আন্তর্জাতিক ডেস্ক : বহু দশক ধরে ভারত হিমালয়ের একটি বিতর্কিত অঞ্চলে পাকিস্তান-চীন সীমান্তকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে এসেছে, যেটিকে দিল্লি নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে। কিন্তু গত সপ্তাহে পাকিস্তান ও চীন ওই পার্বত্য অঞ্চলের একটি প্রত্যন্ত অংশে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের সীমান্ত নির্ধারণ করেছে, যা নিয়ে দিল্লির তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। দুই দেশ পাকিস্তান-চীন সীমান্ত যৌথ কমিশন গঠন সংক্রান্ত একটি চুক্তিতে সই করেছে।
পাকিস্তান একে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক" হিসেবে বর্ণনা করেছে, যা সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য ও সংযোগের ক্ষেত্রে ভারতের আঞ্চলিক দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে সহযোগিতা আরও গভীর করবে। ---- সূত্র, বিবিসি বাংলা
দিল্লি এই পদক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, এর কোনো আইনি ভিত্তি নেই। ভারতের দাবি, যে ভূখণ্ডে এই সীমান্ত অবস্থিত, সেটি ভারতের অংশ এবং সে কারণে তারা কোনো পাকিস্তান-চীন সীমান্তকে স্বীকৃতি দেয় না। বিশেষভাবে সংবেদনশীল একটা সময়ে এই ঘোষণাটি এলো।
হিমালয় সীমান্তের বড় অংশজুড়ে উভয় বাহিনীকে পৃথক করা বিতর্কিত রেখা লাইন অব অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল (এলএসি) ঘিরে কয়েক বছরের সামরিক উত্তেজনার পর ভারত ও চীন তাদের সম্পর্ক স্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে।
এমন একটা সময়ে বেইজিং ও ইসলামাবাদ সীমান্তের একটি পার্শ্ববর্তী অংশে নিজেদের সহযোগিতা আরও গভীর করছে, যে এলাকার ওপর ভারতেরও দাবি রয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, "পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে কোনো সীমান্ত নেই। আমরা তথাকথিত যৌথ কমিশন প্রত্যাখ্যান করছি, যার কোনো আইনি ভিত্তি নেই।
এই কমিশন পাকিস্তান-চীন সীমান্তসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে কাজ করে, যার মধ্যে রয়েছে শাকসগাম উপত্যকা। প্রায় ৫,১৮০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই অঞ্চলটি পাকিস্তান ১৯৬৩ সালে চীনের কাছে হস্তান্তর করেছিল, কিন্তু ভারত এটিকে লাদাখে অবস্থিত নিজের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে।
ভারতের দাবি, অঞ্চলটি জম্মু ও কাশ্মীরের সাবেক দেশীয় রাজ্যের অংশ ছিল এবং পাকিস্তান অবৈধভাবে এটি দখল করার পর চীনের কাছে হস্তান্তর করে। ভারত সরকার কখনও এই চুক্তিকে স্বীকৃতি দেয়নি এবং এটিকে অবৈধ ও অকার্যকর বলে মনে করে। এই ইতিহাসই বুধবারের ঘোষণাটিকে বিশেষভাবে সংবেদনশীল করে তুলেছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ভারতের ভূখণ্ড, যা অবৈধ ও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে তাদের দখলে রাখা হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণের অধিকার পাকিস্তানের নেই। পাকিস্তান বলছে, জম্মু ও কাশ্মীর এখনও একটি বিতর্কিত অঞ্চল, এবং তাই ১৯৬৩ সালের চীন-সংক্রান্ত সীমান্ত চুক্তি নিয়ে ভারত প্রশ্ন তোলার অবস্থানে নেই। পাকিস্তান চুক্তিটিকে বৈধ বলে মনে করে।
দিল্লির শিব নাডার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও গভর্ন্যান্স স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক জাবিন টি জেকব বলেন, ''সর্বশেষ এই ঘটনা দুই পক্ষের বহু পুরনো বৈরিতার আরেকটা প্রকাশ বলা যেতে পারে, একেবারে নতুন কিছু নয়''।
তিনি বিবিসিকে বলেন, "১৯৬৩ সালের চীন-পাকিস্তান চুক্তিতেই একটি যৌথ সীমান্ত কমিশনের কথা বলা হয়েছিল। এখন প্রশ্ন হলো, কেন এটি এই সময়ে কার্যকর করা হলো। তিনি বিবিসিকে বলেন, ১৯৬৩ সালের চীন-পাকিস্তান চুক্তিতেই একটি যৌথ সীমান্ত কমিশনের কথা বলা হয়েছিল। এখন প্রশ্ন হলো, কেন এটি এই সময়ে কার্যকর করা হলো।
তার মতে, এর পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে চীনের বৃহত্তর সীমান্ত নির্ধারণ প্রচেষ্টা এবং পাকিস্তানের অন্যান্য সীমান্তে সংঘাত ও অস্থিতিশীলতার সময়ে এই সীমান্তে যোগাযোগ ও চলাচলকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার আগ্রহ। জাবিন টি জেকব বলেন, এই উন্নয়ন নিয়ে ভারতের "উদ্বিগ্ন" হওয়া উচিত।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তার মতে, এই পদক্ষেপটি ১৯৬৩ সালের চুক্তির একটি ধারাকেও উপেক্ষা করছে বলে মনে হয়।
তিনি বলেন, চুক্তির ৬ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কাশ্মীর বিরোধ নিষ্পত্তির পর যে দেশ শেষ পর্যন্ত ওই ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ পাবে, তার সঙ্গে চুক্তিটি পুনরায় আলোচনা করার কথা ছিল। জেকবের মতে, ভারতের জন্য সমস্যাটি আন্তর্জাতিক তথ্য পরিবেশনের কারণেও জটিল হয়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও তথ্য পরিবেশনের ক্ষেত্রে চীনের তুলনামূলক প্রাধান্য, যেমন সিজিটিএন, সিআরআই এবং সামাজিক মাধ্যমে তাদের উপস্থিতি, তাদেরকে বৈশ্বিক পরিসরে নিজেদের বয়ান ও মানচিত্র তুলে ধরার সুযোগ দেয়। অন্যদিকে ভারত প্রায়শই এমন প্রতিক্রিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, যা বিশ্বের অন্যান্য রাজধানী উপেক্ষা করতে পারে।