শাহীন খন্দকার: আখের রস গ্রীষ্মের তপ্ত গরমের দিনে বিশেষ পানি। এই পানি শরীরকে সতেজ রাখতে সহযোগিতা করে এবং শরীরে তাৎক্ষনিক শক্তি জোগায়। রায়ের বাজার আখের আরতের মহাজন আব্দুল খালেক বেপারী বলেন, আখের রস প্রস্তুত করার জন্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের জমি থেকে প্রথমে আখ সংগ্রহ করা হয়। পরে আখের মাথা কেটে পরিস্কার করা হয়। দেশের ছোট বড় বিভিন্ন শহরে চলে যায় জমির মালিক থেকে পাইকারের মাধ্যমে। তেমনি রাজধানীর রায়ের বাজার, রামপুরা, মীরপুর সদরঘাটসহ বড়বড় স্পটে চলে আসে ট্রাকযোগে।
আব্দুল খালেক বলেন, প্রতিদিন রায়ের বাজারে কয়েকশত নারী-পুরুষ প্রতি বোঝা ১০০-১৩০ টাকা হিসাবে আখের মাথাকেটে কয়েক টুকরা করে থাকে। পরে আখের গায়ের ময়লা পরিস্কারসহ ছোখলা ধা-দ্বারা ছাড়িয়ে বোজাবান্দে। বোঝাগুলো রাজধানীর বিভিন্ন স্পটে ছোট ছোট ভ্যানে করে ব্যবসায়িরা এসে নিয়ে যায়। ভ্যানের মধ্যেই আখের রস মাড়াইয়ের ছোট মেশিনের সাহায্যে রস করে তৃষ্ঞার্ত পথোচারিসহ বাসা-বাড়ির জন্য মানুষ নিয়ে যায়।
অনেকে স্পটেই দাড়িয়ে দাড়িয়ে খেয়ে থাকে। গরমে রোজায় রাজধানীতে আখের রসের রমরমা ব্যবসা চলে বলে জানিয়েছেন, আখের রস বিক্রেতারা। অধিক বিক্রি অধিক আয় সারা বছর টুকটাক চলে । এতে সংসার চলে যায় বেশ। প্রতিবেদকের কথা হয় রায়ের বাজার আখ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন কাজে নিয়োজিত নারী ও পুরুষের সঙ্গে।
ছখিনা, আয়শা বেওয়া, ববিতা বেগমসহ আছরউদ্দিন, রিপন শেখ জানান প্রতিদিন ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আখ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন ছিলাইয়ের কাজ করেন। একজন ১০-১৫টি বোজা কাটতে পারেন, এতে প্রতিজনের প্রতিদিন ১০০০-১৫০০ টাকা নিয়ে ঘওে ফিরেন। আয়শা বেগম বলেন, স্বামী তাকে ছেড়ে দিয়ে আরেকটি বিয়ে করলে তিনি প্রতিবেশীর হাত ধরে শরিয়তপুর থেকে চলে আসেন দুই সন্তান নিয়ে ঢাকায়। আখ ছিলানোর কাজ করে ছেলেকে কলেজে পড়াচ্ছেন, মেয়ে লেখা পড়া করেনি, মায়ের সঙ্গেই কাজ করছে।
কথা হয় রায়ের বাজার বুদ্ধিজীবি স্মৃতি সৌধের সামনে আখের রস বিক্রেতা রইজ মিঞার সঙ্গে। তিনি জানালেন, প্রতিদিন বেলা ৩টার দিকে চলে আসেন মেশিন নিয়ে ভ্যানে আখসহ। সঙ্গে একড্রাম পানি সেই সঙ্গে ৮টি কাচের গ্লাস। প্রতি গ্লাস বিক্রি করেন ২০ টাকা করে। তবে তিনি বরফ ব্যাবহার করেন না। কারন সর্ম্পকে বলেন, বরফের পানি অনেক সময় ভালো থাকে না এবং স্বাস্থ্য সম্মত না বলে তিনি বরফ মিশ্রিত আখের সরবত বিক্রি করেন না। প্রশ্নে বলেন, প্রথমে আখের গায়ের ময়লা পরিষ্কার করে পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে নিয়ে এর পরে মেশিন ভালো কওে ধুইয়ে পরিস্কার রুমাল দিয়ে মেশিন পরিস্কার কওে তৃষ্ঞার্ত মানুষকে খেতে দেই। এতে তার বেশ ভালোই যাচ্ছে দিন।
তিনি আরও বলেন ৩ টি রোলারের মেশিনের চাপে আখ পিষ্ট হয় রস হয়ে মগের মধ্যে পড়ে ছোবরা আলাদা হয়ে যায়। তবে গরমের দিনে ও রোজার দিনে ইফতারের ক্লান্তি দূও করতে আখের রস জনপ্রিয়।
আখের রসের উপকারিতা নিয়ে কথা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অধ্যাপক ডা. আশরাফ চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি বলেন, আখের রস শরীরের পানিশুন্যতা দূর করে, এতে রয়েছে প্রচুর পরিমানে ক্যালরি, ক্যালসিয়াম,পটাসিয়াম আয়রনসহ প্রাকৃতিক চিনি (গ্লুকোজ) রয়েছে। ডিহাইড্রেশন দূর করে লিভার সুস্থ্য রাখে, জন্ডিস নিরাময়ে সাহায্য করে।
বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রোভাইস চ্যান্সেলর মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আতিকুল ইসলাম বলেন, অতিরিক্ত আখের রস রক্তের শর্করা বাড়িয়ে দিতে পারে এবং দাঁতের ক্ষয় ও ওজন বৃদ্ধির কারণ হতে পারে। আখের রসে রয়েছে ক্যালসিয়াম, পটাসিয়াম, আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম এবং ফসফরাসের মতো প্রয়োজনীয় পুষ্টি। এগুলো হাড় মজবুত করে এবং দাঁতকে শক্তিশালী করে। আখের রসের এই পুষ্টিগুণ শরীরে রক্ত চলাচলও ঠিক রাখে। তবে আখের রস খুবই সহজলভ্য এবং উপকারি পানি।
তিনি আরও বলেন, আখ অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ। এই সুস্বাদু পানি বিষাক্ত পদার্থ দূর করে শরীওে প্রচুর শক্তি জোগায়। আখের রসে রয়েছে প্রচুর ফাইবার এবং মাইক্রো-মিনারেলস। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং অনেক রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষমতা রয়েছে। এই রস মিষ্টি হলেও এতে চর্বিও উপস্থিতি খুবই কম। জন্ডিস, রক্তশূন্যতা এবং অম্বল জ্বালায় আখের রস খুবই উপকারী। শরীর ঠান্ডা রাখা এবং গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা নিয়েও এর কোন সম্পর্ক নেই।
এছাড়া আখের রসে প্রচুর পরিমানে পটাশিয়াম থাকায় এটি শরীরের পরিপাকতন্ত্রের জন্য খুবই উপকারি। হজম ঠিক রাখার পাশাপাশি এই জুস পেটের ইনফেকশন ও প্রতিরোধ করে। সেই সঙ্গে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যাও দূর করে।
আখের রসে হার্ট অ্যাটাকের মতো হৃদরোগের বিরুদ্ধে ও সুরক্ষা দেয়।আখের রস শরীরের কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা কমায়। ধমনীতে চর্বি জমে না এবং হৃৎপিন্ড এবং শরীরের অঙ্গগুলির মধ্যে ভাল প্রবাহ থাকে।
মেডিসিন বিশেষজ্ঞ এবং ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, গরমের সময় আখের রস এবং রাস্তার ফুটপাতে খোলা পানি পানের বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ হচ্ছে অস্বাস্থ্যকরপরিবেশে তৈরী আখের রস পানে সর্তকবার্তা দেন। তাঁর মতে দূষিত পানি ও বরফ বিক্রেতারা রস ঠান্ডা করতে যে বরফ ব্যবহার করেন,তা সাধারণত অনিরাপদ ও দূষিত পানি দিয়ে তৈরি হয়। জীবাণুর সংক্রমন, মাছি, ধুলাবালি এবং অপরিস্কার হাত ও মেশিনের কারনে এই রসে ই-কোলাই সালমোনেলা বা জিয়ার্ডিয়ার মতো ক্ষতিকর জীবানু মিশে যায়। ফলে দূষিত রস পানের কারণে টাইফয়েড, ডায়রিয়া, অমাশয় এবং জন্ডিস( হেপটাইটিস এ বা ই) মতো মারাত্মক জলবাহিত রোগ ছড়ায়।
মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আব্দুল্লাহ বলেন, রাস্তার উন্মুক্ত আখের রস থেকে জন্ডিস ভালো হওয়াতো দূরের কথা, উল্টো লিভারের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। তবে সম্পর্ণ জীবাণুমুক্ত ও ঘওে তৈরি পরিস্কার আখের রস বা গ্লুকোজের পানি সীমিত পরিমাণে শরীরের শক্তি জোগাতে সাহায্য করতে পারে বলে তিনি জানন।