গত ৫ মার্চ ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির এক্স হ্যান্ডেল থেকে একটি পোস্ট করা হয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলি বিমান হামলায় তিনি নিহত হওয়ার পর থেকে তার কার্যালয় এই অ্যাকাউন্টটি পরিচালনা করছে। সেই পোস্টে দেখা গেছে, একটি বিশালাকৃতির ক্ষেপণাস্ত্র আকাশ চিরে ধেয়ে আসছে, আর নিচের একটি শহর আগুনে জ্বলছে। ক্যাপশনে লেখা ছিল, ‘খোররামশাহর মুহূর্তগুলো দিগন্তে দেখা যাচ্ছে।’
ইরানের সবচেয়ে উন্নত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ‘খোররামশাহর’ এখন ইসরায়েলের জন্য এক মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ক্ষেপণাস্ত্রটি একটি ক্লাস্টার ওয়ারহেড বহন করতে সক্ষম, যা মাঝআকাশে ৮০টি পর্যন্ত ছোট বোমা বা সাবমিউনিশন ছড়িয়ে দিতে পারে। বিশ্বের অন্যতম অত্যাধুনিক ও বহুমুখী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও ইরান এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ইসরায়েলি সীমানায় আঘাত হানতে সক্ষম হচ্ছে।
গত রবিবারও ইরানের একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মধ্য ইসরায়েলে আঘাত হানে, যাতে অন্তত ১৫ জন আহত হন। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) তথ্যমতে, সংঘাত শুরুর পর থেকে ইরান যত ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে, তার প্রায় অর্ধেকই ছিল ক্লাস্টার ওয়ারহেডবাহী।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান-এর এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে অন্তত ১৯টি ক্লাস্টার ওয়ারহেডবাহী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েলি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে শহরাঞ্চলে আঘাত হেনেছে। এসব হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ৯ জন নিহত এবং কয়েক ডজন মানুষ আহত হয়েছেন। এই পরিসংখ্যান ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলোর পরামর্শক ও ক্ষেপণাস্ত্র বিশেষজ্ঞ তাল ইনবার বলেন, ক্লাস্টার মিউনিশন বা গুচ্ছ বোমা আটকানো সাধারণ ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন। এটি কার্যকরভাবে ঠেকাতে হলে বোমাগুলো ছড়িয়ে পড়ার আগেই মূল বাহক ক্ষেপণাস্ত্রটিকে ধ্বংস করতে হয়।
অস্ত্র বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্লাস্টার বোমাগুলো মাঝআকাশে কয়েক ডজন ছোট বোমা ছেড়ে দেয়। একবার এই ছোট বোমাগুলো ছড়িয়ে পড়লে সেগুলোকে আটকানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এমনকি মূল ক্ষেপণাস্ত্রটি ধ্বংস করলেও অনেক সময় সাবমিউনিশনগুলো পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় হয় না। এছাড়া এই ছোট বোমাগুলো তৎক্ষণাৎ না ফেটে দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকি তৈরি করে, যা পরে বেসামরিক নাগরিকদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
ইরানের এই কৌশলের পেছনে একটি বড় লক্ষ্য হলো ইসরায়েলের ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ শেষ করে দেওয়া। একটি মাত্র ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা অসংখ্য ছোট বোমা ধ্বংস করতে ইসরায়েলকে অনেকগুলো দামী ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র খরচ করতে হচ্ছে।
তাল ইনবার বিষয়টিকে একটি অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা হিসেবেও দেখছেন। তার মতে, প্রতিটি ছোট বোমার পেছনে অত্যন্ত ব্যয়বহুল ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করা কোনোভাবেই সাশ্রয়ী নয়। যদিও ইসরায়েলের মজুদের প্রকৃত তথ্য গোপন রাখা হয়েছে, তবে বিশেষজ্ঞদের ধারণা, তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ ক্রমেই চাপের মুখে পড়ছে।
ক্লাস্টার বোমা জনবহুল এলাকায় ব্যবহার করা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের লঙ্ঘন। ২০০৮ সালের কনভেনশন অন ক্লাস্টার মিউনিশনস অনুযায়ী এই বোমার ব্যবহার নিষিদ্ধ হলেও ইরান বা ইসরায়েল কেউই এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ইরানের ক্লাস্টার বোমা ব্যবহারের তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে আন্তর্জাতিক আইনের ‘চরম লঙ্ঘন’ বলে অভিহিত করেছে। একইসঙ্গে ২০০৬ সালে লেবাননে ইসরায়েলের ক্লাস্টার বোমা ব্যবহারেরও সমালোচনা করেছে তারা।
ইসরায়েল জনবহুল এলাকায় ইরানের এই হামলাকে ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। যদিও তারা নিজেরা অতীতে এই অস্ত্র ব্যবহারের কথা স্বীকার করেছে, তবে দাবি করেছে যে তা আন্তর্জাতিক আইন মেনেই করা হয়েছিল।