সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের প্রতিবেদন: দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা ও বাণিজ্যে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে চীনের প্রতি বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান ঝোঁক। বিশ্লেষকদের মতে, এর মাধ্যমে আঞ্চলিক রাজনীতিতে নিজেদের একটি স্বতন্ত্র ও কৌশলী শক্তি হিসেবে তুলে ধরার এবং ভারতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর ইচ্ছা প্রকাশ করছে ঢাকা।
২০২৪ সালে ছাত্র নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। এরপর নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় আসা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) আমলে বেইজিংয়ের সাথে ঢাকার কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে।
পরিকাঠামোগত উন্নয়ন ও বাণিজ্যের পাশাপাশি বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও সুসংহত করতে ঢাকা ও বেইজিং কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কেন্দ্রিক একটি "২+২" সংলাপ শুরু করতে যাচ্ছে। গত ৩০ আগস্ট চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের সাথে বৈঠকের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির এই উদ্যোগের কথা জানান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশীয় পররাষ্ট্রনীতির সহযোগী অধ্যাপক শফী মো. মোস্তফা মনে করেন, এই সংলাপের সুদূরপ্রসারী আঞ্চলিক কূটনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে এবং এটি বাহ্যিক অংশীদারিত্বকে বহুমুখী করার ঢাকার একটি সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টাকে নির্দেশ করে।
মোস্তফা বলেন, "অবকাঠামো, বাণিজ্য এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়নে চীনের ভূমিকা অপরিহার্য, যদিও বাংলাদেশ ভারত ও অন্যান্য অংশীদারদের সাথেও যুক্ত রয়েছে। কৌশলগত ভারসাম্যের এই নীতি ঢাকাকে বেইজিংয়ের কাছ থেকে অর্থনৈতিক সুবিধা ও উন্নত প্রযুক্তি অর্জনের সুযোগ দেয়, একই সাথে কোনো একটি একক শক্তির ওপর অতি-নির্ভরতা এড়াতে সাহায্য করে।"
তিনি আরও উল্লেখ করেন, এই পদক্ষেপ দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতিকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে, যা আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্যকে পুনরায় সাজাতে পারে এবং ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশকে তাদের নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতি পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করছে।
"বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী হিসেবে ভারতের ভূমিকা অস্বীকার করার উপায় নেই। সংযোগ, জ্বালানি ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ঢাকা নয়াদিল্লির সাথে সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছে," মোস্তফা বলেন। "তবে চীনের কাছ থেকে যুদ্ধবিমান কেনা এবং কৌশলগত প্রতিরক্ষা সম্পর্ক গভীর করা নিঃসন্দেহে ভারতের সংবেদনশীলতাকে বাড়িয়ে তুলবে।"
জটিল ভারসাম্যের খেলা
চীন থেকে প্রায় ২.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের ২০ থেকে ২৪টি 'জে-১০সিই' (৪.৫ প্রজন্মের বহুমুখী) যুদ্ধবিমান কেনার চুক্তি চূড়ান্ত করেছে বাংলাদেশ।
মোস্তফা মনে করেন, বাংলাদেশের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো চীনের সাথে অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি ভারতের সাথে ব্যবহারিক ও বাস্তবসম্মত সম্পর্ক বজায় রেখে সমান্তরাল ভারসাম্য বজায় রাখা।
তিনি বলেন, "যেকোনো সচেতন বাংলাদেশ সরকারের জন্য অর্থনৈতিক স্বার্থ সর্বাগ্রে থাকে। তাই বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অবকাঠামো খাতে চীনের ভূমিকা বেইজিংকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারে পরিণত করেছে।"
মোস্তফা যোগ করেন, চীনের সাথে সম্পর্কের নতুন মাত্রা যুক্ত হলেও ভারতের সাথে রাতারাতি বড় ধরনের কূটনৈতিক সম্পর্কচ্ছেদের সম্ভাবনা নেই; বরং বাংলাদেশ এক গভীর "ভারসাম্যের রাজনীতিতে" প্রবেশ করছে। "ঢাকা দুই শক্তির মাঝেই ভারসাম্য রক্ষা করে চলবে, যাতে কোনো দেশের সাথে সম্পর্কই দেশের সার্বভৌমত্ব বা উন্নয়নের অগ্রাধিকারকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে না পারে।"
হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে ঢাকা ও বেইজিং বাণিজ্য ও বিনিয়োগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অন্তত ১৫টি নতুন সমঝোতা স্মারক ও চুক্তি স্বাক্ষর করে তাদের সম্পর্ক দ্রুত সম্প্রসারিত করেছে।
জুন মাসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফরের সময় ১১টি চীনা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে ৯.২১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দেয়।
যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক বিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক বিষয়ের গবেষক ওমের করিম বলেন, ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কের এই উন্নয়ন দক্ষিণ এশিয়ায় একটি স্বাধীন কৌশলগত শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশের আকাঙ্খাকে স্পষ্ট করে।
করিম বলেন, "ঢাকা তার নিজস্ব কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা করতে চায় এবং দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক দাবার বোর্ডে একজন স্বাধিন খেলোয়াড় হিসেবে উদয় হতে চাইছে।"
"চীনের সাথে প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বৃদ্ধি করা ঢাকার জন্য একটি নিরাপদ পদক্ষেপ। ঐতিহ্যগতভাবে নিরাপত্তার জন্য ভারতের ওপর যে নির্ভরতা ছিল, তা পরিবর্তন হতে শুরু করেছে এবং ভারতের বিপরীতে ঢাকা এখন নতুন কৌশলগত ভারসাম্যের আচরণ প্রদর্শন করছে।"
বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতি
ওমের করিমের মতে, প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় ভারতের এই আশঙ্কা তৈরির কারণে নয়াদিল্লি এই "২+২" সংলাপকে ভারতের চতুর্দিক ঘিরে ফেলার একটি চীনা প্রচেষ্টা হিসেবে দেখতে পারে, যা ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলবে।
শেখ হাসিনাকে ভারতে আশ্রয় দেওয়ার পর ঢাকা ও দিল্লির মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্ক কিছুটা শীতল হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের নতুন সরকার আদালতের বিচার প্রক্রিয়ার জন্য তাকে ফেরত (প্রত্যর্পণ) চাইছে।
বাংলাদেশে দায়িত্ব পালনকারী অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন কূটনীতিক জন ড্যানিলোভিচ মনে করেন, শেখ হাসিনার পতনের পর চীন তাদের রাজনৈতিক তাস অত্যন্ত নিখুঁতভাবে খেলেছে।
তিনি বলেন, "অন্তর্বর্তী সরকারের সময়জুড়ে চীন বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছিল এবং তিন প্রধান দলের প্রতিনিধিদের চীন সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। ফলস্বরূপ, বর্তমানে চীনের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়ে বাংলাদেশে একটি সুদৃঢ় জাতীয় রাজনৈতিক ঐক্যমত্য রয়েছে।"
তিনি আরও যোগ করেন, বর্তমান বিএনপি সরকার যেহেতু "বাংলাদেশ ফার্স্ট" পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে, তাই চীনের সাথে শক্ত সম্পর্ক তাদের বহুমুখী আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হয়ে থাকবে। "নিঃসন্দেহে এটি মিয়ানমার এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সামগ্রিক রাজনীতিতে চীনের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করছে।"
ড্যানিলোভিচ উল্লেখ করেন, ভারতের অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব এখনো প্রবল। তবে চীনের জোরালো সমর্থন রয়েছে—এই ধারণা ঢাকাকে ভারতের যেকোনো অযাচিত চাপ প্রতিরোধে সহায়তা করে।
"এখন সিদ্ধান্ত ভারতের হাতে—তারা কি বাংলাদেশের ওপর পূর্বের প্রভাব বজায় রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাবে, নাকি একটি স্বাধীন ও স্বাবলম্বী প্রতিবেশীর সাথে মানিয়ে নেবে," তিনি বলেন।
এছাড়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথেও বাংলাদেশ সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটাতে চাইছে বলে মন্তব্য করেন ড্যানিলোভিচ।
ওয়াশিংটনের ইস্ট-ওয়েস্ট সেন্টারের সহযোগী গবেষক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক নিলান্তি সামারানায়েকে উল্লেখ করেন, শেখ হাসিনার পতনের আগেই চীন ছিল বাংলাদেশের সামরিক সরঞ্জামের প্রধান সরবরাহকারী।
তা সত্ত্বেও, ভারতকে ক্ষুব্ধ করা বাংলাদেশের স্বার্থের অনুকূল নয়। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকার সময়ও চীনের সাথে বাংলাদেশের সুসম্পর্ক দিল্লির উদ্বেগের কারণ ছিল বলে তিনি জানান।
সামারানায়েকে বলেন, "২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর অর্থনীতি ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতি স্থিতিশীল করতে এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের কূটনৈতিক ও সামরিক উপস্থিতি বাড়াতে বাংলাদেশের এখন যত বেশি সম্ভব নির্ভরযোগ্য অংশীদার প্রয়োজন।"