বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের এক বছরের সংস্কার প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠান
ন্যায়, সততা এবং মেধাই হবে আমাদের সরকারি নিয়োগে মূল ভিত্তি, বলেছেন প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ। আর জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী বলেছেন, সরকারি চাকরিতে সুপারিশের নিয়োগ আর ফিরবে না।
সোমবার (১৩ এপ্রিল) সোনারগাঁও হোটেলে বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের এক বছরের সংস্কার প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তারা এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ বলেন, আজ আমরা এখানে এই সম্মানজনক পরিসরে কেবল একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করতে একত্রিত হইনি; বরং আমরা একটি অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করতে এসেছি—বাংলাদেশের জনগণের প্রতি সেই অঙ্গীকার, যেখানে ন্যায়, সততা এবং মেধাই হবে আমাদের সরকারি নিয়োগে মূল ভিত্তি।
সিভিল সার্ভিসে নিয়োগ শুধুমাত্র প্রার্থীদের নির্বাচন নয়; এটি আমাদের জাতির ভবিষ্যৎ রক্ষক, জনগণের আস্থার অভিভাবক এবং জাতীয় অগ্রগতির নির্মাতাদের নির্বাচন।
মেধাভিত্তিক নিয়োগের বিষয়ে উপদেষ্টা বলেন, মেধাতন্ত্র কোনো স্লোগান নয়—এটি একটি পবিত্র নীতি।
স্লোগান আমাদের তরুণদের হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দন থেকে উঠে আসে। এটি সেই বিশ্বাস, যেখানে প্রতিভা প্রাধান্য পাবে এবং কঠোর পরিশ্রম প্রভাব-প্রতিপত্তিকে ছাড়িয়ে যাবে।
প্রত্যেক তরুণ নাগরিক, সে দূরবর্তী গ্রামের হোক বা ব্যস্ত নগরের—জাতির সেবা করার প্রতিযোগিতায় সমান সুযোগে দাঁড়াবে। পিএসসি সংস্কার প্রতিবেদনটি নানা দিক থেকে একটি সাহসী পদক্ষেপ। এটি ইঙ্গিত দেয় যে আমরা কেবল সামনে এগোতে নয়, বরং আত্মসমালোচনা করতে, পরিমার্জন করতে এবং আরও উন্নত হতে প্রস্তুত। যখন নিয়োগ প্রক্রিয়া ন্যায্য হয়, তখন প্রশাসন শক্তিশালী হয়; যখন প্রশাসন শক্তিশালী হয়, তখন প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা গড়ে ওঠে; আর যখন প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা তৈরি হয়, তখন জাতি সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যায়।
জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী বলেন, সরকারি চাকরিতে সুপারিশের নিয়োগ আর ফিরবে না। আমাদের ম্যানপাওয়ার হচ্ছে সবচেয়ে বড় সম্পদ। আমরা যদি মানবসম্পদের উন্নয়ন করতে পারি, তাহলে যে কোনো কাজ করতে পারব। নিয়োগের ক্ষেত্রে এখানে কোন প্রকারের কোনও হস্তক্ষেপ ফিরবে না। মেধাভিত্তিক নিয়োগের জন্য আমাদের প্রক্রিয়াগুলো সঠিকভাবে প্রতিপালন করতে হবে। নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধাই হবে চূড়ান্ত নিয়ামক, নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানকে সক্রিয় হতে হবে।
অনুষ্ঠানে তরুণ প্রজন্মকে বিসিএস ‘অসুখ’ থেকে বের হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর পলিসি ও স্ট্র্যাটেজি, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টা ড. জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, অনেক তরুণকে দেখা যায় বয়স যত দিন আছে তত দিন বিসিএস ক্যাডার হওয়ার জন্য পরীক্ষা দিচ্ছেন। আবার অনেককে বিসিএস পরীক্ষা দিতে দিতে ব্যর্থ হয়ে হতাশায় নিমজ্জিত হচ্ছেন।
তিনি বিসিএস পরীক্ষার প্রশ্ন আরোও কঠিন করা প্রয়োজন বলে মনে করেন। ফলে, একবার বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে যখন সে দেখবে সে বিসিএস-এর যোগ্য নয়, তখন সে অন্য পেশার দিকে ধাবিত হবে। আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষ থেকেই শিক্ষার্থীদের টেবিলে দেখা যায় বিসিএসের বই। তরুণদের জীবনের বড় একটা সময় খেয়ে ফেলছে বিসিএস। এই ‘অসুখ’ থেকে বের হতে হবে।
পিএসসি জানায়, প্রতিবেদনটিতে ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালে নভেম্বর পর্যন্ত গৃহীত সংস্কার কার্যক্রমের একটি সমন্বিত চিত্র উপস্থাপন করা হয়, যার লক্ষ্য ছিল সরকারি চাকরিতে নিয়োগ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ন্যায্যতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন সরকারি কর্ম কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ড. চৌধুরী সায়মা ফেরদৌস।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোবাশ্বের মোনেম। তিনি বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের সময় কমিশন একাধিক কার্যগত ও প্রাতিষ্ঠানিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি ছিল। এরমধ্যে ছিল একই সাথে একাধিক বিসিএস পরীক্ষার সময়সূচি, দীর্ঘ নিয়োগ প্রক্রিয়া, ম্যানুয়াল পদ্ধতির ওপর নির্ভরতা এবং সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা। গত এক বছরে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বিপিএসসি একটি সুসংগঠিত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। পরীক্ষার সময়সূচি সুশৃঙ্খল করতে একটি সমন্বিত রোডম্যাপ প্রণয়ন করা হয়, যার ফলে একই সাথে চলমান বিসিএস প্রক্রিয়াগুলো নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়েছে এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপে সমন্বয় বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি ‘ওয়ান বিসিএস, ওয়ান ইয়ার’ চালু করা হয়েছে, যা একটি পূর্বানুমানযোগ্য ও সময়সীমাবদ্ধ নিয়োগ চক্র নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে।
পাবলিক সার্ভিস কমিশনের এক বছরের সংস্কার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এসব সংস্কার চারটি মূল প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যবোধ—মেধা, সততা, নিরপেক্ষতা এবং দক্ষতা দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে এবং বিপিএসসির প্রথম পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা (২০২৫–২০২৯)-এর মাধ্যমে সমর্থিত, যা টেকসই প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নের একটি সুসংগঠিত কাঠামো প্রদান করে।
অনুষ্ঠানে একটি উচ্চপর্যায়ের প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে সরকার, একাডেমিয়া এবং উন্নয়ন অংশীদারদের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মামুন আহমেদ, সরকারি কর্ম কমিশন সচিবালয়ের সচিব ড. মো. সানোয়ার জাহান ভূঁইয়া। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সরকারি কর্ম কমিশনের সদস্য মেজর জেনারেল (অব.) আনোয়ারুল ইসলাম।