মুসলিম পর্যটকদের প্রতি লক্ষ রেখে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ হালাল পর্যটনের প্রতি মনোযোগ বাড়িয়েছে। তারা হালাল খাবার, মুসলিমবান্ধব হোটেল, নামাজের স্থানসহ বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে। নিম্নে এশিয়ার অমুসলিম দেশের ১০ মুসলিমবান্ধব পর্যটন শহরের বর্ণনা দেওয়া হলো—
১. কোবে, জাপান : কোবে জাপানের তুলনামূলক কম পরিচিত শহর। কিন্তু জাপানে ইসলাম প্রচারের ইতিহাসে এই শহরের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কেননা এখানেই জাপানের প্রথম মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়। কোবে একটি বন্দরনগরী হলেও তা তুলনামূলক কোলাহলমুক্ত। এখানে মুসলিমবান্ধব একাধিক আবাসিক হোটেল আছে, নামাজের স্থান ও হালাল বিনোদনের ব্যবস্থা আছে। হালাল খাবারও এখানে তুলনামূলক সহজলভ্য।
২. বুসান, দক্ষিণ কোরিয়া : বুসান দক্ষিণ কোরিয়ার একটি উপকূলীয় শহর। আল ফাতাহ বুসানের সবচেয়ে পরিচিত মসজিদ, যা একই সঙ্গে একটি মুসলিম সাজামিক কেন্দ্রও বটে। এখানে আরো আছে উজবেক ও ইন্দোনেশিয়ান মুসলিম হোটেল এবং মুসলিমবান্ধব কোরিয়ান রেস্টুরেন্ট। বুসানের বিখ্যাত মাছ বাজার জাগালছিতেও হালাল প্রক্রিয়ায় মাছের স্বাদ নেওয়ার সুযোগ আছে।
৩. কাওশিউং, তাইওয়ান : তাইওয়ান সরকার কাওশিউংকে একটি মুসলিমবান্ধব শহর হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। ফলে এখানের শপিং মল ও মার্কেটগুলোতে সহজেই হালাল খাবার পাওয়া যায়। কাওশিউংয়ে কিছু নিরামিষ রেস্টুরেন্ট আছে যেগুলো অ্যালকোহল এড়িয়ে চলে, মুসলিম পর্যটকদের জন্য খুবই স্বস্তির বিষয়। শহরের কেন্দ্রস্থল থেকে ১৫ মিনিটের দূরত্বে রয়েছে আড়ম্বরপূর্ণ কাওশিউং মসজিদ। এখানে একজন মুসলমান চাইলে খুব সহজে হালাল উপায়ে সাধারণ খাবার ও সি-ফুড খেতে পারবে; কেনাকাটা করতে পারবে।
৪. চেংদু, চীন : চেংদু শহর পান্ডার জন্য সারা পৃথিবীতে বিখ্যাত। এটা হুই মুসলিমদের ঐতিহাসিক শহরও বটে। এখানে আছে ষোড়শ শতকে নির্মিত চীনের ঐতিহাসিক হুয়াংচেং মসজিদ। চীনের বড় শহরগুলোর তুলনায় এই শহরে ভ্রমণব্যয় কম। চেংদু শহরের তাইনফু এলাকায় রয়েছে একাধিক হালাল রেস্টুরেন্ট। এসব খাবারের মধ্যে আছে ঐতিহ্যবাহী সিচুয়ান খাবার। এই শহরের ল্যাংজহু লামিয়ান নুডলস সর্বদা হালালভাবে প্রস্তুত করা হয়। চেংদু শহরে নামাজের স্থান ও মুসলিমবান্ধব হোটেল সহজলভ্য। এই শহরে হালাল রেস্টুরেন্ট বোঝাতে সবুজ নির্দেশক ব্যবহার করা হয়।
৫. ম্যানিলা, ফিলিপিনস : ফিলিপিনসের রাজধানী শহর ম্যানিলা একটি মধ্যমানের মুসলিমবান্ধব শহর। ঐতিহাসিক ইন্ট্রামুরস শহর থেকে একজন মুসলিম তার যাত্রা শুরু করতে পারে। এর থেকে সামান্য দূরে রয়েছে কোয়াপো জেলা। জেলাটি মুসলিম অধ্যুষিত এবং এখানেই আছে ঐতিহাসিক সোনালি গম্বুজ মসজিদ। এখানে হালাল খাবার, নামাজের স্থান ও মুসলিমবান্ধব হোটেল সহজলভ্য। কোয়াপো জেলার ‘স্ট্রিট ফুড’ খোলা খাবারগুলো হালাল হয়ে থাকে। ম্যানিলার ইরমিতা শহরেও বিপুলসংখ্যক হালাল রেস্টুরেন্ট ও হোটেল আছে।
৬. সিয়েম রিপ, কম্বোডিয়া : কম্বোডিয়ার সিয়েম রিপ একটি মুসলিম ঐতিহ্যবাহী শহর। এখানে একাধিক মুসলিম ঐতিহ্যের দেখা মেলে। এখানে স্থানীয় চেম মুসলিমরা বসবাস করে। এখানে নেক মাহ মসজিদ অবস্থিত। সিয়েম রিপে হালাল খাবার, নামাজের স্থান ও মুসলিমবান্ধব হোটেল পাওয়া যায়। স্থানীয় মুসলিমরা পর্যটক মুসলিমদের ঘরোয়া খাবার ও থাকার ব্যবস্থা করে। এ ছাড়া তাদের সহযোগিতা করতে মুসলিম ড্রাইভাররা আছে।
৭. হায়দরাবাদ, ভারত : ভারতের পথে-প্রান্তরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে হাজারো মুসলিম ঐতিহ্য ও নিদর্শন। মুসলিম শাসনের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হায়দরাবাদ। এখানে শুধু মুসলিমবান্ধব খাবার ও পরিবেশ নয়, বরং এখানে অসংখ্য মুসলিম স্থাপত্য, প্রত্নতত্ত্ব ও নিদর্শন দেখে নিজেকে তৃপ্ত করতে পারবে মুসলিম পর্যটকরা। হায়দরাবাদের বিরিয়ানি ও হালিম ঐতিহ্যবাহী মুসলিম খাবার হিসেবে সুপরিচিত। যার মধ্যে আছে চার মিনার, পুরাতন মুসলিম শহর, মক্কা মসজিদ, কুতুবশাহি আমলের গোলকুণ্ডা দুর্গ, আতরের জন্য বিখ্যাত লাদ বাজার।
৮. গালে, শ্রীলঙ্কা : শ্রীলঙ্কার গালে শহর ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত। এটি শ্রীলঙ্কার মুসলিমবান্ধব পর্যটন শহর। গালের বিখ্যাত পর্তুগিজ দুর্গের আশপাশে বিপুলসংখ্যক মুসলিম পরিবার বসবাস করে। এসব মুসলিমরা আরব ও মুর ব্যবসায়ীদের বংশধর, যারা ব্যবসার জন্য মধ্যপ্রাচ্য ও আরব অঞ্চল থেকে এখানে এসেছিল। এখানে হালাল খাবার ও মুসলিমবান্ধব হোটেল রয়েছে। প্রাচীন মিরা মসজিদ গালের গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন।
৯. হুয়া হিন, থাইল্যান্ড : হুয়া হিন থাই রাজপরিবারের প্রিয় অবকাশ কেন্দ্রগুলোর একটি। পাতায়ার বিপরীতে হুয়া হিন মুসলমানদের জন্য বিকল্প নিরিবিলি একটি সমুদ্রসৈকত। হুয়া হিন রেলস্টেশেনের কাছে একটি ঐতিহ্যবাহী মুসলিম এলাকা রয়েছে। মূলত রেলওয়ের মুসলিম কর্মীদের মাধ্যমে তা গড়ে উঠেছে। এখানে রেলওয়ে মসজিদ নামে একটি মসজিদ আছে। এর কাছাকাছি এলাকায় আছে নুরুল ইহসান নামে আরেকটি মসজিদ। হুয়া হিনের পর্যটন পরিবেশে মুসলিমরা পরিবার নিয়ে চলাফেরা করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। শহরের হালাল হোটেলগুলোতে অর্ধচন্দ্র ও তারকাচিহ্ন থাকে।
১০. কাঠমাণ্ডু, নেপাল : হিমালয়কন্যা নেপাল পর্যটকদের প্রিয় স্থান। নেপালের রাজধানী কাঠমাণ্ডু একটি মধ্যমানের মুসলিমবান্ধব পর্যটন শহর। কাশ্মীরি মুসলিম শত শত বছর ধরে নেপালে ব্যবসা করে আসছে। শহরের দক্ষিণে অবস্থিত থামেল এলাকায় তারা বেশির ভাগ বসবাস করে থাকে। এখানে ঐতিহাসিক কাশ্মীরি মসজিদ ও জামে মসজিদ অবস্থিত। থামেল এলাকায় শহরের অন্য এলাকার তুলনায় হালাল খাবার বেশি সহজলভ্য। কাঠমাণ্ডুতে স্বল্প দূরত্বে মসজিদেরও দেখা মেলে।
এশিয়াওয়ান ডটকম অবলম্বনে