয়ে পড়তে পারে। সাম্প্রতিক সংঘাত ও সীমান্ত পরিস্থিতিও এই প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলেছে।
জানা যায়, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে জাতিসংঘের অবস্থান স্পষ্ট করতে গত বছরের ১৩ থেকে ১৬ মার্চ চার দিনের সফরে বাংলাদেশে এসে ১৪ মার্চ কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করেন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। সফরকালে তিনি তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে শরণার্থী পরিস্থিতি পরিদর্শন করেন। তখন তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, রোহিঙ্গাদের স্থান বাংলাদেশে নয়; তাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে। তবে প্রত্যাবাসন অবশ্যই হতে হবে নিরাপদ, স্বেচ্ছাসেবী, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই। এজন্য মিয়ানমারে নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব এবং মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। এরপর রোহিঙ্গাসংকটকে আন্তর্জাতিক অগ্রাধিকারের তালিকায় রাখতে ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সদর দপ্তরে প্রথমবারের মতো রোহিঙ্গা ও মিয়ানমারের অন্য সংখ্যালঘুদের পরিস্থিতি নিয়ে বিশেষ উচ্চপর্যায়ের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে নিরাপদ, স্বেচ্ছাসেবী ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু সে উদ্যোগও কোনো কাজে আসেনি। বরং এরপর নতুন করে আরও কিছু রোহিঙ্গাকে বলপূর্বক অনুপ্রবেশ করিয়েছে মিয়ানমার।
এমনি এক পরিস্থিতিতে সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) অধিবেশনের পাশাপাশি রোহিঙ্গাসংকট নিয়ে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। এই অধিবেশন সামনে রেখে আন্তর্জাতিক মহলের মাধ্যমে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছাসেবী ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের দাবিতে নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। উৎস: বিডি-প্রতিদিন।