ইরানে একটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার পর প্রায় ৫০ ঘণ্টা শত্রু নিয়ন্ত্রিত এলাকায় লুকিয়ে ছিলেন এক মার্কিন সেনা কর্মকর্তা। ভাঙা পিঠ, হাত ও কাঁধ নিয়ে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় ৭ হাজার ফুট উঁচু একটি রিজলাইন পেরিয়ে তিনি শেষ পর্যন্ত মার্কিন বাহিনীর উদ্ধারকারী দলের হাতে ফিরে আসেন।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২ এপ্রিল ইরানের একটি কাঁধে বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে মার্কিন বিমানবাহিনীর ‘এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল’ যুদ্ধবিমানটি ভূপাতিত হয়। এতে বিমানে থাকা দুই কর্মকর্তা প্যারাসুট নিয়ে ইরানের ভূখণ্ডে অবতরণ করতে বাধ্য হন।
বিমানের পাইলট, যাকে ‘আলফা’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই উদ্ধার হন। তবে অস্ত্র ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা ‘ব্রাভো’ দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত হন। নিরাপত্তাজনিত কারণে তার প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।
প্যারাসুট ছাড়াই নিচে পড়ে যাওয়ার আতঙ্ক: সম্প্রতি সিবিএসের ‘৬০ মিনিট’ অনুষ্ঠানে প্রথমবারের মতো নিজের সেই অভিজ্ঞতা প্রকাশ করেন ব্রাভো। তিনি তার বেঁচে ফেরার ঘটনাকে ‘আধুনিক যুগের অলৌকিক ঘটনা’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
ব্রাভো জানান, ক্ষেপণাস্ত্রটি বিমানটিতে আঘাত করার মুহূর্তটি তার কাছে মনে হয়েছিল যেন ‘একটি মালবাহী ট্রেন’ আঘাত করেছে। পাইলট বিমানটি বাঁচানোর চেষ্টা করলেও দ্রুত বুঝতে পারেন, সেটি আর নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব নয়। পরে দুজনই বিমান থেকে বের হয়ে প্যারাসুটে অবতরণের চেষ্টা করেন। তবে ব্রাভোর প্যারাসুটে সমস্যা দেখা দেয়।
তিনি আরো জানান, একপর্যায়ে ওপরে তাকিয়ে দেখেন, তার প্যারাসুট আর দেখা যাচ্ছে না। মুহূর্তটিকে জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর অভিজ্ঞতা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি প্রার্থনা করেন। দ্রুতগতিতে মাটিতে আছড়ে পড়ায় তার পিঠ, একটি হাত ও একটি কাঁধ ভেঙে যায়। কিন্তু আহত অবস্থাতেও তিনি বুঝতে পারেন, শত্রু এলাকায় পড়ে গেছেন এবং সেখান থেকে দ্রুত সরে যেতে হবে।
৭ হাজার ফুট উঁচু পাহাড়ে আশ্রয়: ব্রাভো জানান, তিনি এমন একটি উপত্যকায় পড়ে ছিলেন, যার দুই পাশে ছিল খাড়া পাহাড়। পরিস্থিতি বিবেচনা করে তিনি নিচে না থেকে পাহাড়ের দিকে ওঠার সিদ্ধান্ত নেন। ভাঙা হাড় নিয়েই তিনি প্রায় ৭ হাজার ফুট উঁচু একটি পাহাড়ি রিজলাইনে উঠে যান। সেখানে লুকিয়ে থেকে প্রায় দুই দিন ইরানি বাহিনীর চোখ এড়িয়ে থাকার চেষ্টা করেন।
ব্রাভোর ভাষায়, সামরিক প্রশিক্ষণে প্রতিকূল পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার শিক্ষা দেওয়া হয়। আহত থাকা সত্ত্বেও তিনি যত দ্রুত সম্ভব ঘটনাস্থল থেকে দূরে সরে যান।
হালকা রসিকতা করে তিনি বলেন, ‘প্রেরণার অভাবে কখনোই নিজেকে ইরানের টেলিভিশনে তুলে দেবেন না।’
শত শত সেনা ও বিমান নিয়ে উদ্ধার অভিযান: বিমানটি ভূপাতিত হওয়ার খবর যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছালে তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে মাঝরাতে ঘুম থেকে ডেকে তোলা হয়। এরপর দুই সেনাকে জীবিত অথবা মৃত অবস্থায় ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয় মার্কিন সামরিক বাহিনী।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, অভিযানে আকাশপথে শত শত সেনা এবং আরও কয়েক হাজার সদস্য সহায়তায় যুক্ত ছিলেন। এ অভিযানে ৯০ জনের বেশি মার্কিন সেনা ইরানের মাটিতে প্রবেশ করেন। কুপারের দাবি, ৪৬ বছরের মধ্যে এটিই ছিল ইরানের মাটিতে মার্কিন সেনাদের প্রথম সরাসরি মোতায়েন। পাইলট ‘আলফা’কে ৬ ঘণ্টার মধ্যেই খুঁজে পাওয়া গেলেও ব্রাভোর অবস্থান শনাক্ত করতে আরও অনেক সময় লাগে। এ সময় তিনি প্রায় কোনো খাবার ও পানি ছাড়াই পাহাড়ে লুকিয়ে ছিলেন। পরে কোনোভাবে মার্কিন বাহিনীকে নিজের অবস্থানের তথ্য জানাতে সক্ষম হন।
ইরানি বাহিনীকে লক্ষ্য করে হামলা: ব্রাভোর অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার পর তাকে উদ্ধারের পথ পরিষ্কার করতে মার্কিন সামরিক বাহিনী অভিযান চালায়। তার আশপাশে থাকা ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সদস্যদের লক্ষ্য করে বোমারু বিমান ও ড্রোন দিয়ে হামলা চালানো হয়। এরপর একটি বিশেষ উদ্ধারকারী দল সেখানে পৌঁছে তাকে উদ্ধার করে।
এই অভিযানে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইরানি বাহিনীকে বিভ্রান্ত করতে তারা একটি ‘ডিসেপশন ক্যাম্পেইন’ চালায় এবং নিখোঁজ সেনার অবস্থান শনাক্ত করতে শ্রেণিবদ্ধ প্রযুক্তি ব্যবহার করে। প্রায় ৫০ ঘণ্টার অনুসন্ধান শেষে অবশেষে ব্রাভোকে খুঁজে বের করা হয়। উদ্ধার হওয়ার মুহূর্তটিকে তিনি জীবনের অন্যতম সেরা মুহূর্ত হিসেবে বর্ণনা করেন।