দেশে পানীয় থেকে শুরু করে শাকসবজি, তেল, দুধ, মসলা, মিষ্টি ও শিশুখাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় নানা খাদ্যপণ্যে মিলেছে মারাত্মক মাত্রায় ক্ষতিকর রাসায়নিক, ভারী ধাতু ও জীবাণুর অস্তিত্ব। রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন বাজার ও এলাকা থেকে সংগৃহীত সবজির নমুনায় ১.১৬-২.৩৭ পিপিএম মাত্রার সিসার অস্তিত্ব মিলেছে। নমুনায় ক্ষতিকর মাত্রার ০.৩৩ পিপিএম ক্যাডমিয়ামও শনাক্ত হয়েছে। সবজির কিছু নমুনায় ই-কোলাই, ফিকাল কলিফর্ম এবং সালমোনেলা জীবাণুর উপস্থিতিও পাওয়া গেছে। শুধু রাজধানী নয়, রাজধানীর উপকণ্ঠ গাজীপুর, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার পানি থেকে শুরু করে বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যে ক্ষতিকর মাত্রায় বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক ও জীবাণু পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) ২০২৪-২৫ অর্থবছরের পরীক্ষার এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। এ অবস্থায় বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এসব দূষিত খাদ্য দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসার, কিডনি, লিভার ও হৃদরোগসহ নানা জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
বিএফএসএ-এর প্রতিবেদনে জানা যায়, মাছ, মাংস, ফল, মসলায় অতি মুনাফার লোভে মেশানো হচ্ছে ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান। দুধও তৈরি হচ্ছে কেমিক্যাল দিয়ে। জিলাপিতে দেওয়া হচ্ছে হাইড্রোজ। জীবন রক্ষাকারী ওষুধেও মেশানো হচ্ছে ভেজাল। ফ্লেভার ও কাপড়ে ব্যবহৃত রং মিশিয়ে বানানো হচ্ছে ফলের জুস। পাশাপাশি অপরিপক্ব ফল পাকাতে ব্যবহার করা হচ্ছে কার্বাইড ও হরমোন। যা শুধু সাধারণ মানুষই নয়, শিশুসহ অসুস্থ রোগীর পেটেও যাচ্ছে। নিত্যদিনের খাবারে বিষ মেশানো ভেজাল খাবারে জনস্বাস্থ্য পড়ছে হুমকির মুখে। বিএফএসএর পরীক্ষায় ফলাফলের তথ্যমতে, দিনাজপুরের প্রতি ১০০ মিলিলিটার পানিতে ১২০ সিএফইউ ফিকাল কলিফর্ম শনাক্ত হয়েছে। খাগড়াছড়ির ১০০ মিলিলিটার পানিতে ৬০ সিএফইউর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এ ছাড়া বাগেরহাটে মিলেছে ৪৩ সিএফইউ।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন বাজার ও এলাকা থেকে সবজির নমুনা সংগ্রহ করে ১.১৬-২.৩৭ পিপিএম মাত্রার সিসার অস্তিত্ব মিলেছে। ওই নমুনায় ০.৩৩ পিপিএম ক্যাডমিয়ামও শনাক্ত হয়েছে। আরও চিন্তার বিষয় হচ্ছে- সবজির কিছু নমুনায় ই-কোলাই, ফিকাল কলিফর্ম এবং সালমোনেলা জীবাণুর উপস্থিতিও পাওয়া গেছে। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ বলছে, শাকসবজিতে ০.৩ পিপিএম সিসা থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু পাওয়া গেছে সর্বোচ্চ ২.৩৭ পিপিএম।
এদিকে রাজশাহী ও গাজীপুরসহ বিভিন্ন জেলা থেকে সংগ্রহ করা গুড়ের নমুনায় খাদ্যে ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ সোডিয়াম হাইড্রোসালফাইট শনাক্ত হয়েছে। কুমিল্লা, মানিকগঞ্জ, টাঙ্গাইল ও হবিগঞ্জের বিভিন্ন ব্র্যান্ড ও খোলা বিস্কুটের নমুনায় নিষিদ্ধ রাসায়নিক শনাক্ত হয়েছে, যা খাদ্য নিরাপত্তা মানদন্ডের পরিপন্থি। এ ছাড়া পরীক্ষায় চানাচুরে অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে বেশি লবণ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া একটি নমুনায় অ্যাফ্লাটক্সিন শনাক্ত হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে লিভারের মারাত্মক ক্ষতি ও ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। অন্যদিকে বিভিন্ন জেলার লবণের নমুনায় কোথাও আয়োডিনের ঘাটতি, আবার কোথাও অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে অতিরিক্ত আয়োডিন পাওয়া গেছে।
ফলে আয়োডিনযুক্ত লবণ নিশ্চিত করার সরকারি উদ্যোগ প্রশ্নের মুখে পড়েছে। সঙ্গে হলুদ ও মরিচের গুঁড়ার নমুনায় অতিরিক্ত অ্যাশ পাওয়া গেছে, যা নিম্নমানের উপাদান বা ভেজালের ইঙ্গিত দেয়। পরীক্ষায় সরিষার তেলে উচ্চমাত্রার অ্যাসিড পাওয়া গেছে, যা তেলের গুণগত মানের অবনতি এবং সংরক্ষণ বা উৎপাদন প্রক্রিয়ার ত্রুটি বলা হচ্ছে। খুলনা থেকে সংগ্রহ করা মধুর নমুনায় অতিরিক্ত সুক্রোজ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া বিভিন্ন জেলার নমুনায় অতিরিক্ত ফ্রুক্টোজ ও গ্লুকোজ শনাক্ত হয়েছে।
রাজবাড়ী ও চট্টগ্রামের ঘির নমুনায় মিল্ক ফ্যাটের পরিমাণ কম বা একেবারেই অনুপস্থিত পাওয়া গেছে। অর্থাৎ এসব পণ্য প্রকৃত ঘির মান পূরণ করেনি। বরিশাল থেকে সংগ্রহ করা মিল্ক পাউডারের নমুনায় সিসা শনাক্ত হয়েছে। যা শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক উভয়ের জন্যই অত্যন্ত উদ্বেগজনক। পাশাপাশি বিভিন্ন ফলের পানীয়, সফট ড্রিংক ও কৃত্রিম ফ্লেভারযুক্ত পানীয়ে অতিরিক্ত বেনজোয়িক অ্যাসিড, টারট্রাজিন এবং ক্যাফেইন পাওয়া গেছে। কক্সবাজার থেকে সংগ্রহ করা জিলাপির নমুনায় নিষিদ্ধ সোডিয়াম হাইড্রোসালফাইট পাওয়া গেছে, যা খাদ্যে ব্যবহার আইনত নিষিদ্ধ। বিভিন্ন জেলার আচারের নমুনায় অনুমোদিত সীমার কয়েক গুণ বেশি সংরক্ষণকারী রাসায়নিক শনাক্ত হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।