আল্লাহর পথে ফিরে আসা হলো সবচেয়ে বড় সাফল্য। এতে হারানোর কিছু নেই-পাওয়ার আছে চিরকাল। যে হৃদয় অনুতাপে কেঁপে ওঠে এবং আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, সে-ই প্রকৃত সফল। দুনিয়ার সাফল্য সাময়িক; অথচ আল্লাহর পথে প্রত্যাবর্তন এমন এক অর্জন, যার ফল চিরস্থায়ী। তাওবা কেবল গুনাহ মোচনের নাম নয়—এটি জীবনের নতুন সূচনা, আত্মার পরিশুদ্ধি এবং জান্নাতের পথে যাত্রা। বিষয়টি আল্লাহ তাআলা কুরআনুল কারিমে এভাবে তুলে ধরেছেন—
إِلَّا الَّذِينَ تَابُوا وَأَصْلَحُوا وَاعْتَصَمُوا بِاللَّهِ وَأَخْلَصُوا دِينَهُمْ لِلَّهِ فَأُولَٰئِكَ مَعَ الْمُؤْمِنِينَ ۖ وَسَوْفَ يُؤْتِ اللَّهُ الْمُؤْمِنِينَ أَجْرًا عَظِيمًا
‘তবে যারা তাওবা করে নিজদের শুধরে নেয়, আল্লাহকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে এবং আল্লাহর জন্য নিজদের দীনকে খালেস করে, তারা মুমিনদের সাথে থাকবে। আর অচিরেই আল্লাহ মুমিনদেরকে মহাপুরস্কার দান করবেন।’ (সুরা নিসা: আয়াত ১৪৬)
কুরআনের আলোকে তাওবার মর্যাদা
১️. আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন
তাওবা কেবল ক্ষমা পাওয়ার উপায় নয়; এটি আল্লাহর ভালোবাসা অর্জনের পথ। আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন—
إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং পবিত্রতা অবলম্বনকারীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ২২২)
২️. তাওবা করলে গুনাহ নেকিতে রূপান্তর হয়
অতীতের অন্ধকার ভবিষ্যতের আলো হয়ে যায়— এটি তাওবার সর্বোচ্চ সুসংবাদ। আল্লাহ তাআলা ঘোষণা দেন—
فَأُولَٰئِكَ يُبَدِّلُ اللَّهُ سَيِّئَاتِهِمْ حَسَنَاتٍ ۗ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَّحِيمًا
‘তাদের গুনাহসমূহ আল্লাহ নেকিতে পরিণত করে দেন। আর আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা আল-ফুরকান: আয়াত ৭০)
৩️. আন্তরিক তাওবার নির্দেশ
আল্লাহ তাআলা বলেন—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا تُوبُوا إِلَى اللَّهِ تَوْبَةً نَّصُوحًا
‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে খাঁটি তাওবা কর।’ (সুরা আত-তাহরিম: আয়াত ৮)
হাদিসের আলোকে তাওবার ফজিলত
৪. আল্লাহ তাওবায় সবচেয়ে বেশি আনন্দিত হন
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
لَلَّهُ أَشَدُّ فَرَحًا بِتَوْبَةِ عَبْدِهِ مِنْ أَحَدِكُمْ...
‘বান্দার তাওবায় আল্লাহ তোমাদের কারও হারানো উট ফিরে পাওয়ার চেয়েও বেশি আনন্দিত হন।’ (বুখারি ৬৩০৯, মুসলিম ২৭৪৭)
৫. সব মানুষই ভুল করে
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
كُلُّ بَنِي آدَمَ خَطَّاءٌ وَخَيْرُ الْخَطَّائِينَ التَّوَّابُونَ
‘আদম সন্তানের সবাই ভুলকারী আর উত্তম ভুলকারী তারা, যারা তাওবা করে।’ (তিরমিজি ২৪৯৯)
৬. সূর্য পশ্চিমে উদিত হওয়ার আগপর্যন্ত তাওবার দরজা খোলা
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِنَّ اللَّهَ يَبْسُطُ يَدَهُ بِاللَّيْلِ لِيَتُوبَ مُسِيءُ النَّهَارِ، وَيَبْسُطُ يَدَهُ بِالنَّهَارِ لِيَتُوبَ مُسِيءُ اللَّيْلِ، حَتَّى تَطْلُعَ الشَّمْسُ مِنْ مَغْرِبِهَا
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ রাতে তার হাত প্রসারিত করেন, যাতে দিনের গুনাহকারী তাওবা করতে পারে; আর দিনে তার হাত প্রসারিত করেন, যাতে রাতের গুনাহকারী তাওবা করতে পারে—এভাবে (তাওবার সুযোগ চলতে থাকবে) যতক্ষণ না সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদিত হয়।’ (মুসলিম ২৭৫৯)
তাওবার প্রকৃত অর্থ
তাওবা মানে শুধু “আস্তাগফিরুল্লাহ” বলা নয়। বরং—
১. গুনাহ ত্যাগ করা
২. অন্তরে অনুতপ্ত হওয়া
৩. ভবিষ্যতে গুনাহ না করার দৃঢ় সংকল্প করা
৪. কারও হক নষ্ট করলে তা ফিরিয়ে দেওয়া
আমাদের করণীয়
১️. প্রতিদিন ইস্তিগফার করা। কেননা রাসুলুল্লাহ (সা.) দিনে ৭০–১০০ বার ইস্তিগফার করতেন।
২️. নির্জনে আত্মসমালোচনা করা। দিন শেষে একান্তে নিজের আমলের পর্যালোচনা করা।
৩️. গুনাহের পরিবেশ ত্যাগ করা। খারাপ সঙ্গ ও হারাম উপার্জন বর্জন করা।
৪️. নফল ইবাদত বৃদ্ধি করা। তাহাজ্জুদ, সাদাকা, রোজা—হৃদয় পরিশুদ্ধ করে।
৫️. কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করা। কেননা কুরআন হলো হৃদয়ের আলো।
৬️. আল্লাহর রহমতে নিরাশ না হওয়া। আল্লাহ নিজেই ঘোষণা করেছেন—
لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ
‘তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হইও না।’ (সুরা আজ-যুমার: আয়াত ৫৩)
আল্লাহর পথে ফিরে আসা মানেই জীবনের প্রকৃত জয়। এটি দুর্বলতার স্বীকারোক্তি নয়—বরং ইমানের শক্তির প্রকাশ। যে ব্যক্তি তাওবার মাধ্যমে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, তার অতীত মুছে যায়, বর্তমান পরিশুদ্ধ হয় এবং ভবিষ্যৎ আলোকিত হয়। দুনিয়ার সাফল্য একদিন ফুরিয়ে যাবে; কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টি ও আখিরাতের পুরস্কার চিরস্থায়ী। আসুন, আমরা আজই সিদ্ধান্ত নিই— ভুল থেকে ফিরে আসব, হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করব, আর আল্লাহর পথে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যাব।
সূত্র: যুগান্তর