শিরোনাম

প্রকাশিত : ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৬:২৮ বিকাল
আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৭:০৯ বিকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

শি জিনপিংয়ের দিল্লি সফরের মধ্যেই বিতর্কিত সীমান্তে চীনের অগ্রযাত্রা, পিছু হটছে ভারতীয় গ্রামবাসীরা

চীনের সঙ্গে ভারতের প্রত্যন্ত সীমান্ত গ্রামগুলোতে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানকার আদিবাসী জনগোষ্ঠী জানিয়েছে, চীনা সেনাবাহিনীর দ্রুত অগ্রযাত্রার কারণে তারা তাদের পূর্বপুরুষের ঐতিহ্যবাহী চারণভূমি ও শিকারের জমি ছেড়ে পিছু হটতে বাধ্য হচ্ছে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম 'দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট'-এর হাতে আসা স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, ভারতের অরুণাচল প্রদেশের বিতর্কিত সীমান্ত বরাবর এবং এর কাছাকাছি একাধিক স্থানে অবকাঠামোর দ্রুত বিস্তার ঘটিয়েছে চীন। যার মধ্যে রয়েছে নতুন নতুন ভবন, পাকা সড়ক এবং একাধিক হেলিপ্যাড।

হিমালয়ের দুর্গম এই অংশের সীমান্ত নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আঞ্চলিক দাবি-পাল্টা দাবি রয়েছে। দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সেখানে ভারতীয় বাহিনীর স্থায়ী উপস্থিতি বজায় রাখা কঠিন। স্যাটেলাইট চিত্রে ফুটে ওঠা এই রূপান্তর সীমান্তবর্তী আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে চরম উদ্বেগ তৈরি করেছে।

অরুণাচল প্রদেশে সীমান্ত থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন স্থানীয় বাসিন্দা তাকোক ম্রা। পুরো অরুণাচল প্রদেশকেই চীন নিজেদের অংশ দাবি করে একে 'জাংনান' বা 'দক্ষিণ তিব্বত' বলে ডাকে। ম্রা জানান, পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করলে তিনি চীনা সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতেও প্রস্তুত।

ম্রা বলেন, 'চীনারা এখন আমাদের পূর্বপুরুষের জমি দখল করছে। এই ভূখণ্ড থেকেই আমরা খাবার সংগ্রহ করি, বেঁচে থাকি এবং জীবিকা নির্বাহ করি; এটা আমাদেরই জমি। তারা ইতিমধ্যে ভারতীয় ভূখণ্ডের অনেক ভেতরে ঢুকে পড়েছে। তারা ঠিক কত কিলোমিটার জায়গা দখল করেছে তা সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারব না, তবে তারা অনেক বড় এলাকা দখল করে নিয়েছে।'

ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং চলতি সপ্তাহে ভারত সফর করছেন। শনিবার তিনি নয়াদিল্লী পৌঁছান। সেখানে তার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। বছরের পর বছর ধরে দুই দেশের মধ্যকার বৃহত্তম চীনা প্রতিনিধি দলের এই সফরকে কেন্দ্র করে উভয় সরকারই সীমান্ত উত্তেজনাকে কম গুরুত্ব দিয়ে দেখানোর চেষ্টা করছে। তারা দাবি করছে, ২০২০ সালে কমপক্ষে ২০ জন ভারতীয় সেনার প্রাণহানি ঘটানো রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মতো কোনো অচলাবস্থা সীমান্তে নেই।

তবে স্যাটেলাইট চিত্র এবং সীমান্ত গ্রামের বাসিন্দাদের সাক্ষ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। চিত্রগুলোতে বিতর্কিত ভূখণ্ডে চীনাদের ধারাবাহিক অগ্রগতি এবং অবকাঠামো নির্মাণের স্পষ্ট প্রমাণ মিলছে, যা এখনও দুই দেশের কূটনৈতিক ও সামরিক পর্যায়ের আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে আছে।

ভ্যান্টর-এর সরবরাহ করা স্যাটেলাইট চিত্রে বিশ্লেষকরা আপার সুবনসিরি উপত্যকায় একাধিক স্থানে সাম্প্রতিক নির্মাণ ও অবকাঠামোগত পরিবর্তনের কথা জানিয়েছেন। তাকোক ম্রার গ্রাম  'গেলেমো' এই অঞ্চলেই অবস্থিত।

আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত গোয়েন্দা তথ্য সংস্থা 'জেনস'-এর তথ্য অনুযায়ী, তিব্বতের লহুনজে কাউন্টির উত্তরে ঝারি শহরের কাছাকাছি দুটি এলাকায় সবচেয়ে স্পষ্ট নির্মাণযজ্ঞ দেখা গেছে। এই এলাকাটি বর্তমানে চীনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

জেনসের বিশ্লেষকরা বলেন, 'স্যাটেলাইট চিত্র নিশ্চিত করছে যে সীমান্তবর্তী এসব এলাকায় সম্প্রতি নির্মাণকাজ চালানো হয়েছে।' তাঁরা আরও যোগ করেন, স্যাটেলাইট চিত্রের ওপর ভারত ও চীন উভয়ের দাবি করা সীমান্তরেখা বসালে দেখা যায়—এই অবকাঠামোগুলোর কিছু অংশ দুই দেশেরই দাবি করা বিতর্কিত অঞ্চলের একেবারে ভেতরে পড়েছে।

ঝারি শহরের দক্ষিণে একটি স্থানে ২০১৯ সালের শুরুর দিকে নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল—যার প্রথম কাঠামো চোখে পড়ে ওই বছরের আগস্টে—যা এখনো চলমান রয়েছে। স্থানটিতে জমি সমান করা, প্রকৌশল যানের উপস্থিতি এবং সিমেন্ট তৈরির প্ল্যান্ট বসানোর প্রমাণ মিলেছে। বিশ্লেষকরা দ্য ইন্ডিপেনডেন্টকে জানিয়েছেন, এটি সামরিক কাজে ব্যবহারের সম্ভাবনা কোনোভাবেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

শহরের ভেতরে অপর একটি নির্মাণস্থল সামরিক স্থাপনা হওয়ার সম্ভাবনাও সমানভাবে রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

কাছাকাছি একটি সড়কের প্রশস্ততা বাড়ানো হয়েছে এবং খাড়া ঢাল কমানো হয়েছে—এমন উন্নয়ন সাধারণত ভারী সামরিক সরঞ্জাম আনা-নেওয়া সহজ করে এবং বছরজুড়ে সড়ক ব্যবহারের পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে গণ্য হয়।

লহুনজের দক্ষিণে দুটি ছোট হেলিপ্যাডের বদলে একটি নতুন বড় হেলিপ্যাড তৈরি করা হয়েছে এবং এর আরও দক্ষিণে আরেকটি নতুন হেলিপ্যাড গড়ে তোলা হয়েছে।

২০২৬ সালের আগস্টের সর্বশেষ স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, অন্তত একটি ভবনের ছাদ তৈরি সম্পন্ন হয়েছে, যা প্রমাণ করে নির্মাণকাজ পুরোদমে চলছে। ভবনের নকশা, সামরিক যানের সাথে মিল থাকা গাড়ির উপস্থিতি এবং সংলগ্ন প্রশিক্ষণ এলাকা দেখে বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন যে এটি সম্ভবত একটি সামরিক ঘাঁটি। এছাড়া ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে শহরের সঙ্গে সংযোগকারী একটি নতুন সড়কও তৈরি করা হয়েছে।

এমন এক স্পর্শকাতর সময়ে এই অভিযোগগুলো সামনে এলো যখন চীন-ভারত সম্পর্ক অত্যন্ত সংবেদনশীল পর্যায়ে রয়েছে। ২০২০ সালে গালওয়ান উপত্যকার সীমান্ত সংঘর্ষের পর—যা দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশের সম্পর্ককে কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে এনেছিল—শি জিনপিংয়ের এটিই প্রথম দিল্লি সফর। এই সফরে তার সঙ্গে প্রায় ৪০০ কর্মকর্তার একটি বিশাল প্রতিনিধি দল রয়েছে।

চীনা তৎপরতা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বাড়তে থাকায় দুটি স্বাধীন অনুসন্ধানী দল পূর্ব হিমালয়ের ভারত-চীন সীমান্ত থেকে প্রায় ১৫-২০ কিলোমিটার দূরের প্রত্যন্ত পাহাড়ি গ্রাম গেলেমো ও তাকসিং সফর করে সরেজমিন পরিস্থিতি মূল্যায়ন করেছে।

অরুণাচলের তাগিন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন 'অল তাগিন স্টুডেন্টস ইউনিয়ন' (এটিএসইউ)-এর সভাপতি তাদাক পাকবা আট সদস্যের একটি দল নিয়ে গেলেমো ও তাকসিং সফর করেন। তাঁরা স্থানীয় বাসিন্দা, আদিবাসী জনগোষ্ঠী এবং সেনাবাহিনীর রসদ বহনকারীদের (পোর্টার) কাছ থেকে সরাসরি তথ্য সংগ্রহ করেন।

পাকবা বলেন, বর্তমানে যেভাবে চীনা অনুপ্রবেশ ঘটছে, তা 'অতীতে কখনো দেখা যায়নি।'

তিনি বলেন, 'সীমান্তের গ্রামগুলোতে কেবল আতঙ্কই বিরাজ করছে না, এটিই এখনকার মাঠপর্যায়ের কঠিন বাস্তবতা। ভারতীয় সেনাবাহিনী পিছু হটছে এবং চীনা সেনাবাহিনী সামনের দিকে এগিয়ে আসছে।'

গত ১১ থেকে ১৩ আগস্টের মধ্যে স্থানীয় নেতা পাকবা ও তাঁর দল তিন দিনের মাঠপর্যায়ের তদন্ত চালান। তাঁরা জানান, সাধারণত ভারতীয় সেনাবাহিনী যেসব এলাকায় টহল দিত, এমন বেশ কয়েকটি স্থানে চীনা বাহিনী প্রবেশ করেছে।

এর মধ্যে রয়েছে দুর্গম শিকারের স্থান এবং ইয়াক চরানোর চারণভূমি, যেখানে বহু বছর ধরে ভারতীয় গ্রামবাসীদের অবাধ যাতায়াত ছিল। পাকবা বলেন, 'গ্রামবাসীদের বর্তমানে ওই অঞ্চলগুলোতে যেতে নিষেধ করা হয়েছে... এটি স্থানীয়দের মধ্যে চরম আতঙ্ক তৈরি করেছে, যার ফলে অনেকে সীমান্ত এলাকা ছেড়ে অন্যত্র সরে যাচ্ছেন।' তিনি আরও যোগ করেন, 'এই সবকিছুই একেবারেই সাম্প্রতিক—চলতি বছরের জুন মাস থেকে এসব ঘটছে।'

অনুসন্ধানী দলটি আপার সুবনসিরির ডেপুটি কমিশনার এবং মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তরে একটি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে, যা দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট দেখতে পেয়েছে। প্রতিবেদনে তাকসিং-গেলেমো সীমান্ত অঞ্চলে 'চীনা পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) উপস্থিতি ও তৎপরতা' বন্ধে 'অবিলম্বে হস্তক্ষেপের' দাবি জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এটিকে কোনো 'সাধারণ উন্নয়নমূলক সমস্যা' হিসেবে না দেখে 'কৌশলগত ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়' হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

এই বিষয়টি প্রথম প্রকাশ্যে আনে 'নাহ ওয়েলফেয়ার সোসাইটি' (এনডব্লিউএস)। এটি স্থানীয় 'নাহ' আদিবাসী সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন, যারা বহু প্রজন্ম আগে তিব্বত থেকে অভিবাসী হয়ে এসে আপার সুবনসিরি জেলায় বসতি গড়েছিল।

সংগঠনটি আপার সুবনসিরির ডেপুটি কমিশনারের কাছে একটি স্মারকলিপি জমা দিয়ে দাবি করেছে যে, স্থানীয়দের ঐতিহ্যবাহী চারণভূমি, শিকারের স্থান ও বনজ সম্পদ সংগ্রহের জায়গায় পিএলএ সড়ক, সেতু এবং সামরিক ক্যাম্প স্থাপন করেছে।

স্মারকলিপিতে তারা আরও বলেছে, 'তাকসিংয়ে চীনা পিএলএ-এর বর্তমান তৎপরতার গতি ও উদ্দেশ্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আমরা প্রতিদিন ইঞ্চি ইঞ্চি করে আমাদের জমি হারিয়ে ফেলছি।'

তাকোক ম্রার মতো স্থানীয়দের কাছে সীমান্ত বরাবর এই ঐতিহ্যবাহী জমি হারানোর বিষয়টি কেবল কোনো বিমূর্ত আঞ্চলিক বিরোধ নয়—এটি তাঁদের ব্যক্তিগত অপূরণীয় ক্ষতি। ১৯৬২ সালের ভারত-চীন যুদ্ধের পর থেকেই তাঁর পরিবার এই পূর্বপুরুষের জমি রক্ষা করে আসছে।
৩৮ বছর বয়সী ম্রা বলেন, 'আমি একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক। আমাদের দেশ ও মাটি রক্ষার জন্য আমাদের হাতে অস্ত্র তুলে দিন।'

হিমালয়ের বনে শিকার ও পশুপালন করা এই আদিবাসীরা সীমান্ত সংঘাতে কেবল নীরব দর্শক নন; বিতর্কিত অঞ্চলে যেকোনো সেনা চলাচলের খবর তাঁরা দ্রুত ভারতীয় সেনাবাহিনীকে পৌঁছে দেন। ম্রা জানান, গত জুনের শুরুতে তাঁরাই প্রথম এলাকায় চীনা সেনার উপস্থিতির কথা ভারতীয় বাহিনীকে জানিয়েছিলেন—যার পরই সেনাবাহিনী ওই এলাকায় তৎপরতা বাড়ায়।

গ্রামে বিদ্যুৎ, রাস্তা, স্বাস্থ্যসেবা ও স্কুলের মতো মৌলিক সুবিধার অভাব নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে ম্রা সীমান্তের ওপারে চীনের আগ্রাসী অবকাঠামো উন্নয়নের সাথে নিজের এলাকার চরম বৈসাদৃশ্য তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, 'আমরা যখন আমাদের গেলেমো গ্রামে যাই, তখন নিজেদের পুরো পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন মনে হয়। মৌলিক সুযোগ-সুবিধার অভাবে আমাদের স্থানীয় মানুষ জীবিকার তাগিদে জেলা সদরে চলে যাচ্ছে। আর এ কারণেই সীমান্ত এলাকাগুলো ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে পড়ছে।' তিনি ইঙ্গিত দেন যে, প্রত্যন্ত এই অঞ্চলগুলো জনশূন্য হয়ে পড়ার কারণেই মূলত চীনা বাহিনী সহজে এগিয়ে আসার সুযোগ পাচ্ছে।

দ্বিতীয় আরেকটি অনুসন্ধানী দল পাঠিয়েছিল 'পিপলস পার্টি অব অরুণাচল' (পিপিএ)—যা কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) আঞ্চলিক জোটের অংশীদার। চার সদস্যের এই দলটি সীমান্ত এলাকা পরিদর্শন করে।

পিপিএ-এর প্রধান উপদেষ্টা এবং রাজ্যের সাবেক মন্ত্রী কাপা বেঙ্গিয়া ছিলেন এই দলের সদস্য। তাঁরা তাকসিং, গেলেমো এবং সীমান্তের সবচেয়ে কাছের গ্রামগুলোর অন্যতম মাজায় যান।

বেঙ্গিয়া বলেন, 'চীনা সেনাবাহিনী ইতোমধ্যেই সামনের দিকে অগ্রসর হয়েছে এবং আমাদের টহল দলকে এখন নিজেদের ভূখণ্ডের দিকেও যেতে দেওয়া হচ্ছে না।'

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রত্যন্ত তাকসিং সার্কেলের নঙ্গা পাহাড়—যা নাহ এবং অন্যান্য উপজাতিরা ঐতিহাসিকভাবে ব্যবহার করত—সেটিকে এখন স্থানীয়দের জন্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

ভারতীয় সেনাবাহিনী অবশ্য বিতর্কিত ভূখণ্ডে চীনা অনুপ্রবেশের খবরগুলোকে 'ভুল ও ভিত্তিহীন' বলে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে।

তবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিক্রিয়া ছিল অপেক্ষাকৃত সতর্ক। তারা দুই দেশের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে সীমান্ত সমস্যাকে 'অনেক বেশি গুরুতর' একটি বিষয় হিসেবে বর্ণনা করেছে।

ভারত সরকারের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, 'আমরা স্পষ্ট জানিয়েছি যে আমাদের সার্বিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অবস্থা সীমান্তের পরিস্থিতির ওপরই প্রতিফলিত হবে।'

চীনও এ বিষয়ে একটি বিবৃতি দিয়েছে, যদিও তারা নতুন করে সীমান্ত উত্তেজনার বিষয়টি নিশ্চিত বা অস্বীকার কোনোটিই করেনি। বেইজিংয়ে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন বলেন, 'চীন-ভারত সীমান্ত পরিস্থিতি বর্তমানে সামগ্রিকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে।'

ভারতের তরফ থেকে উদ্বেগের সবচেয়ে স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া গেছে অরুণাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী পেমা খান্ডুর একটি বক্তব্যে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি জানান, রাজনাথ সিং 'এই বিষয়টি নিয়ে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন ও সক্রিয়' এবং আগামী দিনগুলোতে সেখানে 'নিশ্চিতভাবেই প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সহায়তা প্রদান করবেন।'

অরুণাচলের স্থানীয় জননেতা এবং আপার সুবনসিরির বাসিন্দা অজয় মুর্তেম বলেন, 'ভারত সরকার যদি তাকসিং, মাজা, গেলেমো এবং শ্রীচু উপত্যকায় চীনের বিস্তার এখনই বন্ধ না করে, তবে আপার সুবনসিরি জেলায় চীন ও ভারতের মধ্যে যুদ্ধের নতুন ফ্রন্ট তৈরি হবে।'

মুর্তেম জানান, তাগিন উপজাতি এবং তাদের উপদল নাহ সম্প্রদায় তাকসিং থেকে মাত্র এক ঘণ্টার দূরত্বে অবস্থিত পোত্রাং হ্রদে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালন করে আসছে। কিন্তু সাম্প্রতিক দিনগুলোতে চীনা সেনারা স্থানীয় আদিবাসীদের তাদের এই ঐতিহ্যবাহী পবিত্র বৌদ্ধ ধর্মীয় উপাসনালয়ে যেতে বাধা দিয়েছে।

তিনি বলেন, 'আমরা সবাই দেশপ্রেমিক। আন্তর্জাতিক সীমান্ত বরাবর বসবাসকারী মানুষগুলো কেবল কোনো দুর্গম গ্রামের বাসিন্দা নয়, সীমান্তে তারাই হলো দেশের চোখ ও কান।'

দিল্লির জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের চীন বিষয়ক অধ্যাপক শ্রীকান্ত কোন্ডাপল্লী বলেন, অরুণাচলে যা ঘটছে তা চীনের 'সালামি স্লাইসিং' কৌশলের অংশ। এই প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের কোনো আকস্মিক আগ্রাসনের বদলে দীর্ঘ সময় নিয়ে ধীরে ধীরে সামান্য ভূখণ্ড দখল ও তা মজবুত করা হয়।

কৌশলটি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, 'প্রথমে চীনারা কিছু চমরী গাই সীমান্তে ছেড়ে দেয় এবং ভারতীয় বাহিনীর প্রতিক্রিয়ার জন্য অপেক্ষা করে। যদি কয়েক মাস কোনো বাধা না পায়, তবে সেখানে তারা একটি ছোট চালাঘর তৈরি করে। পরে সেটিকে স্থায়ী রূপ দেয়—এবং কোনো প্রতিরোধ না দেখলে একপর্যায়ে সেখানে আস্ত সেনা ক্যাম্প গড়ে তোলে।' তিনি এই অঞ্চলকে একটি 'ধূসর এলাকা' বা গ্রে জোন হিসেবে অভিহিত করেন, কারণ অরুণাচল ও তিব্বতের মধ্যবর্তী ম্যাকমোহন লাইন আইনিভাবে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত নয়।

ভারত সরকার চীনের তথাকথিত 'শ্যাওকাং' বা সমৃদ্ধ সীমান্ত মডেল গ্রামগুলোর বিপরীতে নিজেদের 'ভাইব্রেন্ট ভিলেজ প্রোগ্রাম' চালু করার চেষ্টা করেছে। তবে কোন্ডাপল্লীর মতে, ভারতের এই কর্মসূচিটি 'সফল হতে পারেনি', কারণ এর জন্য 'বিশাল ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা দরকার ছিল।' তিনি বলেন, 'অন্যদিকে চীন লংজুতে প্রায় ১০০টি আধুনিক মডেল গ্রাম তৈরি করেছে এবং সেখান থেকে তারা অরুণাচলের ভারতের দাবি করা এলাকার দিকে বিস্তার শুরু করেছে।'

প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখায় (এলএসি) ভারতের নিয়মিত পৌঁছাতে না পারার অক্ষমতাই চীনকে এই সালামি স্লাইসিং কৌশল বাস্তবায়নের সুযোগ করে দিচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।

কোন্ডাপল্লী বলেন, 'যতক্ষণ না আপনি আপনার অবকাঠামো তৈরি করছেন এবং প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখায় নিজেদের অবস্থান সুসংহত করছেন, ততক্ষণ আপনার কোনো দরকষাকষির সুযোগ নেই। চীনারা মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখায় পৌঁছাতে পারে। তারা ১৯৮০-এর দশকেই সেখানে রাস্তা বানানো শুরু করেছিল। আর আমাদের ঘুম ভেঙেছে এই সেদিন।'

সীমান্ত সমস্যাটি ভারতের ঘরোয়া রাজনীতিতে অত্যন্ত আলোচিত একটি বিষয় এবং ব্রিকস সম্মেলনে শি ও মোদির মধ্যকার যেকোনো অগ্রগতির দিকে গভীরভাবে নজর রাখবে ভারতীয় জনগণ। তবে সংবাদমাধ্যমের সামনে দুই নেতার সরাসরি মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ হওয়ায় কোন্ডাপল্লী মনে করেন যে এই সফরে সীমান্ত বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশ কম। আগামী বছর ব্রিকসের আয়োজক হতে যাওয়া চীন এবং ভারত উভয়ই এবারের সম্মেলনকে একটি সফল বৈঠক হিসেবে তুলে ধরতে বেশি আগ্রহী।

সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড 

  • সর্বশেষ