সৌদি আরবের পবিত্র মক্কায় একটি মসজিদ প্রাঙ্গনে কথিত ‘অনৈতিক’ কাজের দায়ে গত ১৪ অক্টোবর দুই বাংলাদেশি নাগরিক নারী-পুরুষের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এই ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে বিভিন্ন দাবি ছড়ানো হচ্ছে। গত ১৮ অক্টোবর Md Ahsan Ullah Alamgir নামে একটি ফেসবুক একাউন্ট থেকে উক্ত ঘটনা নিয়ে একটি পোস্ট দেয়া হয়। পোস্টটি ফেসবুকে ব্যাপকভাবে ছড়াচ্ছে। দেখুন এখানে, এখানে এবং এখানে।
ছড়িয়ে পড়া পোস্টটিতে চারটি দাবি পাওয়া যায়:
এক. ঘটনাটি চার মাস আগে ঘটেছিল।
দুই. তাঁরা পরস্পরের স্বামী-স্ত্রী এবং নবদম্পতি।
তিন. তাঁরা ওমরাহ পালনের জন্য সৌদি আরবের মক্কা নগরীতে গিয়েছিলেন।
চার. মসজিদে কপালে চুমু দেওয়ার কারণে ওই দুই তরুণ-তরুণীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
এই চারটি দাবির সত্যতা যাচাই করেছে দ্য ডিসেন্ট।
প্রথমত দাবি করা হয়েছে, ঘটনাটি চার মাস আগে ঘটেছিল। কিন্তু যাচাই করে দেখা গেছে, দাবিটি সত্য নয়। ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর সৌদি আরবে যান নজরুল। এর ছয় মাসের মাথায় তাকে আটক করা হয়। প্রায় ৩ বছর ৩ মাস সৌদির কারাগারে বন্দি থাকার পর তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
গত ১৯ অক্টোবর বাংলাদেশ প্রতিদিনে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর সৌদি আরবে যান নজরুল ইসলাম। কিন্তু যাওয়ার মাত্র ছয় মাসের মাথায় মক্কার একটি মসজিদ থেকে সুইটি আক্তার নামে এক তরুণীসহ নজরুলকে ‘অনৈতিক কাজের’ অভিযোগে গ্রেফতার করে সৌদি পুলিশ। তিন বছর তিন মাস রিয়াদ ও মক্কার কারাগারে বন্দি ছিলেন নজরুল।
গত ১৯ অক্টোবর দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনেও একই ধরনের তথ্য পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর সৌদি আরবে পাড়ি জমান নজরুল ইসলাম। সেখানে যাওয়ার ছয় মাসের মাথায় মক্কা নগরীর একটি মসজিদে সুইটি আক্তার নামে এক তরুণীর সঙ্গে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে তাদের দুজনকে গ্রেপ্তার করে দেশটির পুলিশ। এরপর তিন বছর তিন মাস কারাবন্দি থাকার পর গত বুধবার নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে সৌদি আরব সরকার।
দ্বিতীয়ত দাবি করা হয়েছে, তারা স্বামী-স্ত্রী এবং নবদম্পতি। কিন্তু যাচাই করে কোনো সংবাদমাধ্যম বা বিশ্বস্ত সূত্রে এরকম কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। মৃত্যুদণ্ড পাওয়া নজরুল ইসলামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সুলতানপুর ইউনিয়নের একটি ওয়ার্ডের। ঐ ওয়ার্ডের মেম্বার সুমন ভূইয়া দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “আমি যতদূর জানি নজরুল ইসলাম বিবাহিত না। আর ওই নারী সম্পর্কে আমি জানিনা। আমি তার পরিবারের সাথেও কথা বলেছি। এখন সৌদি আরবে গিয়ে যদি বিয়ে করে সেটা সম্পর্কে বলতে পারবো না। তবে এখানে সে বিয়ে করেনি সেটা নিশ্চিত।”
তৃতীয়ত, দাবি করা হয়, তারা ওমরাহ পালনের জন্য সৌদি আরবের মক্কা নগরীতে গিয়েছিলেন। কিন্তু যাচাই করে দেখা যায়, এই দাবিটিও সত্য নয়। ১৯ অক্টোবর দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে নজরুল ইসলামের স্বজনদের বরাতে বলা হয়, “পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফেরানোর আশায় ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর সৌদি আরবে পাড়ি জমান কৃষক পরিবারের সন্তান নজরুল ইসলাম (২২)। সেখানে যাওয়ার ছয় মাসের মাথায় মক্কা নগরীর একটি মসজিদে সুইটি আক্তার নামে এক তরুণীর সঙ্গে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে তাদের দুজনকে গ্রেপ্তার করে দেশটির পুলিশ।”
বাংলাদেশ প্রতিদিনে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, “পরিবারের অভাব দূর করার আশায় ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সুলতানপুর ইউনিয়নের বিরামপুর গ্রামের কৃষক পরিবারের বড় সন্তান নজরুল ইসলাম।”
১৯ অক্টোবর সময়ের কণ্ঠস্বরে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনেও একইধরনের তথ্য পাওয়া যায়। সেখানে বলা হয়, “পরিবারের অসচ্ছলতা দূর করে একটু সুখের মুখ দেখতে ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর সৌদি আরবে পাড়ি জমান বিরামপুর গ্রামের দরিদ্র কৃষক আব্দুল বাছিরের বড় ছেলে নজরুল ইসলাম। সেখানে তিনি একটি প্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। চার ভাই-বোনের মধ্যে তিনিই ছিলেন পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তি।”
চতুর্থত, মসজিদে কপালে চুমু দেওয়ার কারণে ওই দুই তরুণ-তরুণীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে ফেসবুকে ভাইরাল পোস্টে দাবি করা হয়েছে। কিন্তু যাচাই করে কোনো সংবাদমাধ্যম বা বিশ্বস্ত সূত্রে এরকম কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। গত ১৫ অক্টোবর সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে সৌদি সংবাদমাধ্যম আজেল-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, “বাংলাদেশের নাগরিক নাজেরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিতি আখতার পবিত্র নগরী মক্কার একটি মসজিদের ভেতরে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন। নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ তাঁদের আটক করে এবং তদন্ত শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। পরে মামলাটি সংশ্লিষ্ট আদালতে পাঠানো হলে আদালত তাঁদের দোষী সাব্যস্ত করেন এবং তাঁদের কর্মকাণ্ডের গুরুতরতা ও সময় ও স্থানের পবিত্রতা লঙ্ঘনের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তাজিরের অধীনে মৃত্যুদণ্ড দেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ রায়টি বহাল রাখে এবং দণ্ড কার্যকরের জন্য রাজকীয় আদেশ জারি করা হয়।”
এছাড়াও গত ১৬ অক্টোবর দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, “সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীর একটি মসজিদে অনৈতিক কাজ করার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে গত বুধবার এ তথ্য নিশ্চিত করেছে সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ)। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ব্যক্তিরা হলেন নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিতি আখতার। মক্কার একটি মসজিদের ভেতর তাঁরা অনৈতিক ও অশালীন কাজে লিপ্ত হলে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী তাঁদের গ্রেপ্তার করেছিল।”
অর্থাত চুমু খাওয়ার অপরাধে তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে এমন কোনো তথ্য কোনো সংবাদমাধ্যম কিংবা বিশ্বস্তসূত্রে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
লাশ এসেছে বলে ছড়াচ্ছে ভিন্ন ঘটনার ছবি ও ভিডিও
সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশির লাশ দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে দাবিতে ফেসবুকে এবং বিভিন্ন সংমাধ্যমে একটি ভিডিও প্রচারিত হচ্ছে।
উক্ত দাবিতে প্রচারিত সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন দেখুন দ্য নিউজ, বাংলাদেশ টাইমস, এসএ টিভি, যায়যায়দিন, নিউজ নাউ বাংলা, ঢাকা ওয়াচ।
কিন্তু যাচাই করে দেখা গেছে, প্রচারিত ভিডিওটি ‘Ahmed Didar’ নামের একটি ফেসবুক প্রোফাইলে খুঁজে পাওয়া যায়।
ওই প্রোফাইল থেকে গত ১৭ ও ১৮ অক্টোবর প্রায় একই ধরনের দুইটি ভিডিও পোস্ট করা হয়। অ্যাকাউন্টটি থেকে নিয়মিত বিমানবন্দরের বিভিন্ন দৃশ্যের ভিডিও পোস্ট করা হয়।
এর মধ্যে ১৮ অক্টোবর পোস্ট করা ভিডিওটি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে।
ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েকজন ব্যক্তি একটি কফিন নিয়ে যাচ্ছেন। কফিনটি অ্যাম্বুলেন্সে কাছে নেওয়া হয়।
ভিডিওটি পোস্ট করায় সময় ক্যাপশন ছিল, “আজকে যদি নজরুল আর সিতি আমেরিকার নাগরিক হতো, সৌদি বাদশার বাপের সাধ্য ছিল ওদের শিরশ্ছেদ করার!? 'মিসকিন' দেশের বলে, জানানোরও দরকার মনে করেনি।”
পরবর্তীতে ক্যাপশনটি সম্পাদনা করে আহমেদ দিদার লেখেন, “সৌদি প্রবাসী ভাইয়ের লাশ তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে।”
সর্বশেষ ১৯ অক্টোবর ক্যাপশনটি আবার সম্পাদনা করে লেখা হয়, “প্রবাসী ভাইয়ের লাশ তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে।”
এদিকে, ১৯ অক্টোবর সকালে নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে আরেকটি পোস্ট দিয়ে আগের ভিডিওর ক্যাপশনের জন্য ক্ষমা চান আহমেদ দিদার।
তিনি লেখেন, “সম্মানিত ফেইসবুক বন্ধুগন, গতকাল আমার আইডি থেকে পোস্ট করা একটি ভিডিও সারা দেশে ব্যাপক ভাইরাল হয়েছে। ঐ ভিডিওর সাথে আমার দেওয়া ক্যাপশন ভুল ছিল। আমি সঠিক তথ্য না জেনে পোস্ট করায় সকলের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী।”
এদিকে গত ১৭ অক্টোবর বিবিসি বাংলায় এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, “ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জেদ্দায় বাংলাদেশ মিশনের কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, যে দুজনের শাস্তি কার্যকর করা হয়েছে তাদের বিষয়ে কোনো তথ্যই এখনো বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকে জানায়নি সৌদি কর্তৃপক্ষ।”
সূত্র: দ্য ডিসেন্ট