আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ইয়েমেনের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সিরীয় সেনা পাঠানোর সম্ভাবনা নিয়ে সৌদি আরব আলোচনা করছে বলে জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস। অ্যাক্সিওসের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরব ও সিরিয়া ইয়েমেনে হুথি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করতে ১০ থেকে ২০ হাজার সিরীয় সেনা পাঠানোর বিষয়টি পর্যালোচনা করছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, সিরিয়ার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট আহমদ আল-শারা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করলেও এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি। একজন মার্কিন কর্মকর্তা দামেস্কের সম্মতির সম্ভাবনা বেশি বলে মনে করছেন। ---- পার্সটুডে
ট্রাম্প প্রশাসনও এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করছে না এবং সিরীয় বাহিনী কীভাবে মোতায়েন করা হবে, সে বিষয়ে সেন্টকমের সঙ্গে পরামর্শ করা হয়েছে। সম্ভাব্যভাবে দামেস্কের কাছে অবস্থিত ৯০তম ব্রিগেড এবং দক্ষিণ সিরিয়ার ৮৪তম ব্রিগেড থেকে সেনা বাছাই করা হতে পারে।
তবে এর মধ্যেই আহমদ আল-শারার গণমাধ্যমবিষয়ক উপদেষ্টা আহমদ মুফাক জেইদান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে কিছু গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের প্রতিক্রিয়ায় লিখেছেন, সৌদি আরব ও ‘পারস্য উপসাগরের’ নিরাপত্তা সিরিয়ার নিরাপত্তার অংশ এবং দামেস্ক শক্তভাবে সৌদি আরবের পাশে রয়েছে। তবে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে সৌদি আরব বা ইয়েমেনে সিরীয় সেনা পাঠানোর অনুরোধ করা হয়েছে- কিছু গণমাধ্যমের এমন খবর মিথ্যা এবং এর কোনো সত্যতা নেই।
সৌদি আরবের পক্ষ থেকে ইয়েমেনে সিরীয় সেনা পাঠানোর এই কথিত অনুরোধ প্রথমে অ্যাক্সিওস ও রয়টার্সের মতো মার্কিন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এটি রিয়াদের একটি বহুস্তরীয় কৌশলগত হিসাবের প্রতিফলন, যার মধ্যে শুধু সামরিক প্রয়োজন নয় বরং জটিল রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক বিষয়ও রয়েছে।
ইয়েমেন যুদ্ধে বছরের পর বছর অচলাবস্থা এবং ইয়েমেনের সেনাবাহিনী ও আনসারুল্লাহ আন্দোলনের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট বিজয় অর্জনে ব্যর্থতার পর সৌদি আরব এখন নিজেদের ভূখণ্ডে ইয়েমেনি বাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা বৃদ্ধির মুখোমুখি। একই সঙ্গে সৌদির মিত্র ইয়েমেনি বাহিনীগুলো যুদ্ধক্ষমতা ও মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতার দিক থেকে ইয়েমেনের সেনাবাহিনীর তুলনায় দুর্বল।
এই পরিস্থিতিতে রিয়াদ এমন একটি বিকল্প বাহিনী খুঁজছে, যাদের নগর ও অনিয়মিত যুদ্ধের অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং যাদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর সরাসরি নির্ভরশীলতা কমানো সম্ভব। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের পরিবর্তন এবং আহমদ আল-শারার ক্ষমতায় আসার পর সৌদি আরবের সঙ্গে সিরিয়ার ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা এবং পুনর্গঠনের জন্য জরুরি অর্থনৈতিক সহায়তার প্রয়োজনের কারণে সিরিয়া রাজনৈতিকভাবে সহজলভ্য একটি বিকল্প। সামরিক দিক থেকেও দামেস্কের ৯০তম ব্রিগেড এবং দক্ষিণ সিরিয়ার ৮৪তম ব্রিগেডের মতো ইউনিট রয়েছে, যাদের কঠিন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকেও এই পরিকল্পনা আকর্ষণীয় বলে মনে হতে পারে। কারণ এর মাধ্যমে ওয়াশিংটন নিজস্ব সেনাদের আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে সরাসরি জড়ানো ছাড়াই আঞ্চলিক মিত্রদের মাধ্যমে ইয়েমেনের সেনাবাহিনী ও সানা সরকারের ওপর চাপ বজায় রাখতে পারে। পশ্চিম এশিয়ায় সরাসরি সামরিক দায়বদ্ধতা কমিয়ে আঞ্চলিক অংশীদারদের ওপর নিরাপত্তার দায়িত্ব দেওয়ার বৃহত্তর মার্কিন কৌশলের সঙ্গেও এই পদ্ধতি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তবে এই অনুরোধের ব্যাপারে সিরিয়ার অবস্থান কৌশলগত সতর্কতা ও অভ্যন্তরীণ অগ্রাধিকারের চিত্র তুলে ধরে। সিরীয় কর্মকর্তারা সৌদি আরবের পাশে থাকার কথা বারবার বললেও সেনা পাঠানোর বিষয়ে যেকোনো চুক্তির কথা দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছেন। আহমদ মুফাক জেইদান এসব প্রতিবেদনকে ‘মিথ্যা ও ভিত্তিহীন’ বলে অভিহিত করেছেন। সিরিয়ার তথ্য মন্ত্রণালয়ও জোর দিয়ে বলেছে, দামেস্কের অগ্রাধিকার হলো দেশ পুনর্গঠন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা এবং অংশীদারদের সঙ্গে সহযোগিতা করা- নতুন কোনো যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করা নয়।
এই দ্বৈত অবস্থান- রিয়াদের প্রতি পূর্ণ রাজনৈতিক সমর্থন, কিন্তু বাস্তবে সেনা পাঠানোর বিষয়টি অস্বীকার কথা থেকে বোঝা যায় যে দামেস্ক তার প্রধান আর্থিক সহায়তাকারীর প্রতি আনুগত্য বজায় রাখার পাশাপাশি এমন একটি সাম্প্রদায়িক ও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া এড়াতে চাইছে, যা সিরিয়ার ভঙ্গুর পুনর্গঠন প্রক্রিয়াকে গুরুতর ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
এই পরিকল্পনার সামনে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো এর সাম্প্রদায়িক মাত্রা। সম্ভাব্য মোতায়েনের তালিকায় থাকা ৮৪তম ব্রিগেডে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় দেশটিতে আসা কয়েক হাজার বিদেশি তাকফিরি যোদ্ধা রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এসব বাহিনীকে ইয়েমেনের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে পাঠানো হলে ইয়েমেনের সংঘাত একটি রাজনৈতিক ও উপজাতীয় বিরোধ থেকে পূর্ণাঙ্গ সাম্প্রদায়িক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে এবং দ্রুত এর প্রভাব অঞ্চলের অন্যান্য অংশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। মার্কিন কর্মকর্তারাও এই সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করেছেন এবং এটিকে আরও অস্থিতিশীলতার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
এ ছাড়া সিরিয়া নিজেই বর্তমানে বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে একীভূত করা এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মতো চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে। ফলে দেশের বাইরে একটি সাম্প্রদায়িক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি নেওয়া দামেস্কের জন্য কঠিন।
সবশেষে, এই পরিস্থিতি থেকে যে চিত্রটি উঠে আসে, তা হলো—ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী সংকট থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছে সৌদি আরব। অন্যদিকে, সৌদি আরবের ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরশীলতা থাকা সত্ত্বেও সিরিয়া নিজের কৌশলগত সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন।
দামেস্ক ভালোভাবেই জানে, ইয়েমেনে সেনা পাঠানো- মানবিক ও আর্থিক ব্যয় বিবেচনা না করলেও- সৌদি আরবের প্রতিশ্রুত পুনর্গঠন ও বিনিয়োগের পথকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।
তাই এই অনুরোধের প্রতি দামেস্কের কৌশলকে সরাসরি ‘না’ বলা নয়, বরং ‘শর্তসাপেক্ষ হ্যাঁ’ হিসেবে দেখা যেতে পারে। অর্থাৎ, দামেস্ক রিয়াদের প্রতি নিঃশর্ত রাজনৈতিক সমর্থন অব্যাহত রাখলেও ইয়েমেন যুদ্ধে সামরিকভাবে প্রবেশের বিষয়টি কেবল এমন আনুষ্ঠানিক ও দ্বিপক্ষীয় চুক্তির কাঠামোর মধ্যেই সম্ভব বলে মনে করছে, যা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।