শিরোনাম
◈ পোশাক শিল্পের বিকাশে প্রয়োজনীয় সব সহযোগিতার আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর ◈ দিল্লিতে অন্ধকারে আবারও প্রবল লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ, ইন্টারনেট বন্ধ, পুলিশকে ধাওয়া দিলো বিক্ষোভকারীরা(ভিডিও) ◈ বেনজীর প্রত্যর্পণ: বাংলাদেশের নথিতে কী খুঁজছে দুবাই কর্তৃপক্ষ? ◈ প্রবাসীরা চাইলে বাড়ি পাহারায় আনসার সদস্য নিয়োগ: সিলেটের ডিসি ◈ নারায়ণগঞ্জের জলাবদ্ধতার পর রূপগঞ্জে সাপ আতঙ্ক, ঘরবাড়িতে ঢুকছে বিষধর সাপ ◈ আগস্টে তফসিল, অক্টোবরে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পরিকল্পনা ইসির ◈ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৬.৪৭ বিলিয়ন ডলার ◈ জ্বালানি নিরাপত্তায় সৌরবিদ্যুৎ ◈ এবার শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে সমর্থন দিয়ে যা বললেন সালমান খান ◈ গাড়িচালককে মারধর ও শ্বাসরোধে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে এমপি গাজী নজরুলের বিরুদ্ধে মামলা

প্রকাশিত : ২৩ জুলাই, ২০২৬, ০১:৩৬ রাত
আপডেট : ২৩ জুলাই, ২০২৬, ০২:০২ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

বেনজীর প্রত্যর্পণ: বাংলাদেশের নথিতে কী খুঁজছে দুবাই কর্তৃপক্ষ?

পলাতক সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর আগে মামলার আইনি ভিত্তি, অভিযোগের প্রকৃতি, আদালতের আদেশ এবং প্রয়োজনীয় নথির যথার্থতা নিয়ে আরও স্পষ্টতা চেয়েছে দুবাই কর্তৃপক্ষ। তবে তারা ঠিক কোন কোন বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছে কিংবা আনুষ্ঠানিকভাবে কী শর্ত দিয়েছে—তা প্রকাশ করেনি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সংস্থাটির কর্মকর্তারা বলছেন, দুবাই পুলিশের চিঠিতে চাওয়া ব্যাখ্যা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করা হচ্ছে। আগামী দুই-একদিনের মধ্যে তা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পাঠানো হতে পারে।

সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, দুবাই কর্তৃপক্ষের নতুন চিঠি প্রত্যর্পণ আবেদন বাতিলের সিদ্ধান্ত নয়। বরং বাংলাদেশ যে অভিযোগ ও আইনি নথির ভিত্তিতে বেনজীরকে ফেরত চাইছে, সেগুলো সংযুক্ত আরব আমিরাতের আইনে প্রত্যর্পণযোগ্য কিনা—তা যাচাইয়ের অংশ হিসেবেই অতিরিক্ত তথ্য চাওয়া হয়েছে। নীতিগতভাবে দুবাই কর্তৃপক্ষের ইতিবাচক অবস্থান থাকলেও হস্তান্তরের আগে আইনি ও প্রক্রিয়াগত কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত হতে চাইছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।

দুদকের উপপরিচালক ও জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আকতারুল ইসলাম জানান, ইন্টারপোলের মাধ্যমে বেনজীর আহমেদ গ্রেফতার হওয়ার পর তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রশ্নে সরকার ও দুদকের কাছে আরও তথ্য চায় দুবাই পুলিশ। এরপর সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তা প্রয়োজনীয় তথ্য ও নথি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে দুবাই পাঠান। এরপরও মামলাসহ আরও কিছু বিষয়ে অতিরিক্ত ব্যাখ্যা চেয়ে দুবাই পুলিশ নতুন করে সরকারকে একটি চিঠি পাঠিয়েছে। চিঠিটি দুদকেও পৌঁছেছে এবং বর্তমানে জবাব তৈরির কাজ চলছে।

তবে দুবাই পুলিশের চিঠিতে কী কী জানতে চাওয়া হয়েছে, তা তদন্তের স্বার্থে প্রকাশ করছে না দুদক। ফলে ‘শর্ত’ হিসেবে সুনির্দিষ্ট কোনও বিষয় এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে ফেরত আনার বিষয়ে প্রচলিত আইনি কাঠামো পর্যালোচনা করে দুবাই কর্তৃপক্ষ মূলত পাঁচ ধরনের বিষয়ে স্পষ্টতা চাইতে পারে বলে মনে করেন দুদক কর্মকর্তারা।

দুদক সূত্র জানায়, বেনজীরের বিরুদ্ধে করা কোন মামলার ভিত্তিতে তাকে ফেরত চাওয়া হচ্ছে এবং সেই মামলার বর্তমান আইনি অবস্থা কী—এটি পরিষ্কার করতে হতে পারে। তার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, সম্পদের তথ্য গোপন, পাসপোর্ট জালিয়াতি ও অর্থপাচারের অভিযোগে ছয়টি মামলা করেছে দুদক। এর মধ্যে কোন মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে, কোনটিতে বিচার শুরু হয়েছে, কোথায় তদন্ত চলছে এবং কোন আদালত গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন—এসব তথ্যের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা জরুরি।

তাছাড়া বাংলাদেশে যে অভিযোগে বেনজীরকে বিচার করা হবে, তা সংযুক্ত আরব আমিরাতের আইনেও অপরাধ হিসেবে গণ্য হয় কিনা—এ নিয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়ে থাকতে পারে। প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ায় সাধারণত ‘দ্বৈত অপরাধনীতি’ গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ, যে কাজের জন্য একজনকে ফেরত চাওয়া হচ্ছে, সেটি আবেদনকারী ও প্রত্যর্পণকারী—দুই দেশেই অপরাধ হতে হয়। অবৈধ সম্পদ, অর্থপাচার বা জালিয়াতির অভিযোগ আমিরাতের আইনি সংজ্ঞার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, বাংলাদেশকে তা নথিতে দেখাতে হতে পারে।

সংশ্লিষ্টরা আরও বলছেন, অভিযুক্তের পরিচয়, নাগরিকত্ব, পাসপোর্ট এবং অবস্থান-সংক্রান্ত তথ্যের নির্ভুলতা নিয়েও স্পষ্টতা প্রয়োজন। বেনজীরের বিরুদ্ধে পাসপোর্ট জালিয়াতির অভিযোগ থাকায় তার ব্যবহৃত পাসপোর্ট, পরিচয়পত্র, জন্ম তারিখ এবং ভ্রমণ নথি নিয়ে কোনও অসামঞ্জস্য থাকলে দুবাই কর্তৃপক্ষ বাড়তি যাচাই চাইতেই পারে। প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তির পরিচয় নিয়ে সামান্য দ্বন্দ্বও পুরো প্রক্রিয়া বিলম্বিত করতে পারে।

আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানা, মামলার এজাহার, অভিযোগের বিবরণ, শাস্তির বিধান এবং সংশ্লিষ্ট নথির সত্যায়ন ও অনুবাদ নিয়েও প্রশ্ন থাকতে পারে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে পাঠানো প্রত্যর্পণ নথি আরবি ভাষায় অনূদিত, যথাযথভাবে সত্যায়িত এবং কূটনৈতিক চ্যানেলে পাঠানো প্রয়োজন। নথির কোনও অংশ অসম্পূর্ণ থাকলে, অনুবাদে অস্পষ্টতা দেখা দিলে কিংবা আদালতের আদেশের সঙ্গে মামলার তথ্য না মিললে কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ সংশোধিত কাগজপত্র চাইতে পারে।

এছাড়া, দেশে ফেরানোর পর বেনজীরের বিচার কোন কোন মামলায় সীমাবদ্ধ থাকবে—সেটিও দুবাই কর্তৃপক্ষের আগ্রহের বিষয় হতে পারে। প্রত্যর্পণ আইনে ‘রুল অব স্পেশালিটি’ বা বিশেষত্বের নীতি অনুযায়ী, যে অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে ফেরত দেওয়া হয়, সাধারণত সেই অভিযোগেই তাকে বিচার করতে হয়। প্রত্যর্পণ আবেদনে অন্তর্ভুক্ত নয়—এমন পুরোনো মামলায় ব্যবস্থা নিতে প্রত্যর্পণকারী রাষ্ট্রের নতুন সম্মতি প্রয়োজন হতে পারে। তাই বাংলাদেশ মূল আবেদনে কোন কোন মামলা ও অভিযোগ অন্তর্ভুক্ত করেছে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দুদকের একটি দায়িত্বশীল সূত্র বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, মানি লন্ডারিং মামলাতেই তাকে দুদক ফেরত আনতে চাইছে। সেই বিষয়েই ব্যাখ্যা চেয়েছে দুবাই কর্তৃপক্ষ।

দুদক সূত্র আরও জানায়, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারি হয় ২০২৫ সালের ১১ এপ্রিল। সেই নোটিশের ভিত্তিতে তাকে গ্রেফতারের পর গত ১২ জুন বাংলাদেশকে বিষয়টি জানায় সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষ। এরপর দুদক দ্রুত মামলার নথি, আদালতের পরোয়ানা ও অভিযোগের বিবরণ সংগ্রহ করে। গ্রেফতারের খবর পাওয়ার দুই দিনের মধ্যে ইংরেজি ও আরবি ভাষায় প্রত্যর্পণ প্রস্তাব প্রস্তুত করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। পরে কূটনৈতিক চ্যানেলে তা আমিরাত কর্তৃপক্ষের কাছে যায়।

দুই দেশের মধ্যে কার্যকর দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তি না থাকায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফৌজদারি বিষয়ে আন্তর্জাতিক বিচারিক সহযোগিতা সংক্রান্ত আইনের আওতায় আবেদনটি বিবেচিত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এ ব্যবস্থায় চুক্তি না থাকলেও প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ সাপেক্ষে বিদেশি রাষ্ট্রের আবেদন গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। তবে আবেদন যাচাইয়ের সময় কর্তৃপক্ষ প্রয়োজন মতো আরও তথ্য, ব্যাখ্যা ও নথি চাইতে পারে।

ইন্টারপোলের রেড নোটিশ বেনজীরকে শনাক্ত ও আটকের পথ তৈরি করলেও এটি নিজে কোনও আন্তর্জাতিক গ্রেফতারি পরোয়ানা নয়। তাকে বাংলাদেশে হস্তান্তর করা হবে কিনা, সেই সিদ্ধান্ত আমিরাত তার নিজস্ব আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় নেবে। আবেদন প্রাথমিকভাবে গ্রহণযোগ্য হলে বিষয়টি পাবলিক প্রসিকিউশন ও আদালতে যেতে পারে। সেখানে বেনজীর আইনজীবীর মাধ্যমে প্রত্যর্পণের বিরোধিতা এবং সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ পাবেন।

বেনজীরের মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. হাফিজুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনও বক্তব্য দিতে রাজি হননি। আকতারুল ইসলাম বলেছেন, দুবাই কর্তৃপক্ষের চাওয়া ব্যাখ্যা ও প্রয়োজনীয় নথি খুব শিগগিরই পাঠানো হবে।

দুদক কর্মকর্তারা বলছেন, দুবাই কর্তৃপক্ষের চিঠি বেনজীরকে ফেরানোর পথ বন্ধ হওয়ার ইঙ্গিত নয়। বরং বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ আবেদন আইনি পরীক্ষার গুরুত্বপূর্ণ ধাপে পৌঁছানোর প্রমাণ। দুদক ও সরকারের জবাবে অভিযোগের আইনি ভিত্তি, আদালতের আদেশ, পরিচয় সংক্রান্ত তথ্য এবং নথির সত্যায়ন কতটা পূর্ণাঙ্গ ও পরস্পর সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে উপস্থাপন করা যায় সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। জবাব সন্তোষজনক হলে প্রক্রিয়া পরবর্তী বিচারিক ও নির্বাহী ধাপে যাবে। ত্রুটি থাকলে বেনজীরকে দেশে ফেরানোর অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হতে পারে। উৎস: বাংলাট্রিবিউন।

 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়