ইরান সংকটের মধ্যে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়তেই রাশিয়ার তেল আমদানির ক্ষেত্রে ছাড় আরও বাড়ানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অনুরোধ করেছে ভারত। মার্কিন সংবাদমাধ্যমের বরাতে এই তথ্য সামনে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, পশ্চিম এশিয়ার চলমান সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় নিরবচ্ছিন্ন তেল সরবরাহ নিশ্চিত করতে চাইছে নয়াদিল্লি।
প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল আমদানির ক্ষেত্রে ওয়াশিংটন বর্তমানে যে ছাড় দিয়ে রেখেছে, তার মেয়াদ আরও বাড়ানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আবেদন করেছে ভারত। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করায় এবং জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় ভারত এই উদ্যোগ নিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র গত মার্চ মাসে প্রথম এই ছাড় অনুমোদন করেছিল। পরে তা বাড়িয়ে ১৬ মে পর্যন্ত কার্যকর করা হয়। এর ফলে ভারতীয় শোধনাগারগুলো ইতোমধ্যে জাহাজে তোলা রাশিয়ার তেলের চালান গ্রহণ করতে পারছে। মূলত এই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য ছিল আন্তর্জাতিক বাজারে অতিরিক্ত অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ বজায় রেখে দামের চাপ কিছুটা কমানো।
ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতীয় কর্মকর্তারা মার্কিন কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন, পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত কমার কোনো লক্ষণ না থাকায় নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদিও রাশিয়ার তেল রপ্তানির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা নেই, তবু ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে মস্কোর ওপর চাপ বাড়ানোর অংশ হিসেবে ভারতকে ধীরে ধীরে ছাড়কৃত মূল্যের রুশ তেল কেনা কমাতে চাপ দিয়ে আসছে ওয়াশিংটন।
এদিকে বর্তমান ছাড়ের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ভারতীয় শোধনাগারগুলো রাশিয়া থেকে তেল আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। পণ্যবাজার পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ক্লেপলারের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে ভারতে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল আমদানি রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। চলতি মাসে দৈনিক গড়ে ২০ লাখ ব্যারেলের বেশি তেল আমদানি হয়েছে।
তবে এই প্রতিবেদন নিয়ে ভারত বা যুক্তরাষ্ট্র সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও মন্তব্য করেনি।
এর আগে গত এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্র যখন ছাড়ের মেয়াদ বাড়িয়েছিল, তখন মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেছিলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বৈঠকের সময় সরাসরি অনুরোধের পরই এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তিনি সে সময় বলেন, ‘জ্বালানি সরবরাহের দিক থেকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও দরিদ্র ১০টির বেশি দেশ আমাদের কাছে এই নিষেধাজ্ঞার ছাড় বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছিল।’
তিনি আরও বলেন, সেই সময় বাড়ানো ছাড়ের মেয়াদ ছিল মাত্র ৩০ দিনের জন্য।
এদিকে এপ্রিলের শেষ দিকেও নিষেধাজ্ঞার চাপ ও উপসাগরীয় অঞ্চলে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার পরও ভারতের রুশ তেল আমদানি উচ্চ পর্যায়েই ছিল। তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ভারতীয় শোধনাগারগুলো রাশিয়ার তেল কেনা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। চলতি বছরের শুরুতেই রুশ তেলের চালান রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছে যায়।
এরপর মার্চ মাসে রাশিয়া থেকে ভারতের তেল আমদানি দৈনিক প্রায় ২২ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেলে পৌঁছায়, যা ফেব্রুয়ারির তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। এই সময়ে ভারতের মোট তেল আমদানির প্রায় অর্ধেকই ছিল রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল।
২০২২ সালের পর থেকে ভারত রাশিয়ার তেলের অন্যতম বড় ক্রেতায় পরিণত হয়েছে। বর্তমানে চীনের পর রুশ তেলের দ্বিতীয় বৃহত্তম আমদানিকারক দেশ ভারত। রাশিয়ার প্রধান ‘ইউরালস’ গ্রেডের তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতাও এখন ভারত। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মধ্যে মস্কোর জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ আয়ের উৎস হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।