যুক্তরাষ্ট্রে অনূর্ধ্ব ৫০ বছর বয়সী অর্থাৎ তুলনামূলক তরুণদের মধ্যে কোলন বা মলাশয়ের ক্যানসারের হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। অতি সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা এর পেছনে মানুষের পরিপাকতন্ত্রে বা অন্ত্রে থাকা একটি নির্দিষ্ট বিষাক্ত উপাদানকে দায়ী করছেন, যার নাম ‘কলিব্যাকটিন’।
ক্যালিফোর্নিয়ার একদল গবেষক জানিয়েছেন, আমাদের অন্ত্রে বাস করা ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া—বিশেষ করে, খাদ্যের মাধ্যমে ছড়ানো সাধারণ ব্যাকটেরিয়া ‘ই-কোলাই’-এর কিছু প্রজাতি থেকে এই কলিব্যাকটিন নামের টক্সিন বা বিষাক্ত উপাদানটি তৈরি হয়। এটি কোলনের কোষগুলোর ডিএনএর মারাত্মক ক্ষতি করে, যা কালক্রমে ক্যানসারে রূপ নেয়। যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে ক্যানসারজনিত মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ এই কোলন ক্যানসার।
ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া সান দিয়েগো (ইউসি সান দিয়েগো) ও স্কুলটির মুরাস ক্যানসার সেন্টারের অধ্যাপক লুদমিল আলেকজান্দ্রভ এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আমাদের পরিবেশগত বা অভ্যাসগত সব বিষয়ই যে আমাদের জিনোমে চিহ্ন রেখে যায়, তা নয়। তবে আমরা দেখেছি যে, কলিব্যাকটিন এমন একটি উপাদান, যা জিনোমে স্থায়ী পরিবর্তন বা ক্ষত সৃষ্টি করতে পারে। গবেষণায় তরুণদের কোলন ক্যানসারের সঙ্গে কলিব্যাকটিনের এই জিনগত ক্ষতের সরাসরি সম্পর্ক পাওয়া গেছে।’
আমেরিকান ক্যানসার সোসাইটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছরেই যুক্তরাষ্ট্রে নতুন করে ১ লাখ ৫৮ হাজারের বেশি মানুষ কোলন ক্যানসারে আক্রান্ত হতে পারেন এবং এর ফলে প্রাণ হারাতে পারেন অন্তত ৫৫ হাজার মানুষ।
কেন অঞ্চলভেদে আক্রান্তের হারে তারতম্য
প্রাপ্তবয়স্কদের ২০ থেকে ৩০ শতাংশের শরীরে ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়ার এমন কিছু প্রজাতি শনাক্ত করা হয়েছে, যা কলিব্যাকটিন তৈরি করতে পারে। তবে মজার বিষয় হলো, কলিব্যাকটিন শরীরে থাকলেই সবার ক্যানসার হয় না। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম ইউরোপের তুলনায় আফ্রিকা ও এশিয়ার দেশগুলোতে কলিব্যাকটিনজনিত কোলন ক্যানসারের হার অনেক কম।
ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের অণুজীব গবেষক ক্রিশ্চিয়ান জোবিন জানান, কেন এই তারতম্য ঘটে, তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তবে তিনি মনে করেন, কলিব্যাকটিন উৎপাদনকারী ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়াগুলো আমাদের খাদ্যভ্যাস, শারীরিক প্রদাহ ও ওষুধের ব্যবহারের ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়।
জোবিন আরও মনে করেন, শিশুর জন্মপ্রক্রিয়া, বুকের দুধ পানের ইতিহাস, অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার ও শৈশবে অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়ার অভ্যাসের মতো বিষয়গুলো অন্ত্রের অণুজীবের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।
গবেষকদের মতে, একজন মানুষের প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার অনেক আগেই, এমনকি শৈশবের শুরুর বছরগুলোতেই অন্ত্রের এই ক্ষতিকর পরিবর্তনগুলো ঘটতে শুরু করতে পারে।
সুরক্ষায় করণীয়: শৈশব থেকেই হোক শুরু
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুর স্নায়ুতন্ত্র, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ও পরিপাকতন্ত্রের সুস্থতার জন্য শৈশবেই অন্ত্রের স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা জরুরি। এর জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে:
মায়ের বুকের দুধ: নবজাতককে বুকের দুধ খাওয়ালে অন্ত্রে উপকারী ব্যাকটেরিয়া বাড়ে।
ত্বকের সংস্পর্শ: মায়ের ত্বকের সংস্পর্শে এলে শিশুর শরীরে ভালো ব্যাকটেরিয়া স্থানান্তরিত হয়।
অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক বর্জন: ঠান্ডা, ফ্লু বা সাধারণ কান ও সাইনাসের সংক্রমণের মতো ভাইরাল রোগে অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা যাবে না। এগুলো ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার পাশাপাশি অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলোকেও ধ্বংস করে দেয়।
প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে এবং কলিব্যাকটিনের ক্ষতিকর প্রভাব এড়াতে বিশেষজ্ঞরা বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট পরামর্শ দিয়েছেন:
১. প্রোবায়োটিকসমৃদ্ধ খাবার: প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় দই, আচার ও টক স্বাদের গাজন করা খাবার রাখলে তা অন্ত্রে ভালো ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বাড়ায়। এগুলো একধরনের জৈব অ্যাসিড তৈরি করে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে এবং ক্যানসারের জন্য দায়ী শারীরিক প্রদাহ রোধ করে।
২. প্রিবায়োটিক ফাইবার: মিষ্টি ক্যাপসিকাম, কলা, ওটস ও অ্যাসপ্যারাগাসের মতো ফাইবারযুক্ত খাবার ভালো ব্যাকটেরিয়ার খাদ্য হিসেবে কাজ করে। যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের মতে, ফাইবার ই-কোলাইসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। প্রতিদিন অন্তত তিন থেকে পাঁচ গ্রাম প্রিবায়োটিক নেওয়া অত্যন্ত উপকারী।
৩. পর্যাপ্ত পানি পান: হার্ভার্ড হেলথের তথ্য অনুযায়ী, পানি পানের ফলে পরিপাকতন্ত্রে একধরনের প্রতিরক্ষামূলক শ্লেষ্মা তৈরি হয়। চিকিৎসকদের মতে, নারীদের প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১১ দশমিক ৫ কাপ এবং পুরুষদের ১৫ দশমিক ৫ কাপ পানি পান করা উচিত। গবেষণায় দেখা গেছে, কম কার্বোহাইড্রেটের ডায়েট মেনে চলা ইঁদুরের শরীরে এই শ্লেষ্মা স্তরটি পাতলা হয়ে যায়, যার ফলে কলিব্যাকটিন সহজেই কোলন কোষের ক্ষতি করতে পারে।
৪. শারীরিক পরিশ্রম: সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মানের ব্যায়াম বা শারীরিক পরিশ্রম অন্ত্রের মাইক্রোবায়োমের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে।
সূত্র: আজকের পত্রিকা