পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এখন ভারতে অবস্থান করছেন। গত বুধবার তিনি নয়াদিল্লির হায়দ্রাবাদ হাউজে ভারতের পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস-বিষয়ক মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরির সঙ্গেও বৈঠক করেন। আগে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তিনি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সাথে বৈঠক করেন। বৈঠকগুলোতে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র-বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির ও ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহ উপস্থিত ছিলেন।
আলোচনায় উভয় পক্ষ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এগিয়ে নেয়ার গুরুত্বের ওপর জোর দেয় এবং প্রধান আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ইস্যুগুলো নিয়ে আলোচনা করে। বিশেষ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ভারতকে ডিজেল সরবরাহের জন্য মন্ত্রী হরদীপ পুরিকে ধন্যবাদ জানান এবং ডিজেল ও সার সরবরাহের পরিমাণ বাড়ানোর অনুরোধ জানান। মন্ত্রী হরদীপ জানিয়েছেন, ভারত সরকার এই অনুরোধটি গুরুত্বের সঙ্গে ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে।
প্রশ্ন হলো সার সরবরাহের জন্য ভারতকে অনুরোধ করতে হবে কেন? কারণ ভারতের সার সঙ্কট ২৫ লাখ টন। এই সঙ্কট সারা বছর লেগেই থাকে। গত ১৪ মার্চ ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালীতে চলমান উত্তেজনার কারণে সার সরবরাহে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়ায় চীন থেকে ইউরিয়া আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে ভারত। তাহলে বাংলাদেশ কেন চীনকে পাশ কাটিয়ে ভারতের কাছে সার সরবরাহের অনুরোধ করবে?
ভারতীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালীতে নিরাপত্তা ঝুঁকি ও জাহাজ চলাচলে বাধার আশঙ্কায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে সার আমদানিতে সমস্যা তৈরি হতে পারে। এ পরিস্থিতিতে বিকল্প উৎস হিসেবে চীনের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছে নয়াদিল্লি। যেখানে ভারত সার সঙ্কট মোকাবিলায় চীন থেকে সার আমদানি করতে যোগাযোগ বাড়াতে চায়। তাহলে ভারত কিভাবে বাংলাদেশের সার সঙ্কট মোকাবিলায় সহায়তা করবে।
বুধবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র-বিষয়ক ভারতের পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস-বিষয়ক মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরির সাথে আলোচনায় বাংলাদেশকে সার আমদানিতে বিবেচনায় নেবে বলে জানায়। একই দিন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আলাদা এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, জয়শঙ্কর বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে কাজ করার ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরো জোরদার করার বিষয়ে ভারতের আগ্রহের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। এছাড়া, উভয় পক্ষ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিষয়গুলো নিয়ে মতবিনিময় করে। এ আলোচনায় ভারত বাংলাদেশের ওসমান হাদি হত্যার খুনিদেরকে ফেরত দিতে সম্মতির পাশাপাশি জ্বালানি তেল ও আমদানির ব্যাপারে সম্মতি জ্ঞাপন করেছে বলে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়। সার সরবরাহের বিষয়েও তারা একই আশ্বাস দিয়েছে।
এদিকে গত ১৪ মার্চ এক প্রতিবেদনে বলা হয়Ñ মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালীতে চলমান উত্তেজনার কারণে সার সরবরাহে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়ায় চীন থেকে ইউরিয়া আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে ভারত।
ভারতীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়ে, হরমুজ প্রণালীতে নিরাপত্তা ঝুঁকি ও জাহাজ চলাচলে বাধার আশঙ্কায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে সার আমদানিতে সমস্যা তৈরি হতে পারে। এ পরিস্থিতিতে বিকল্প উৎস হিসেবে চীনের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছে নয়াদিল্লি। অথচ বাংলাদেশের পরীক্ষিত বন্ধু চীনের কাছে সার আমদানি করার জন্য অনুরোধ তো দূরের কথাÑ কোনো আগ্রহই দেখায়নি বাংলাদেশ। বুধবারে দুই দেশের উচ্চ পর্যায়ে বৈঠকের পর এটি স্পষ্ট হয়েছে যে, চীন যেখানে বাংলাদেশকে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় নিজ থেকে জ্বালানি তেল দেয়ার আগ্রহের কথা জানায়, সেখানে সরকার ভারতকে একই বিষয়ে অনুরোধ করে চিঠি দেয়। এর আগেও অন্যান্য বিষয়ে চীনকে পাশ কাটিয়ে সরকার বারবার ভারতের উপর নির্ভরশীলতার উপর জোর দেয়। হাসিনার আমলেও ভারত-প্রীতির কারণে বাংলাদেশ ভারতের উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়েছিল। যে কারণে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। বিশেষ করে জনশক্তি রফতানিতে ধস নামে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সরকার আসলে হাসিনার পথেই হাঁটছে। এটা ভুলে গেলে চলবে না, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে হাসিনা ইস্যুতে ভারত ক্রমাগত বাংলাদেশকে অসহযোগিতা তো বটেই; বরং বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নানা মিথ্যা অপপ্রচারে লিপ্ত ছিল। এমনকি বারবার প্রতিশ্রুতি দেয়ার পরও ভারত সীমান্ত হত্যা থামায়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, চীন একমাত্র দেশ যে কি-না সব ধরনের দুঃসময়ে বাংলাদেশের পাশে ছিল, এখনো আছে। চীন স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু। বর্তমান তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকারের প্রতি যেকোনা সহযোগিতার জন্য আগ্রহ ও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে রেখেছে চীন। অথচ বাংলাদেশ বিভিন্ন ইস্যুতে ঘুরেফিরে ভারতের উপরই নির্ভরশীল হতে চাচ্ছে। এটি বৈশি^ক যেকোনো সংকটে বাংলাদেশের জন্য আরো ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনতে পারে।
এদিকে, ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ইউরিয়া আমদানিকারক দেশ। সাধারণত মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে বিপুল ইউরিয়া আমদানি করে থাকে তারা। কিন্তু হরমুজ প্রণালীতে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যদি এ গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে সারসহ জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
ভারতের প্রতিবেদনে বলা হয়, কৃষি উৎপাদন সচল রাখতে দ্রুত বিকল্প সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে ভারত সরকার। তাই সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় চীন থেকে ইউরিয়া আমদানির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। তাহলে ভারতের বাংলাদেশে সার সরবরাহের প্রতিশ্রুতিও কী মিথ্যা? বাংলাদেশে ওসমান হাদির খুনিরা ভারতে গ্রেফতার হওয়ার পর বাংলাদেশ ভারত সরকারের কাছে ওই দুই খুনিকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তরের জন্য অনুরোধ জানায়। সে সময়ও ভারত তাদেরকে ফিরিয়ে দেয়ার আশ্বাস দেয়। অথচ এখনো তাদেরকে হস্তান্তরের বিষয়ে ভারত কোনো উদ্যোগ নেয়নি। এবার দুই খুনিকে ফিরিয়ে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বলে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। তবে স্বৈরাচার হাসিনাকে হস্তান্তরে ভারত কোনো সম্মতি দেয়নি। অনেকের মতে, ভারত আসলে টালবাহানা করে এবারো কোনো প্রতিশ্রুতিই রাখবে না; বরং নির্ভরশীলতা বাড়ানোর জন্য তারা কৌশলগত অবস্থান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে বোঝাবে যে, ভারতকে আমরা কৌশলগতভাবে বাংলাদেশকে চীন থেকে দূরে রেখেছি।
সূত্র: ইনকিলাব