ভারতীয় গণমাধ্যম ইকোনমিক টাইমস-এর এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তিতে একটি বিশেষ ধারা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর আওতায় নির্দিষ্ট পরিমাণ বাংলাদেশি পোশাক ও বস্ত্র কোনো শুল্ক ছাড়াই মার্কিন বাজারে প্রবেশ করতে পারবে। মূলত যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ও সিনথেটিক ফাইবার ব্যবহারের শর্তে এই কোটা সুবিধা পেতে যাচ্ছে ঢাকা।
বিশ্বের বৃহত্তম বাণিজ্যিক শক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের জন্য ‘শূন্য শুল্ক’ সুবিধার খবরে ভারতীয় টেক্সটাইল ও পোশাক শিল্পে ব্যাপক অস্থিরতা ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। দক্ষিণ এশীয় এই দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার দখলের যে লড়াই চলছে, তাতে বাংলাদেশের এই নতুন সুবিধা ভারতকে বড় ধরনের প্রতিযোগিতার মুখে ঠেলে দিয়েছে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
এই খবর চাউর হওয়ার পরপরই ভারতের প্রধান প্রধান টেক্সটাইল কোম্পানিগুলোর শেয়ারে বড় ধরনের দরপতন লক্ষ্য করা গেছে। গোকালদাস এক্সপোর্টস, কেপিআর মিল, অরবিন্দ এবং পার্ল গ্লোবাল ইন্ডাস্ট্রিজের মতো নামি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম এক দিনেই ৫ শতাংশের বেশি কমে গেছে। বিনিয়োগকারীদের আশঙ্কা, মার্কিন বাজারে ভারত যে আধিপত্য বিস্তারের স্বপ্ন দেখছিল, বাংলাদেশের এই ‘শূন্য শুল্ক’ সুবিধা তাতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
উল্লেখ্য যে, গত সপ্তাহে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য কাঠামোর আওতায় ভারতীয় বস্ত্রপণ্যের ওপর ১৮ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছিল। তখন ভারত আশা করেছিল, এই চুক্তির ফলে চীন (৩০%) ও ভিয়েতনামের চেয়ে তারা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা পূরণ সহজ হবে। বিশেষ করে তামিলনাড়ুর তিরুপুর অঞ্চলের রপ্তানিকারকরা দ্বিগুণ আয়ের স্বপ্ন দেখছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন সমঝোতা ভারতের সেই স্বস্তিতে পানি ঢেলে দিয়েছে।
তবে ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের একাংশ মনে করছেন, এই আতঙ্ক হয়তো কিছুটা ‘অতিরঞ্জিত’। তাদের যুক্তি, বাংলাদেশ ঠিক কতটুকু পণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধায় পাঠাতে পারবে বা কোন কোন ক্যাটাগরি এই সুবিধার আওতায় আসবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তাছাড়া, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শুল্কের হার ১৯ শতাংশ—যা ভারতের ১৮ শতাংশের চেয়ে সামান্য বেশি। শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কোটার ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ শূন্য শুল্ক সুবিধা পাবে।
মার্কিন বাজারে কোণঠাসা হলেও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে বড় সাফল্য পেয়েছে ভারত। সম্প্রতি ইইউ-ভারত বাণিজ্য চুক্তির ফলে ভারত ইউরোপের বাজারে সরাসরি শূন্য শুল্ক সুবিধা পেতে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) হিসেবে ইউরোপে যে একচ্ছত্র সুবিধা ভোগ করে আসছিল, এখন সেখানে ভারতকে সরাসরি মোকাবিলা করতে হবে।
সব মিলিয়ে বিশ্ব পোশাক রপ্তানির মানচিত্রে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে এক স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই ‘জিরো ট্যারিফ’ কার্ড বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য যেমন বড় আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিয়েছে, তেমনি ভারতের জন্য তৈরি করেছে নতুন চ্যালেঞ্জ। এখন দেখার বিষয়, ওয়াশিংটনের এই নতুন বাণিজ্যিক সমীকরণ দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর ভবিষ্যৎ কোন দিকে নিয়ে যায়।