নিউইয়র্কের মেয়রের সরকারি বাসভবন গ্রেসি ম্যানশনে ৪৫ বছর পর কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের পা পড়ল। সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সেখানে নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানির সঙ্গে বৈঠক করেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বৈঠক শেষে মামদানির প্রতি বেশ ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, মামদানি ‘দারুণ মেয়র’ হবেন বলে তিনি আশা করেন।
ট্রাম্পের এমন মন্তব্যকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট মামদানিকে আক্রমণ করে আসছিলেন ট্রাম্প ও তার রিপাবলিকান মিত্ররা। মামদানিকে তারা ডেমোক্রেটিক পার্টির ‘কমিউনিজমের দিকে ঝুঁকে পড়ার’ উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছেন।
তবে সোমবার গ্রেসি ম্যানশনে প্রায় এক ঘণ্টার বৈঠকের পর দুই নেতার আচরণে সেই রাজনৈতিক বিরোধের তেমন প্রতিফলন দেখা যায়নি। বরং সংবাদ সম্মেলনে তাঁদের দুজনকেই বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে কথা বলতে দেখা যায়।
বৈঠকে কী নিয়ে আলোচনা হয়েছে জানতে চাইলে মামদানি বলেন, তাদের মধ্যে ‘বিস্তৃত পরিসরে’ আলোচনা হয়েছে। সাশ্রয়ী আবাসন, অভিবাসন এবং নিউইয়র্কবাসীর নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিষয় আলোচনায় এসেছে। তবে যেসব বিষয়ে তাঁদের মতপার্থক্য রয়েছে, সেগুলো নিয়ে বিস্তারিত কিছু বলেননি তিনি।
মামদানি বলেন, নিউইয়র্কের মানুষের জন্য কাজ করতে পারেন এমন যে কারও সঙ্গে তিনি সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। কুইন্সের সানিসাইড ইয়ার্ডে নতুন করে শত শত আবাসন ইউনিট নির্মাণের বিষয়েও তাঁদের দুজনের আগ্রহ রয়েছে বলে জানান তিনি।
বৈঠকে অভিবাসীদের নিরাপত্তার বিষয়টিও তুলে ধরেছেন মামদানি। তার ভাষায়, নিউইয়র্কে বসবাসকারী অভিবাসীদের নিরাপদ রাখা এবং বিশেষ করে হাইতিয়ান সম্প্রদায়ের মানুষের গুরুত্ব নিয়ে তিনি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলেছেন। শহরের সামাজিক কাঠামোর পাশাপাশি অর্থনীতিতেও অভিবাসীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা তুলে ধরেন তিনি।
মামদানি আরও বলেন, প্রেসিডেন্ট ও আমি, আমাদের মধ্যে থাকা নানা মতপার্থক্য নিয়ে সব সময়ই খোলামেলা আলোচনা করেছি।
ট্রাম্পের কাছে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়েও নিজের অবস্থান জানিয়েছেন মামদানি। হোয়াইট হাউস প্রাঙ্গণে সিএনএন, এমএস নাও ও পলিটিকোর সাংবাদিকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, নিউইয়র্ক সিটির মেয়র হিসেবে তিনি সংবাদমাধ্যমের সব সদস্যকে উপস্থিত থাকার সুযোগ দিতে চান।
ট্রাম্পও এ সময় উপস্থিত সাংবাদিকদের নিয়ে রসিকতা করেন। তিনি বলেন, তাকে বয়কট করার কথা বলা হলেও সাংবাদিকেরা শেষ পর্যন্ত তাঁকে বয়কট করেননি।
বৈঠক শেষে ট্রাম্প মামদানির প্রশংসা করে বলেন, তার মধ্যে ‘দারুণ সম্ভাবনা’ রয়েছে। একই সঙ্গে নিউইয়র্কের জন্য যা ভালো, তিনি সেটাই চান বলেও মন্তব্য করেন।
ট্রাম্প বলেন, আমি অবশ্যই আশা করি, তিনি একজন দারুণ মেয়র হবেন। আপনাকে বুঝতে হবে, আমি নিউইয়র্কের জন্য যা ভালো, সেটাই চাই। আমি দেশের জন্য যা ভালো, সেটাই চাই। আমি চাই, তিনি একজন দারুণ মেয়র হোন।
দুই নেতার বৈঠকের সময় তাদের শরীরী ভাষাতেও সৌহার্দ্যের ছাপ দেখা যায়। মামদানি বক্তব্য দেওয়ার সময় ট্রাম্প তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। পরে সংবাদ সম্মেলন শেষ হওয়ার সময় ট্রাম্প মামদানির বাহুতে দুবার হাত রাখেন।
সোমবারের বৈঠকে ট্রাম্প ও মামদানি ছাড়াও মার্কিন প্রেসিডেন্টের চিফ অব স্টাফ সুসি ওয়াইলস এবং মামদানির চিফ অব স্টাফ এল বিসগার্ড-চার্চ উপস্থিত ছিলেন।
মামদানির সঙ্গে বৈঠকের পর ট্রাম্পের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। মঙ্গলবার সেখানে ভাষণ দেবেন তিনি।
গ্রেসি ম্যানশনে ট্রাম্পের সফরটি ঐতিহাসিকও বটে। ১৯৮১ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান নিউইয়র্কের মেয়র এড কোচের সঙ্গে বৈঠক করতে সেখানে গিয়েছিলেন। এরপর দীর্ঘ ৪৫ বছরে আর কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট সেখানে যাননি।
৩৪ বছর বয়সী মামদানি নিউইয়র্কের প্রথম মুসলিম মেয়র। উগান্ডায় জন্ম নেওয়া এই ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট নেতা ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেন। অন্যদিকে ট্রাম্প সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বক্তব্যে ডেমোক্র্যাটদের কঠোরভাবে সমালোচনা করে আসছেন।
তবু সোমবারের বৈঠকে দুই নেতার বক্তব্যে নিউইয়র্কের আবাসন, অভিবাসন ও নিরাপত্তার মতো বাস্তব ইস্যুতে একসঙ্গে কাজ করার সম্ভাবনার বিষয়টিই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।