শিরোনাম
◈ মার্কিন এফ-৩৫: আকাশের আধিপত্য নাকি প্রযুক্তিগত ত্রুটির বোঝা? ◈ জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের হামলা, ব‌্যাপক ক্ষয় ক্ষ‌তি ◈ আওয়ামী লীগে শেখ সেলিমকে নিয়ে আলোচনা কেন? ◈ ইন্টার মিলান‌কে হা‌রি‌য়ে চ্যাম্পিয়নস লিগে শুভ যাত্রা রিয়াল মা‌দ্রিদের ◈ পো‌র্তো‌কে হা‌রি‌য়ে চ্যাম্পিয়নস লিগে শুভ সূচনা ম্যানচেষ্টার সিটির ◈ জোটে ছাড় না পাওয়ার পর সিটি নির্বাচনে এনসিপির নতুন পরিকল্পনা ◈ লাখ লাখ টাকা বকেয়া, পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে বাবরদের প্রাক্তন কোচ গি‌লেস‌পি! ◈ দেশে সারের সংকট নেই, তবু হট্টগোল কেন? ◈ ভেনিসে বাঁধনকে হেনস্তা-হামলা, অভিযুক্তদের কয়েকজনের পরিচয় শনাক্ত ◈ মক্কা চুক্তিতে ইরান: রাশিয়ার প্রস্তাবে নতুন নিরাপত্তা সমীকরণ

প্রকাশিত : ০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:০৬ দুপুর
আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৩৮ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

মার্কিন এফ-৩৫: আকাশের আধিপত্য নাকি প্রযুক্তিগত ত্রুটির বোঝা?

যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান এফ-৩৫ নিয়ে বিশ্বজুড়ে তৈরি হওয়া জল্পনা-কল্পনা এবং সমালোচনার বিষয়টি সম্প্রতি এক চাঞ্চল্যকর বিশ্লেষণে নতুন করে উঠে এসেছে। সামরিক বিশেষজ্ঞ এবং মিলিটারি রাশিয়া প্রকল্পের প্রতিষ্ঠাতা ও লেখক দিমিত্রি কোর্নেভ এক বিশদ নিবন্ধে দাবি করেছেন, আধুনিক আকাশে আধিপত্য বিস্তারের জন্য তৈরি করা হলেও বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে ব্যয়বহুল এই সামরিক কর্মসূচিটি বহুবিধ প্রযুক্তিগত ত্রুটি, লাগামহীন খরচ এবং এর প্রকৃত যুদ্ধক্ষমতা নিয়ে একের পর এক অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখোমুখি হচ্ছে। ২০০-এরও বেশি ইউনিট ইতোমধ্যে তৈরি এবং ইরানসহ বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতময় এলাকায় মোতায়েন করা হলেও বিমানটির পঞ্চম প্রজন্মের সকল আদর্শ মান পূরণ নিয়ে গভীর সংশয় থেকে যাচ্ছে।

এফ-৩৫ বিমানের পারফরম্যান্স নিয়ে বিতর্ক নতুন কিছু নয়। ২০১৫ সালের জুনে মার্কিন এক টেস্ট পাইলটের একটি গোপনীয় রিপোর্ট অনলাইনে ফাঁস হয়ে যায়, যেখানে প্রকাশ পায় যে এক পরীক্ষামূলক ডগফাইটে চতুর্থ প্রজন্মের পুরনো এফ-১৬ডি বিমানের কাছে নতুন এফ-৩৫ পরাজিত হয়েছিল। উচ্চমাত্রার আক্রমণাত্মক মহড়ায় এটি এফ-১৬ডি বিমানের পেছনে যেতে ব্যর্থ হয় এবং বিমানের গতি ও পিচ রেটের দিক থেকেও পিছিয়ে পড়ে। তবে সেই সময় প্রচারমাধ্যমগুলো এই বিষয়টি এড়িয়ে যায় যে, পরীক্ষাটিতে ব্যবহৃত এফ-৩৫টি ছিল একটি পরীক্ষামূলক প্রোটোটাইপ, যাতে পূর্ণাঙ্গ সমরাস্ত্র পরিচালনার সফটওয়্যার ছিল না এবং এর অভিকর্ষীয় চাপ সহ্যসীমা ছিল মাত্র ৫.৫ জি, যেখানে এফ-১৬ বিমান ৯ জি পর্যন্ত সহ্য করতে পারে। পরবর্তীকালে ব্লক ৩এফ সফটওয়্যার চালিত উন্নত সংস্করণগুলো 'রেড ফ্ল্যাগ' মহড়ায় এফ-১৬ সহ অন্যান্য চতুর্থ প্রজন্মের বিমানকে বেশ দূর থেকেই হারিয়ে দেয়। তবে এই সাফল্য কোনো আকাশ মহড়ার কৌশলে আসেনি, বরং এসেছে এর দূরপাল্লার রাডার-অদৃশ্য বা স্টিলথ প্রযুক্তির বদৌলতে, যার ফলে বিমানটি প্রতিপক্ষের কাছাকাছি না গিয়েই আঘাত হানতে সক্ষম হয়।

আমেরিকান সামরিক কৌশলে পঞ্চম প্রজন্মের বিমানের প্রধান ভিত্তি হলো এই স্টিলথ ক্ষমতা। বিমানের বিশেষ নকশা এবং রাডার তরঙ্গ শোষণকারী প্রলেপের মাধ্যমে একটি অতি ক্ষুদ্র রাডার সংকেত তৈরি করা হয়, যার মাধ্যমে প্রতিপক্ষের নজর এড়িয়ে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করা সম্ভব হয়। এর পাশাপাশি এফ-৩৫ এর দ্বিতীয় সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এর নেটওয়ার্ক-কেন্দ্রিক যুদ্ধ পরিচালনা ক্ষমতা। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে বিমানটি কেবল তথ্য আদান-প্রদানই করে না, বরং অন্যান্য বিমান এবং ড্রোন বহরকে সরাসরি পরিচালনা করতে পারে। দৃশ্যত এই কথিত অদৃশ্য বিমানটি একা বা নিজের সহযোগীদের নিয়ে যেকোনো প্রতিপক্ষকে চিহ্নিত করে আক্রমণ পরিচালনা করার ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগতভাবে বেশ উপযুক্ত।

তবে বিমানটির অন্যান্য প্রযুক্তিগত দিকগুলো যথেষ্ট উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। একটি আদর্শ পঞ্চম প্রজন্মের বিমান আফটারবার্নার ব্যবহার না করেই একটানা সুপারসনিক বা শব্দের চেয়ে দ্রুত গতিতে উড়তে সক্ষম হওয়ার কথা। কাগজে-কলমে এফ-৩৫ এই শর্ত পূরণ করলেও বাস্তবে এর এফ-৩৫বি এবং এফ-৩৫সি সংস্করণ দুটি ম্যাক ১.২ গতির ওপরে বেশিক্ষণ উড়তে পারে না। দীর্ঘ সময় অতিরিক্ত গতিতে চললে এর লেজের অংশ এবং মূল্যবান স্টিলথ প্রলেপ তাপের কারণে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। একটি সুপারসনিক যুদ্ধবিমান হয়েও কিভাবে এটি দ্রুত গতি ধরে রাখতে পারে না; তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এমনকি এর প্রধান এফ-৩৫এ সংস্করণটিও একটানা সুপারসনিক গতি ধরে রাখতে হিমশিম খায়। উপরন্তু, বিমানটিতে ব্যবহৃত প্র্যাট অ্যান্ড হুইটনি এফ১৩৫ ইঞ্জিনের টারবাইন ব্লেড ক্ষয়, অতিরিক্ত গরম হয়ে যাওয়া এবং সময়মতো মেরামতের জন্য যন্ত্রাংশের চরম সংকটের বিষয়টি মিডিয়া ও পর্যবেক্ষকদের নজর কেড়েছে।

প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি এর আকাশচুম্বী খরচ পুরো কর্মসূচিকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এফ-৩৫ এর উন্নয়ন ও সার্বিক জীবনচক্রের মোট ব্যয় ইতোমধ্যে প্রায় দুই ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে এবং তা দিন দিন বেড়েই চলেছে, যা একে ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল সমরাস্ত্র কর্মসূচিতে পরিণত করেছে। একজন ব্যবহারকারীর জন্য এর প্রতি ঘণ্টার উড্ডয়ন খরচ দাঁড়িয়েছে ৩৫ হাজার থেকে ৪২ হাজার ডলারের মধ্যে, যেখানে একটি মানসম্মত এফ-১৬ বিমানের প্রতি ঘণ্টার খরচ পড়ে প্রায় ২২ হাজার ডলার। গণহারে উৎপাদিত কোনো যুদ্ধবিমানের জন্য এই পরিচালন ব্যয় অত্যন্ত আকাশচুম্বী।

অন্যান্য প্রতিযোগী বিমান, যেমন রাশিয়ার সু-৫৭ এর তুলনায় এফ-৩৫ ম্যানুভারেবিলিটি বা আকাশ কৌশলে অনেক পিছিয়ে। এটি সত্যি যে শত্রু যদি অদৃশ্য বিমানটির মাধ্যমে শুরুতেই দূর থেকে ধ্বংস হয়ে যায়, তবে আর সামনাসামনি ডগফাইটের প্রয়োজন নাও হতে পারে। কিন্তু কোনো কারণে যদি এটিকে সরাসরি আকাশে মুখোমুখি যুদ্ধে লিপ্ত হতে হয়, তবে অত্যন্ত চটপটে ও ক্ষিপ্রগতির অন্যান্য চতুর্থ বা পঞ্চম প্রজন্মের বিমানের বিরুদ্ধে এফ-৩৫ চরম বিপদের মুখোমুখি হবে।

সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এফ-৩৫ মূলত চালিত হয় অতি জটিল একটি সফটওয়্যার ব্যবস্থার মাধ্যমে, যা প্রায় ২৪ মিলিয়ন বা দুই কোটি ৪০ লাখ কোডিং লাইনের সমন্বয়ে গঠিত। পেন্টাগনের অডিটররা ইতোমধ্যে এটিতে ৮০০-এরও বেশি অমীমাংসিত ত্রুটি (বাগ) চিহ্নিত করেছেন। এত জটিল ও ত্রুটিপূর্ণ একটি সফটওয়্যার চালিত সামরিক ব্যবস্থা কতটুকু নিরাপদ এবং আধুনিক সমরে কতটুকু নির্ভরযোগ্য, তা নিয়ে গভীর প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।

এত ত্রুটি ও বিপুল পরিচালনা ব্যয় সত্ত্বেও কেন বিশ্বজুড়ে এই বিমানটিকে এত বিপুল পরিমাণে তৈরি করা হচ্ছে এবং ডজন ডজন দেশ তা লুফে নিচ্ছে; তা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠে এসেছে। বর্তমানে ১৩শ'টিরও বেশি বিমান তৈরি হয়ে গেছে এবং আরও প্রায় দুই হাজার বিমান তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। আগামী এক দশকে ২০টিরও বেশি দেশ এটি পরিচালনা করবে। এই আন্তর্জাতিক প্রবণতার পেছনে মূল কারণ বিমানের নিজস্ব প্রযুক্তিগত দক্ষতা নয় বরং মার্কিন কূটনীতি ও ভূ-রাজনীতি। এফ-৩৫ এখন কেবল একটি যুদ্ধবিমান নয়, এটি ওয়াশিংটনের সাথে কোনো দেশের সম্পর্কের গভীরতার প্রতীক।

যেসব দেশ এফ-৩৫ ক্রয় করছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বিশেষ কিছু কূটনৈতিক ও সামরিক সুবিধা পেয়ে থাকে। যেমন, ইসরায়েল এটি ক্রয়ের পর সামরিক অভিযানে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা এবং আমেরিকার অস্ত্র ভাণ্ডারে অবাধ প্রবেশাধিকার পেয়েছে। আবার জার্মানির ক্ষেত্রে এফ-৩৫ কেনার প্রধান কারণ হলো, এটিই একমাত্র বিমান যা ন্যাটোর পরমাণু বিনিময় কর্মসূচির আওতায় মার্কিন পারমাণবিক বোমা বহনের জন্য অনুমোদিত। 

অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান কিংবা তুরস্কের মতো দেশগুলো নিজেদের নিজস্ব পঞ্চম বা ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান প্রস্তুত করার আগ পর্যন্ত মধ্যবর্তী সময়ে এফ-৩৫ এর নেটওয়ার্ক-কেন্দ্রিক ক্ষমতা ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে। রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা এবং জরুরি প্রয়োজনীয়তার কারণেই দেশগুলো এর বিভিন্ন ত্রুটি ও ব্যাটল পেঙ্গুইন (এর স্থূল আকৃতির কারণে পাইলটদের দেয়া ডাকনাম) খেতাবকে উপেক্ষা করে ওয়াশিংটনের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রাসেলসের কঠোর অবস্থানের কারণে তারা অন্তত রাশিয়ার তৈরি সু-৫৭ বিমান কিনতে পারবে না; যদিও প্রযুক্তিগত দৃষ্টিকোণ থেকে তা হয়তো মোটেও খারাপ বিকল্প ছিল না।

সূত্র: আরটি, বাংলাদেশ প্রতিদিন

  • সর্বশেষ