শিরোনাম

প্রকাশিত : ০৯ মে, ২০২৩, ০৩:১৭ দুপুর
আপডেট : ০৯ মে, ২০২৩, ০৩:১৭ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

ঋণ নিয়ে শেয়ার ব্যবসা হতে পারে, বিনিয়োগ হতে পারে না : অধ্যাপক আবু আহমেদ

অধ্যাপক আবু আহমেদ

ভূঁইয়া আশিক রহমান: [২] শেয়ারবাজারে ৭ মে থেকে ঋণসুবিধা আরও সহজ করা হয়েছে। শেয়ারের বিপরীতে ঋণসুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে শর্ত আরও একটু শিথিল করেছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। গত সপ্তাহের সর্বশেষ কার্যদিবস বুধবার প্রান্তিক (মার্জিন) ঋণের শর্ত শিথিল করে নতুন নির্দেশনা জারি করে বিএসইসি।

তাতে বলা হয়, এখন থেকে ‘এ’ শ্রেণিভুক্ত ৩০ কোটি টাকার পরিশোধিত মূলধনের কোম্পানির শেয়ার কেনার ক্ষেত্রে ৫০ মূল্য আয় অনুপাত বা পিই রেশিও পর্যন্ত ঋণসুবিধা পাবেন বিনিয়োগকারীরা। আগে ৫০ কোটি টাকার পরিশোধিত মূলধনের কোম্পানিগুলোকে এ সুবিধা দেওয়া হতো। সেই শর্ত শিথিল করে এখন ৩০ কোটিতে নামিয়ে আনা হয়েছে।

[৩] এ প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ ও শেয়ারবাজার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবু আহমেদ আমাদের অর্থনীতিকে বলেন, ঋণ নিয়ে শেয়ার ব্যবসা হতে পারে, বিনিয়োগ হতে পারে না। বিনিয়োগ এক কথা, শেয়ার ব্যবসা আরেক কথা। যারা শেয়ার বেচাকেনা করেন তারা ব্রোকারেজ হাউজ থেকে ঋণ গ্রহণ করেন। তারা সংখ্যায়ও বেশি। ঋণ নিয়ে শেয়ারে বিনিয়োগ করলে কেউ পোষাতে পারবেন না। কারণ রেট অব রিটার্ন তো এতো নয় যে, একবছর রাখবেন। ১৭ শতাংশ সুদ দেবেন! ১৭ পার্সেন্ট ইনকামই তো করা যায় না। ইন্ডিভিজুয়াল শেয়ারের ডিভিডেন্ড তো ১৭ পার্সেন্টের অনেক নীচে থাকে। 

[৪] তিনি বলেন, সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের এখনকার পলিসিতে বিনিয়োগকারীদের জন্য কিছু নেই। তাদের এই পলিসিতে বিনিয়োগ সৃষ্টি হচ্ছে না। কী হচ্ছে তাহলে? যেটা হচ্ছে, শর্টটার্ম বেচাকেনা করেন যারা তারা হয় গেইন করেন, না হলে খুন হন! তাদের ক্রয়কৃত শেয়ার যদি লাফিয়ে লাফিয়ে দ্বিগুণ হয়ে যায়, তাহলে তারা বেঁচে যান। সময়মতো বিক্রি করে বের হতে পারলে ঋণের টাকা ফেরত দিতে পারেন। আর যারা ধরা খেয়ে যান, তারা ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। তারা শেষ পর্যন্ত লোকসান দেন। 

[৫] আবু আহমেদ বলেন, স্বল্প পুঁজি যাদের তারা মার্জিন লোন নেন। তাদের লিমিট দিয়ে দেয়। তাতে ব্রোকারেজ হাউজের লাভ হয়, টার্নওভার বাড়ে। কমিশন পায়। ঋণ বিক্রিতে ব্রোকারেজ হাউজগুলো উৎসাহ দেয়। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন এখন সেই পক্ষেই। তারাও চান টার্নওভার বাড়ুক ঋণের মাধ্যমে। ঋণ তো ভালো শেয়ারে নিচ্ছে না কেউ। ঋণ নিচ্ছে জাঙ্ক স্টকে। যেগুলো আর্নিংয়ের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। জুয়াড়িরা সেই শেয়ারগুলো উপরে ওঠায়। এটাকে তারা গেম্বলিং বলে। বিনিয়োগীকারীদের জন্য সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের কোনো পলিসি নেই। 

[৬] টার্নওভার বাড়তে পারে। বেচাকেনার পরিমাণও বাড়বে। কারণ যেসব শেয়ারে মার্জিন লোন পেতো না এতোদিন, সেগুলো এখন মার্জিন লোনের আওতায় আসবে। আগে ৪০ পিই রেশিও ছিলো, এখন ৫০ মূল্য আয় অনুপাত বা পিই রেশিও। আরও উপরে এসব শেয়ার ঋণ পাবে! যারা শর্টটার্ম গেইন করছেন অথবা জুয়া খেলছেন তারা আবারও মার্জিন লোন নেবেন। তাতে বাজারে টার্নওভার বাড়বে। টার্নওভার ইতোমধ্যে বেড়েছেও।

এতে শেয়ারবাজারের কতোটুকু উপকার হয়, তা প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ মার্জিন লোন নিয়ে যদি তারা ধরা খেয়ে যান, তাহলে পরবর্তী সময়ে তারা আর ঋণ শোধ করতে পারবেন না। তখন ব্রোকারেজ হাউজগুলো ফোর্স সেলে চলে যাবে। শর্টটার্ম গেইনকারীরা মাইনাসে চলে যাবেন। সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের উচিত ছিলো বিনিয়োগকারী সৃষ্টি করা। জুয়াড়িদের পক্ষে তাদের পলিসি হওয়া উচিত নয়। 

 [৭] শেয়ারবাজার এখন জায়গায় বসে আছে। নতুন কিছু শেয়ারের দাম বেড়েছে। নতুন নতুন ইন্সট্রুমেন্ট বের করে জুয়াড়িরা। নতুন শেয়ারের দিকে ঝুঁকেছে লোকজন। কোনোটা অস্তিত্বহীন, কোনোটার আবার আর্নিং নেই। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা খুব একটা অ্যাক্টিভ বলা যাবে না। তবে তারা হয়তো দুয়েকটি শেয়ার কিনে থাকতেও পারেন। এতে শেয়ারবাজারের জন্য ইতিবাচক কিছু হচ্ছে এখনই তা বলা যায় না।

কারণ গত ৬ মাস বা ১ বছর ধরে শেয়ার বিক্রি করছেন তারা। এখন হয়তো আবার কেনার পরিমাণ সামান্য বাড়িয়েছেন। শেয়ার কেনার এই পরিমাণ কতো, সেটাও দেখার ব্যাপার আছে। শেয়ার ক্রয়ে অতো উৎসাহ নেই বিদেশিদের। তারা বিগত ১ বছরে বিক্রি করেছেন বেশি, কিনেছেন অনেক কম। একমাসের লেনদেন দিয়ে বোঝা যায় নাÑ কী পরিমাণ শেয়ার কিনছেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে কী পড়বে না বাজারে, এখনই কিছু বলা যাবে না। 

[৮] বিদেশি বিনিয়োগকারীরা খুব ফেড-আপ আমাদের ওপর। তাদের কাছ থেকে আমরা খুব বেশি কিছু আশা করি না। কারণ বাজারে ফ্লোর প্রাইস আরোপ করা আছে। এটা তারা পছন্দ করছেন না। এ কারণে ফেড-আপ বিদেশিরা। স্থানীয় বিনিয়োগকারীরাও বিরক্ত । এই ফ্লোর প্রাইস তো বাজারের জন্য ক্ষতিকারক। এটা আমি প্রথম থেকেই বলে আসছি।

এখন ব্রোকারেজ হাউজগুলোও বলছে। বিনিয়োগকারীরাও বলছেন। ইজি মুভমেন্ট না থাকলে কি বাজার আর বাজার থাকে? পণ্য নিয়ে বাজারে গিয়ে যদি সেটা বিক্রি করতে না পারেন, সেটাকে কি বাজার বলা যায়? আপনাকে বলা হলো, এর নীচে পণ্যের দাম নামানো যাবে না, তাহলে কি আপনি বাজার থেকে ফেরত নিয়ে আসবেন! ফ্লোর প্রাইস বাজারকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

কারও জন্যই সেটা লাভজনক নয়। ফ্লোর প্রাইস আরোপে কেউ লাভবান হচ্ছে না। বিদেশিদের হাতে আটকে থাকা শেয়ার তারা বিক্রি করতে পারছেন না। ব্লক মার্কেটে হয়তো কিছু কিছু ছেড়ে বের হওয়ার চেষ্টা করছেন। ১০ শতাংশ কম দরে বিক্রি করতে পারেন ব্লক মার্কেটে। তবুও বেচে দেওয়াকেই শ্রেয় মনে করেন তারা।  

[৯] ডলারের দাম বেড়েছে, টাকার মূল্য হারিয়েছে। এতে সহজে বিদেশি বিনিয়োগকারী মিলবে না। ডলারে দর হু হু করে বেড়ে ৮৫ টাকা থেকে ১০৫ টাকা হয়েছে। বিদেশিরা তো ৮৫ টাকা দিয়ে ১ ডলার কিনতেন। এখন তো ১০৫ টাকা করে ডলার কিনতে হবে। এতে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নিরুৎসাহিত হন। 

[১০] বাংলাদেশের সামাষ্টিক অর্থনীতি, এক্সচেঞ্জ রেট ও অভ্যন্তরীণ মুদ্রাস্ফীতি স্থিতিশীল হলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এখনকার চেয়ে বেশি ইন্টারেস্ট দেখাতেও পারেন। ফ্লোর প্রাইস যদি কখনো তুলে নেয়, আবারও আগ্রহী হতে পারেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা।

[১১] বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি চাপে আছে। বিদেশি কোম্পানিগুলো প্রয়োজনীয় ডলার পাচ্ছে না তাদের প্রফিট নেওয়ার জন্য। তাদের মুনাফা নেওয়ার অধিকার আছে, কিন্তু আমরা তাদের পর্যাপ্ত ডলার সরবরাহ করতে পারছি না। এতেই বোঝা যায়, সামষ্টিক অর্থনীতি খুবই চাপে আছে। আমাদের অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি কী হবে আগামী ৬ মাস বা ১ বছর খুবই ক্রুশিয়াল টাইম। তবে খুব সহজে আবারও আগের সেই ৪৬ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভে পৌঁছাতে পারবে বলে মনে হয় না। 

[১২] আইএমএফ চায় আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ুক। কিন্তু সেটা সহজে হবার নয়। কারণ আমাদের দেনা বেড়ে যাচ্ছে। আমাদের তো অনেক ঋণ শোধ করতে হবে। ডলারে। আগে তো এতো ঋণ ছিলো না। চীন, রাশিয়া, এডিবি বা বিশ^ব্যাংক থেকে তো অনেক ঋণ নেওয়া হয়েছে। সামনে তো এসব ঋণ পরিশোধ করতে হবে। এই ঋণ শোধ করতে গেলে তো ডলার দরকার। ডলার বাড়াতে হলে আমাদের রপ্তানি বৃদ্ধি করতে হবে। আমদানি কমাতে হবে আরও। বিদেশিদের ঋণ না দিয়ে তো পারা যাবে না। ঋণ শোধ করতে না পারলে তো আর ঋণ দেবে না, অন্যদের বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য করতেও দেবে না। ফলে বিদেশি ঋণ আগে দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত দুই দশক ধরে আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল ছিলো।

সেটা গত একবছর ধরে দুর্বল বা ভঙ্গুরতার দিকে যাচ্ছে। জিডিপির গ্রোথ স্লো হয়ে গেলে ট্যাক্স কালেকশন কমে যাবে। আইএমএফ যতোই বলুক ট্যাক্স কালেকশন বাড়াতে হবে, সেটা পারবে না। কারণ সেটা তো জিডিপি গ্রোথের সঙ্গে সংযুক্ত। বিনিয়োগের সঙ্গে সংযুক্ত। কারণ বিনিয়োগ বেশি হলে ভ্যাট কালেকশন বেশি হবে। জিডিপি গ্রোথ রেট ৬ শতাংশও যদি অর্জন করতে পারে, কিছুটা হলেও দেশের অর্থনীতি ভালো অবস্থানে থাকবে। কিন্তু নীচের দিকে নামতে থাকলে বাংলাদেশের জন্য বিরাট সিগনাল আসছে। 

ভিএআর/এএ

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়