ডেস্ক রিপোর্ট : বাংলাদেশ পুলিশে দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদক বাংলাদেশ পুলিশ পদক (বিপিএম) ও রাষ্ট্রপতি পুলিশ পদক (পিপিএম)। অসীম সাহসিকতা, মামলার রহস্য উদঘাটন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, সততা ও শৃঙ্খলামূলক আচরণের জন্য সদস্যদের এ পদক দেওয়া হয়। এ বছর ১০৯ জন বিপিএম ও পিপিএম পদক পাচ্ছেন। আগামী রোববার রাজারবাগে পুলিশ সপ্তাহে তাদের পদক পরিয়ে দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তবে চূড়ান্ত হওয়া পদকের তালিকা নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন। রাজনৈতিক যোগ্যতা, কানেকশন ও তদবিরে অনেকেই নাম জুড়িয়েছেন পদকের তালিকায়। এ নিয়ে মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
পুলিশ-সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও অনেকে তদবির ও রাজনৈতিক কানেকশনে পদক বাগিয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও হয়েছে একই কারবার। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। ভালো কাজ করায় অনেক পুলিশ কর্মকর্তা ও মাঠ পর্যায়ের সদস্যরা আবেদন করেও পদক পেতে ব্যর্থ হয়েছেন। তদবির করতে না পারায় কাক্সিক্ষত ‘সোনার হরিনের’ ধারেকাছেও যেতে পারেননি। এতে ক্ষোভ ঝাড়ছেন অনেকেই। রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হলেও আগের মতোই সবকিছু হচ্ছে বলে বঞ্চিতদের অভিযোগ ।
অভিযোগ অস্বীকার করে পদক প্রদান কমিটির সভাপতি অতিরিক্ত আইজিপি (অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, চেষ্টা করেছি সততা ও নিরপেক্ষভাবে পদকের তালিকা চূড়ান্ত করতে। ‘পদক কমিটি’ সঠিকভাবে আবেদন যাচাই-বাছাই করেছে। কারও তদবির শুনিনি। যারা যোগ্য তারাই পদক পেয়েছেন।
আট খুনের রহস্য উদঘাটনের পরও জোটেনি পদক : নাম প্রকাশ না করে পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, জুলাই আন্দোলনের পর বিশৃঙ্খল অবস্থায়ও দিনরাত কাজ করেছি। অনেক ক্লুলেস মামলার রহস্য উদঘাটন করেছি। একটা মামলার সঙ্গে আটটি খুনের রহস্যও উদঘাটন করেছি। আমার সঙ্গে আরও কয়েকজন পুলিশ সদস্য এ কাজে অংশ নিয়েছিল।
পিপিএম পদকের জন্য আবেদন করেছিলাম। কিন্তু চোখের সামনে অনেকেই রাজনৈতিক তদবিরে বিপিএম ও পিপিএম পদকের জন্য মনোনীত হয়েছেন। অথচ তদবির করার লোক না থাকায় আমিসহ টিমের কোনো সদস্যই পদক পেলাম না। তাহলে এত কষ্ট করে লাভ কী হলো। তিনি আরও বলেন, যারা এবার পদক পেয়েছেন তাদের বেশির ভাগই আওয়ামী লীগ আমলের প্রভাবশালী বিতর্কিত পুলিশ কর্মকর্তাদের আস্থাভাজন ছিলেন।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাদের কেউ ‘জেলা কোটায়’ আবার কেউ ‘বিএপি পরিবারের সদস্য’ কোটায় দাপটের সঙ্গে পুলিশে বহাল তবিয়তে আছেন। কেউ আবার পুলিশের অভ্যন্তরীণ গ্রুপিংয়ের জেরে প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন। এসব কর্মকর্তাকে ফের পদকের জন্য মনোনীত করায় পুলিশ সদস্যদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এ পুলিশ কর্মকর্তার মতোই অনেকেই একই ধরনের মন্তব্য করেছেন এ প্রতিবেদকের কাছে।
নাম কেটে দেন ঊর্ধ্বতন এক স্যার : নাম প্রকাশ না করে পুলিশ সুপার মর্যাদার এক কর্মকর্তা বলেন, আওয়ামী আমলে পদকের জন্য আবেদন করাই কঠিন ছিল। সহকারী পুলিশ সুপার থাকাকালে একটি জেলায় ডাকাত ও সন্ত্রাসী প্রতিরোধে বিশেষ ভূমিকা রাখায় ২০১৮ সালে বিপিএম, পিপিএম পদকের জন্য আবেদন করেছিলাম। কিন্তু ঊর্ধ্বতন এক স্যার নাম কেটে দিয়েছিলেন।
পরে দেখেছি, আমার ওই সফলতার জন্য তিনি নিজেই পদক বাগিয়ে নিয়েছেন। রাগে-ক্ষোভে আর আবেদনই করিনি। তবে এবার আশা করেছিলাম, নিরপেক্ষভাবে পদক দেওয়া হবে। কিন্তু আগের মতোই সবকিছু হচ্ছে পুলিশে!
পুলিশে ক্ষোভ ও হতাশা : অভিযোগ রয়েছে, এবারও তদবিরের মধ্য দিয়ে পুলিশ পদক দেওয়া হয়েছে। মাঠ পর্যায়ের যারা বছরজুড়ে ভালো কাজ করেছেন, তাদের অনেকেই পদকপ্রাপ্তদের তালিকায় নেই। এতে মাঠ পর্যায়ের পুলিশের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে। মাঠ পর্যায়ের একাধিক সদস্য অভিযোগ করেছেন এবার পদকপ্রাপ্তদের অনেকেই আগেও কয়েকবার পদক পেয়েছেন। অথচ অনেকের ভাগ্যে একবারও পদক জোটেনি। পদকের তালিকায় এমন নামও আছে যাদের উল্লেখযোগ্য কোনো সাফল্য নেই। পুলিশ সপ্তাহের প্রতি বছরই এমন অভিযোগ উঠছে। সরকারি দলের কিছু নেতা তাদের পছন্দের পুলিশ কর্মকর্তাদের পদক দিতে সুপারিশ করেছেন। এ ছাড়াও পুলিশের কর্তা ব্যক্তিদের আস্থাভাজনদের নামও আছে তালিকায়।
ডিএমপির একটি থানার ওসি বলেন, আমার থানাটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায়। সন্ত্রাসীদের কঠোরভাবে দমন করেছি। গ্রেপ্তার করেছি অনেককে। আমার থানায় অনেকেই সাফল্যের সঙ্গে কাজ করেছে। কিন্তু কাউকে পদক দেওয়া হয়নি। চট্টাগ্রাম রেঞ্জে একটি আলোচিত ঘটনার এক তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, আলোচিত মামলার তদন্ত করে সফল হলেও পদক পেলাম না। শুনেছি এক স্যারের পদক পাওয়ার কারণের মধ্যে ওই মামলার সাফল্যও আছে। আরেক কর্মকর্তা বলেন, ভালো কাজ করেও পদকের পরিবর্তে আমাকে বদলি করা হয়েছে। পিবিআইর এক কর্মকর্তা বলেন, এক বছর এমন কাজ করেছি, ভেবেছি বিপিএম বা পিপিএম পদক পাব। কিন্তু পেলাম আইজিপি ব্যাজ। তদবির করতে পারলে হয়তো পদক জুটত।
খুঁটির জোরে অনেকেই পাচ্ছেন বারবার পদক : পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, এবার পদকের জন্য মনোনীত ১০৯ জনের মধ্যে ১১ জন আওয়ামী আমলেও পদক পেয়েছেন। এমকি কেউ কেউ দুইবারও পদক পান।
কথিত জঙ্গি দমনে সফলতার স্বীকৃতি হিসেবে পদক পাওয়া একজনও আছেন তালিকায়। প্রভাবশালী এক অতিরিক্ত আইজিপির ‘ভাগনে কোটায়’ তিনি পদক পাচ্ছেন। এ ছাড়া অতীতের মতো এবারও রাজনৈতিক বিবেচনায় বেশ কয়েকজনকে পদক দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। গত সংসদ নির্বাচনের আগ মুহূর্তে জামায়াতে ইসলামীর আমিরের এক্স অ্যাকাউন্ট ‘হ্যাক’কাণ্ড নিয়ে বিতর্কিত ভূমিকা রাখা এক ডিআইজিকেও পদকের জন্য মনোনীত করা হয়েছে।
এর আগে বিভিন্ন সময়ে পদকপ্রাপ্তরা হলেন ডিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সরওয়ার, ডিএমপির ডিবি প্রধান শফিকুল ইসলাম, সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী, ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (এস্টেট, ডেভেলপমেন্ট ও আইসিটি) মোহাম্মদ ওসমান গণি, র্যাব ১২-এর অ্যাডিশনাল ডিআইজি আতিকুর রহমান মিয়া, ডিএমপির উপপুলিশ কমিশনার মিয়া মোহাম্মদ আশিস বিন হাছান, পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এলআইসি) মো. আতিকুজ্জামান, ডিএমপির গোয়েন্দা-গুলশান বিভাগের পুলিশ পরিদর্শক (নিরস্ত্র) মো. জেহাদ হোসেন, ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের এসআই গোলাম মূর্তজা, নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা মডেল থানার এসআই মো. রফিক, ডিএমপির রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ের কনস্টেবল মো. রিমন হোসেনসহ আরও কয়েকজন।
তদবিরে দেওয়া হয়নি কোনো পদক : পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা বলেছেন, যাচাই-বাছাই করেই বিপিএম-পিপিএম পদক দেওয়া হচ্ছে। কোনো রাজনৈতিক চাপ ও তদবিরে কাউকে পদক দেওয়া হয়নি। পদকের জন্য মনোনীত করার আগে সারা দেশ থেকে পুলিশ ও র্যাবের চৌকস সদস্যদের তালিকা যাচাই-বাছাই করা হয়। যারা ভালো কাজ করেছেন তাদের মনোনীত করা হয়। এ ক্ষেত্রে তদবিরে কোনো কাজ হয়নি। --- সূত্র, দেশরূপান্তর