মহসিন কবির: আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণের অনুরোধ পুনর্ব্যক্ত করেছে ঢাকা।
বুধবার (৮ এপ্রিল) নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর এবং পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাসমন্ত্রী হরদীপ সিং পুরির সঙ্গে বৈঠক করেন। পাশাপাশি তিনি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গেও পৃথক আলোচনা করেন বলে ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে জানানো হয়।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবীর এবং ভারতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার এম রিয়াজ হামিদুল্লাহ উপস্থিত ছিলেন। আলোচনায় উভয়পক্ষ বিভিন্ন খাতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করে এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে মতবিনিময় করে।
ড. খলিলুর রহমান বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনিপির নবনির্বাচিত সরকার, ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির ভিত্তিতে পারস্পরিক আস্থা, সম্মান ও পারস্পরিক লাভের ওপর নির্ভর করে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করবে।
তিনি শহীদ ওসমান হাদির সন্দেহভাজন হত্যাকারীদের গ্রেফতারের জন্য ভারত সরকারকে ধন্যবাদ জানান এবং বলেন, প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী গ্রেফতার ব্যক্তিদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে উভয়পক্ষ একমত হয়েছে।
ভারতীয় পক্ষ জানায়, বিশেষ করে চিকিৎসা ও ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে বাংলাদেশিদের জন্য ভিসাসেবা আগামী সপ্তাহগুলোতে সহজ করা হবে। ড. খলিলুর রহমান ভারতের সাম্প্রতিক ডিজেল সরবরাহের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং বাংলাদেশে ডিজেল ও সার রপ্তানির পরিমাণ বাড়ানোর অনুরোধ জানান।
মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরি বলেন, ভারত সরকার বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে। উভয়পক্ষ গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় ইস্যুতে আলোচনা অব্যাহত রাখার মাধ্যমে সহযোগিতা আরও জোরদারের বিষয়ে একমত হয়।
প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির সভাপতি নিতিন নবীনের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। দিল্লি সফররত প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হুমায়ুন কবির চিঠিটি গতকাল (৭ এপ্রিল) রাতে বিজেপির আন্তর্জাতিক শাখার প্রধান বিজয় চোথাউওয়ালের কাছে হস্তান্তর করেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছিল। এরপর থেকে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি হয়। দুই দেশই একে অপরের বিরুদ্ধে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এরপর চলতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে নির্বাচনের পর বাংলাদেশে নতুন সরকার গঠনের পর দুই পক্ষ থেকেই সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা দেখা যাচ্ছে।
৭ এপ্রিল পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান দিল্লি সফরে গেছেন। তার সফরসঙ্গী হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। এই সফরের প্রাক্কালে রোববার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার প্রনয় ভার্মা। শুধু তাই নয়, ভারতে দুই দিনের সফর শেষে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে একই বিমানে চেপে মরিশাসে যাবেন ড. খলিলুর রহমান।
ঢাকা-দিল্লির সম্পর্ক প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও সাবেক রাষ্ট্রদূত মো. শফিউল্লাহ বলেন, ‘দুই দেশের সম্পর্কে যে বরফ গলতে শুরু করেছে, সেক্ষেত্রে ভারতই এগিয়ে এসেছে। তারা বাংলাদেশের বাস্তব পরিস্থিতি বুঝতে পেরেছে।’
শফিউল্লাহ বলেন, ‘দুই দেশের সম্পর্কে যে বরফ গলতে শুরু করেছে, সেক্ষেত্রে ভারতই এগিয়ে এসেছে। তারা বাংলাদেশের বাস্তব পরিস্থিতি বুঝতে পেরেছে। এই কারণে যখন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া অসুস্থ ছিলেন, তারা চিকিৎসার ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছিল। খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর জানাজাতে মোদির শোকবার্তা নিয়ে এসেছিলেন তাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এরপর তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা।
এরপর ভারতের পার্লামেন্টের বাজেট অধিবেশনের প্রথম দিনেই বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার স্মরণে শোকপ্রস্তাব বা ‘অবিচুয়ারি রেফারেন্স’ গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ভারতের পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভা ও নিম্নকক্ষ লোকসভা, উভয়কক্ষেই এই শোকপ্রস্তাব আনা হয়। এগুলো কিন্তু ইতিবাচক সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়। ভারতের বর্তমান সরকার যে বিএনপি সরকারের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী, এই পদক্ষেপগুলোতে সেই বার্তাই দেয়।’
গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার গঠনের পর যে বিধিনিষেধ বাংলাদেশ আরোপ করেছিল তা তুলে নিতে শুরু করেছে। যদিও এখনও কিছু বিধিনিষেধ রয়েছে। আলোচনার ভিত্তিতে এগুলোও বাংলাদেশ তুলে নেবে বলে মনে করেন শফিউল্লাহ।
ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার হয়ে আসছেন আরিফ মোহাম্মদ খান। এই ঘটনা শুধু বাংলাদেশে নয়, ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে একটি বিরল ঘটনা। এমনকি বিশ্বেও এমন দৃষ্টান্ত একেবারেই সামান্য।
ঢাকায় বর্তমান হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাকে বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে পাঠানোর জোরালো সম্ভাবনার মাঝে তার উত্তরসূরি হিসেবে এই নামটি সবচাইতে বেশি আলোচিত হচ্ছে, তিনি কোনো পেশাদার আমলা বা কূটনীতিক নন; বরং ভারতের রাজনীতির এক মহীরুহ। যদি এই জল্পনা সত্যি হয়, তবে এটি কেবল বাংলাদেশ নয়, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হবে।
ভারত সাধারণত প্রতিবেশী দেশগুলোতে অভিজ্ঞ আইএফএস কর্মকর্তাদের পাঠায়। কিন্তু এবার সেই প্রথা ভাঙতে পারে দিল্লি। বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের বর্তমান জটিলতায় একজন সাধারণ কূটনীতিকের চেয়ে একজন রাজনীতিক বেশি কার্যকর বলে মনে করছে ভারত। আরিফ মোহাম্মদ খান একসময় কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও রাজ্যপাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাকে হাইকমিশনার করে পাঠানোর অর্থ-বাংলাদেশকে দিল্লি কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে, তার বার্তা।
কারণ, আরিফ মোহাম্মদ খান ৪০ বছর আগে ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিপরিষদের সদস্য ছিলেন। আরিফ মোহাম্মদ খান ভারতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ এক খেলোয়াড়। রাজনীতিতে প্রবেশ করেন ছাত্র থাকার সময়ে। কংগ্রেসসহ একাধিক সরকারের মন্ত্রী হয়েছেন। সবশেষ তিনি যোগ দিয়েছেন বিজেপিতে। বর্তমানে বিহারের গভর্নর।
তিনি যদি আসেন, তবে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে ঠিকই, কিন্তু আঞ্চলিক রাজনীতিতে দিল্লির প্রভাব কতটা বাড়বে, আর বাংলাদেশ নিজের স্বকীয়তা কতটা ধরে রাখতে পারবে-সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। আরিফ খান কি ঢাকার ‘বন্ধু’ না হয়ে আসছেন দিল্লির ‘চাণক্য’ হয়ে-তা সময়ই বলে দেবে।