জানুয়ারি থেকে ইরানকে ঘিরে বাড়তে থাকা উত্তেজনার মধ্যে এ মাসের শুরুর দিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ঘাঁটি কাতারের আল-উদেইদে মার্কিন বাহিনীর ট্রাক-লঞ্চারে ক্ষেপণাস্ত্র বসিয়েছিল বলে উপগ্রহের ছবিতে উঠে এসেছে।
আধা-স্থায়ী উৎক্ষেপক কেন্দ্রের বদলে সহজে পরিবহনযোগ্য ট্রাকে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের ফলে একদিকে হামলার সময় ক্ষেপণাস্ত্রগুলো দ্রুত ব্যবহার করা যাবে, আবার ইরানের পাল্টা হামলার সময় চাইলে তড়িঘড়ি সরিয়েও নেওয়া যাবে।
তেহরান-ওয়াশিংটন উত্তেজনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধের ঝুঁকিও যে কতখানি বেড়েছে, ট্রাক-লঞ্চারে ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের এই সিদ্ধান্তেই তা বোঝা যাচ্ছে, বলছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
দেশের ভেতরকার ভিন্নমত দমনে ইরানি শাসকগোষ্ঠীর ব্যাপক দমনপীড়ন এবং তেহরানের পরমাণু ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইসরায়েলবিরোধী বিভিন্ন গোষ্ঠীকে সহায়তার কারণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এরই মধ্যে ইরানে বোমা হামলার হুমকি দিয়েছেন। যুদ্ধ এড়াতে দুই পক্ষের মধ্যে এখন আলোচনাও চলছে।
কেবল কাতারেই নয়, ইরাক, জর্ডান, কুয়েত, সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, তুরস্ক এমনকি ভারত মহাসাগরের দিয়েগো গার্সিয়াতেও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। এসব ঘাঁটিকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন বাহিনীর তৎপরতা বেড়েছে।
ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, তাদের ভূখণ্ডে কোনো ধরনের হামলা হলে তারা আশপাশের যে কোনো মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালাবে।
জানুয়ারির তুলনায় ফেব্রুয়ারির প্রথম দিককার উপগ্রহের ছবিগুলোতে পুরো অঞ্চলজুড়ে মার্কিন বিমান ও অন্যান্য সমরাস্ত্রের বাড়তি উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন কনটেস্টেড গ্রাউন্ডের উপগ্রহ চিত্র বিশ্লেষক উইলিয়াম গুডহিন্ড।
ফেব্রুয়ারির শুরুতে আল-উদেইদ ঘাঁটিতে এম৯৮৩ হেভি এক্সপান্ডেড মোবিলিটি ট্যাকটিকাল ট্রাকে (এইচইএমটিটি) প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র দেখা গেছে, বলেছেন তিনি।
“এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যেন প্যাট্রিয়ট সহজে স্থানান্তর করা যায়, অর্থ্যাৎ সেগুলোকে বিকল্প কোনো স্থানে নিয়ে যাওয়া যাবে বা দ্রুত মোতায়েন করা যাবে,” বলেছেন তিনি।
তবে মঙ্গলবারও ক্ষেপণাস্ত্রগুলো এইচইএমটিটি-তেই আছে কিনা তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এ প্রসঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে পেন্টাগনের কোনো মুখপাত্রের মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
ইরান বলছে, তাদের কাছে এখন যথেষ্ট পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র আছে। গত বছর ইসরায়েলের সঙ্গে প্রায় দুই সপ্তাহের যুদ্ধে যা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল তাও পূরণ করে ফেলেছে তারা।
সেবার ইসরায়েলে ইরানের একাধিক পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালিয়েছিল, কয়েক ডজন সামরিক কর্মকর্তা ও পরমাণু বিজ্ঞানীকে হত্যাও করেছিল। যুদ্ধের একেবারে শেষদিকে যুক্তরাষ্ট্রও ইসরায়েলের পক্ষ হয়ে ইরানি পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র মেরেছিল।
তেহরানের কাছে বেশ কয়েকটি ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা রয়েছে ইরানের। কেরমানশাহ, সেমনান এবং উপসাগরীয় উপকূলগুলোর কাছেও তাদের বেশ কয়েকটি সংবেদনশীল ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা আছে।
গত ২৭ জানুয়ারির উপগ্রহ চিত্রে ইরানের নৌবাহিনীর ড্রোনবাহী রণতরী আইআরআইএস শহীদ বাঘেরিকে বন্দর আব্বাস থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে সমুদ্রে দেখা গেছে। ১০ ফেব্রুয়ারির দিকেও এটি বন্দর আব্বাসের কাছেই দৃশ্যমান ছিল।
আল-উদেইদ, কাতার
১ ফেব্রুয়ারির উপগ্রহের ছবিতে এ ঘাঁটিতে মার্কিন বাহিনীর একটি আরসি-১৩৫ নজরদারি বিমান, তিনটি সি-১৩০ হারকিউলিস বিমান, ১৮টি কেসি১৩৫ স্ট্র্যাটোট্যাংকার্স ও ৭টি সি-১৭ দেখা গেছে।
এইচইএমটিটিগুলোতে রাখা ছিল ১০টির মতো এমআইএম-১০৪ প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র।
মুওয়াফফাক, জর্ডান
২ ফেব্রুয়ারির ছবিতে মুওয়াফফাকের এক স্থানে ১৭টি এফ-১৫ই আক্রমণকারী বিমান, ৮টি এ-১০ থান্ডারবোল্ড বিমান, চারটি সি-১৩০ ও চারটি অজ্ঞাত হেলিকপ্টার দেখা গেছে। ১৬ জানুয়ারি একই স্থানের যেসব ছবি পাওয়া গেছে সেগুলোর রেজ্যুলেশন কম হওয়ায় সেখানে থাকা সব বিমানকে চিহ্নিত করা যায়নি।
ফেব্রুয়ারির ২ তারিখে মুওয়াফফাকের আরেকটি জায়গায় একটি সি-১৭ ও একটি সি-১৩০র সঙ্গে চারটি ইএ-১৮জি বিমান দেখা গেছে। অথচ ২৫ জানুয়ারি একই জায়গার ছবিতে কোনো বিমানই ছিল না।
অন্যান্য মার্কিন ঘাঁটি
সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান ঘাঁটির ২ ফেব্রুয়ারির ছবিতে সেখানে একটি সি-৫ গ্যালাক্সি ও একটি সি-১৭ বিমান দেখা গেছে। ওই ঘাঁটির ৬ ডিসেম্বরের ছবিতে সেখানে ৫টি বিমান ছিল বলে দেখা যাচ্ছে, যেগুলো সি-১৩০ হতে পারে বলে বিশ্লেষকদের অনুমান।
ভারত মহাসাগারের দিয়েগো গার্সিয়াতে ৩১ জানুয়ারি যত বিমান দেখা গেছে ৬ ফেব্রুয়ারি তার চেয়ে অন্তত ৭টি বিমান বেশি ছিল বলে উপগ্রহের ছবিতে ধরা পড়েছে।
২৫ জানুয়ারি ও ১০ ফেব্রুয়ারির তোলা ছবিতে ওমানের দুখান ঘাঁটিতেও বিমানের সংখ্যা বাড়ছে বলে দেখা যাচ্ছে।
সূত্র: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম