দূষণে বুড়িগঙ্গার যে করুণ দশা দাঁড়িয়েছে, তাতে সেটিকে আর নদী বলতে অস্বস্তিবোধ করছেন খোদ পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম। তার ভাষ্য, এটি এখন জলাধার বা নর্দমায় পরিণত হয়েছে।
আর বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একন অধ্যাপক বলছেন, সেখানে মাছ বেঁচে থাকার মতোও দ্রবীভূত অক্সিজেন নেই; দেশি কোনো মাছ নেই বললেই চলে, আছে কেবল সাকার ফিস।
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিঃসরিত বর্জ্যে কেবলই বুড়িগঙ্গা দূষিত হচ্ছে না; তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যা, ধলেশ্বরীর মতো ঢাকার আশপাশের সব নদ-নদীই এখন মরতে বসেছে। বর্জ্য নিঃসরিত হয় এমন ছোটবড় ৪২৪টি উৎসমুখ চিহ্নিত করেছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)।
এসব উৎসমুখের ৬৬টিই ওয়াসার বলে শনাক্ত করা হয়েছে জরিপে। এর বাইরে ঢাকা দক্ষিণ-উত্তর সিটির পাশাপাশি ২৪৪টি ব্যক্তিমালিকানাধীন ও বেসরকারি শিল্প-কারখানার বর্জ্য উৎমুখ চিহ্নিত হয়েছে।
সংস্থার এক জরিপে দেখা গেছে, বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদীতে এমন উৎসমুখ রয়েছে ২২৪টি। এর মধ্যে বুড়িগঙ্গায় ১৬৬টি এবং তুরাগে ৫৮টি উৎসমুখ রয়েছে।
বিজিএমইএ’র সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ইনামুল হক খান বলছেন, বুড়িগঙ্গা-তুরাগে এখন পানি নড়ে না, কাদার মত হয়ে গেছে।
“পরিস্থিতি সত্যি ভয়াবহ।”
নদীকে দূষণমুক্ত করতে চিহ্নিত বর্জ্যমুখ বন্ধের উদ্যোগের পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানোর তাগিদ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
গেল ৬ অগাস্ট সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে ‘বুড়িগঙ্গা নদীর পানি ও পরিবেশ উন্নয়ন’ বিষয়ক এক সভা হয়েছে। সেখানে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যাসহ ঢাকার চারপাশের নদী দূষণ প্রতিরোধে সমন্বিত কর্ম-পরিকল্পনা করে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
নদী দূষণ রোধে শিল্পকারখানায় বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) কার্যকরভাবে পরিচালনা নিশ্চিত করা, খাল ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, দূষণকারীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা, বিদ্যমান পরিবেশ আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় আরো জোরদার, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে বৈঠকে।
বুড়িগঙ্গা-তুরাগের কী হাল
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক মো. শাহজাহান বলেন, “প্রাথমিকভাবে বুড়িগঙ্গা নদীতে স্টাডি করে দেখা গেছে সেখানে প্রচুর মাইক্রোপ্লাস্টিক আছে। এছাড়া সেখানে ডিজলভ অক্সিজেন থেকে আরম্ভ করে জৈব অক্সিজেন, রাসায়নিক অক্সিজেনে মাছ বেঁচে থাকার মতো পরিস্থিতি নেই। এ ছাড়া ব্যাপকভাবে ক্যাডমিয়াম, মারকারি—এইসব হেভি মেটালসও ওখানে পাওয়া গেছে।
“সে কারণে মাছের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। শুধুমাত্র বিদেশি মাছ—সাকার মাছ বলে, যারা ময়লা-আবর্জনা খায়—তার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। বুড়িগঙ্গার কারণে আড়িয়াল বিল পলিউটেড হচ্ছে। কারণ বুড়িগঙ্গার সাথে শীতলক্ষ্যার কানেকশন আছে, শীতলক্ষ্যার সাথে আড়িয়াল বিলের কানেকশন আছে। বুড়িগঙ্গার অবস্থা খুবই খারাপ, বুড়িগঙ্গা বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি পলিউটেড একটা নদী।”
বর্জ্যের উৎস মুখের প্রসঙ্গ টেনে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক এ কে এম সাইফুল ইসলাম বলেন, “ঢাকা শহর দূষণে বিশেষত নদীর দূষণসহ টোটাল পরিবেশটাই একটা বলা যায় স্বাস্থ্যকর যে সিটির ইন্ডেক্স আছে, সেগুলো নিচের দিকে থাকে বাংলাদেশ।
“এত বৃষ্টি হয়, এত নদ-নদী, তার পরেও এই অবস্থার কারণ হল—নদীতে যে পানিগুলো আসে, বিশেষত যে পয়েন্টগুলো; দেখলাম রিপোর্টে পয়েন্টগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। দেখতে হবে উৎস কোথায়, যদি সোর্স এটা বন্ধ করতে পারি (তাহলে পরিবেশের উন্নতি হবে)।”
পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের এ অধ্যাপক বলেন, “এসব পয়েন্ট তো কেউ সরাইতে পারবে না, ফিজিক্যালি আছে। এটা কোথা থেকে আসে তা পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন, আইন শৃঙ্খলা বাহিনী—শুধু অভিযান করে কিছুটা কমে।
“বিদ্যমান আইনের মধ্য থেকে জরিমানা দিয়ে অনেকটা কমে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সুফল পেতে হলে মানুষকে আসলে বোঝাতে হবে। আসলে মাইন্ডসেট পরিবর্তন করতে হবে।”
জানতে চাইলে পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম শুক্রবার বলেন, “আমাদের পরিবেশ প্রতিবেশের সুরক্ষার জন্য এই নদীটাকে, জীবনটা সেটাকে ফিরিয়ে আনতে হবে।
“কারণ নদী তো এখন তো মৃত প্রায় নদী; এটা জাস্ট জলাধার বা ড্রেনে পরিণত হয়েছে। এটা তো হতে পারে না। এটা আমাদের একটা জীববৈচিত্র্য বা প্রাণ প্রকৃতির অংশ।”
পরিস্থিতি উত্তরণে কী করবেন, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “আমরা প্রথমত কাজ করব দুটো নদী নিয়ে মূলত…তুরাগ হচ্ছে ১৫ কিলোমিটার, বুড়িগঙ্গা হচ্ছে ২৩ কিলোমিটার। টোটাল ৩৮কিলোমিটার নদী নিয়ে আমরা কাজ করব।
“আর পাশাপাশি অন্য জায়গায় আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে। এই ৩৮ কিলোমিটারের ভেতর যতগুলো আছে, সেগুলো আমরা চিহ্নিত করে তাদেরকে সময় দিয়ে এগুলো আগে ফিক্স করব।”
পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী বলতে থাকেন, তারপরে শীতলক্ষ্যা, বালু, ধলেশ্বরী—এগুলো নিয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কাজ করা হবে। পরিবেশ অধিদপ্তরের টিম প্রতিনিয়ত সেখানে অভিযান চালাচ্ছে।
“পরিবেশ আইনের পাশাপাশি আমরা নৌবাহিনীর সহায়তা নিয়ে আমরা চেষ্টা করব এই জায়গাগুলো সঠিকভাবে অ্যাড্রেস করে যত দ্রুততম সময়ের ভেতর এটাকে বন্ধ করতে পারি। কারণ উৎসমুখ বন্ধ না হলে নদীর পানি ঠিক করা যাবে না। ...নদীর পানির অবস্থা ওভারঅল ভালো নেই।”
নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে ‘বুড়িগঙ্গা নদীর দূষণ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন রূপরেখা’ নামে একটি প্রতিবেদন ১৩ অগাস্ট পরিবেশ অধিদপ্তরের এক সভায় উপস্থাপন করা হয়।
এতে জানানো হয়, বুড়িগঙ্গা নদীর পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা বর্তমানে মারাত্মকভাবে কমে গেছে। সুস্থ জলজ পরিবেশের জন্য প্রতি লিটারে অন্তত ৫ মিলিগ্রাম অক্সিজেন প্রয়োজন হলেও বুড়িগঙ্গায় তা কমে গড়ে ১ দশমিক ৭ থেকে ২ দশমিক ৬৮ মিলিগ্রামে নেমে এসেছে, যা শুষ্ক মৌসুমে নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় শূন্যের কোঠায় বা ১ মিলিগ্রামের নিচেও পৌঁছায়।
>> তুরাগ: দূষণের সার্বিক পরিস্থিতিতে পরিবেশগতভাবে তুরাগ নদীর অবস্থা সংকটাপন্ন। শিল্প বর্জ্য, পয়ঃবর্জ্য ও প্লাস্টিকই প্রধান দূষক।
>> বুড়িগঙ্গা: ট্যানারি বর্জ্য, পয়ঃবর্জ্য, শিল্প ও বাজার বর্জ্য, তেল ও কালো স্লাজের দূষণে নদীটি অত্যন্ত সংকাপন্ন।
>> ধলেশ্বরী: শিল্পবর্জ্য, ভারি ধাতু ও জীবাণু প্রধান দূষক। অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে নদীটি।
ঢাকার প্রাণ বুড়িগঙ্গা হলে উত্তরে তুরাগ ও দক্ষিণে ধলেশ্বরী নদীকে একই জল ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা দরকার বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। ধলেশ্বরীর নদীর প্রবাহ মূলত দক্ষিণমুখী হওয়ায় প্রাথমিক পর্যায়ে বুড়িগঙ্গা এবং তুরাগের দূষণ রোধের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
বুড়িগঙ্গা-তুরাগ তীরের দূষণ হটস্পট যত-
বুড়িগঙ্গা: উত্তর তীর (ঢাকা মহানগর), দক্ষিণ তীর (কেরাণীগঞ্জ), সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল, বাবুবাজার সেতু এলাকা, আহসান মঞ্জিল, জিঞ্জিরা, ওয়াইজঘাট, কালীগঞ্জ (কেরাণীগঞ্জ), বাদামতলী ঘাট, আগানগর, ফরাশগঞ্জ, কালিন্দী, শ্যামবাজার, চুনকুটিয়া, ইসলামপুর, চরকালীগঞ্জ, চকবাজার, হাসনাবাদ, লালবাগ, কদমতলী (কেরাণীগঞ্জ), কামরাঙ্গীরচর, তেঘরিয়া, হাজারীবাগ, আটিবাজার, জিঞ্জিরা সংলগ্ন নদীতীর, কেরাণীগঞ্জ কেন্দ্র, আর্মেনিয়ান চার্চ (নিকটবর্তী), বস্তা ঘাট এলাকা, বড় কাটরা ও ছোট কাটরা, রায়সাহেব বাজার, কেরাণীগঞ্জ নদীতীর।
তুরাগ: কোনাবাড়ী বিসিক-বাইমাইল এলাকা, কাশিমপুর-ইছরকান্দি শিল্পাঞ্চল, কড্ডা ও কড্ডা বাজার এলাকা, কামারপাড়া-রুস্তমপুর করিডর, আরিচপুর-মাছিমপুর-টঙ্গী বাজার এলাকা, টঙ্গী নদীবন্দর এলাকা, টঙ্গী রেলওয়ে ব্রিজ এলাকা, গাজীপুরা-বড়বাড়ি-শুকুন্দিরবাগ এলাকা, নিমতলী-মাজুখান ব্রিজ সংলগ্ন খাল-মোহনা, টঙ্গী খাল-তুরাগ নদীর সংযোগস্থল, স্কুইব রোড শিল্প ক্লাস্টার, মিলগেট রোড ডাইং-ওয়াশিং শিল্প ক্লাস্টার, আশুলিয়া-বেরিবাঁধ নদী তীরবর্তী এলাকা, গাবতলী-নওয়াবেরবাগ এলাকা এবং মিরপুর বেড়িবাঁধ-মিরপুর ব্রিজ এলাকা।
পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, “বেসরকারি ও ব্যক্তি মালিকানাধীন কলকারখানার পাশাপাশি উত্তর, সিটি করপোরেশনের কিছু লাইন আছে; ওয়াসার কিছু আছে।
“এগুলো নিয়েও আমরা নৌবাহিনীর সাথে ওয়ার্ক করছি কোনটা কীভাবে ফিক্স করা যায়; কীভাবে একটা সময়ে এগুলোকে ওভারকাম করা যায়, সেটা নিয়ে কাজ করছি।’’
তিনি বলেন, “এখন ব্যাপারটা হচ্ছে যে- আমরা চাই কাজটা শুরু করতে; তাহলে একটা পর্যায়ে গিয়ে আমরা শেষ করতে পারব। কিন্তু শুরু না করে শুধু যদি আলোচনা হয়, তাহলে কাজ হবে না।”
প্রতিমন্ত্রী ফরিদুল বলেন, “ইতোমধ্যে ঢাকার ওয়াসার ৬৬টি পয়েন্টে এরকম ডিসচার্জ হচ্ছে; তাদেরকে আমরা ডাকছি-বসছি। বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিটিএমইএ, বাংলাদেশ গার্মেন্টস ওয়াশিং ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন—একটা লম্বা আলোচনা হয়েছে।”
শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, “তারা সবাই আমাদের সহযোগিতা করতে রাজি হয়েছে এবং ফারদার রিভিউ করা হবে। আমরা আশা করছি, এই মাসের ভেতর এই প্রাথমিক যে কাজগুলো সেরে আগামী মাসের মাঝামাঝি আমরা হার্ডলাইনে চলে যাব।”
বিদ্যমান বাস্তবতায় অনেক ক্ষেত্র নানা অভিযোগ, সীমাবদ্ধতা থাকলেও বর্তমান সরকার নদী দূষণ রোধে বিশেষ করে প্রথম ধাপে বুড়িগঙ্গাকে বাঁচাতে অগ্রাধিকারমূলক পদক্ষেপ নিতে চায়।
পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী বলেন, “আমরা এই জিনিসগুলো নিয়ে এক্সিকিউট করতে চাচ্ছি; প্রত্যেককে কিছু সময় দিতে হবে। কারণ যেহেতু অনেকে সীমাবদ্ধতা আছ; পাশাপাশি তাদের কিছু অভিযোগও আছে।
“পরিবেশের অধিদপ্তরের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো আমরা খতিয়ে দেখব—বাস্তবিক অর্থে আমাদের দপ্তর কতটুকু দায়ী। আমরা সবগুলোই এখানে দেখছি; এককভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নেব না। সব অংশীজনের সাথে আলাপ-আলোচনা করে একটা সমন্বিত উদ্যোগের মধ্য দিয়ে এটাকে বাস্তবায়ন করব।”
বুড়িগঙ্গা-তুরাগে বর্জ্য আসছে কোত্থেকে
>>বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদীতে নিঃসরিত বর্জ্যের উৎসমুখের মধ্যে বিভিন্ন বেসরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন কলকারখানা বা শিল্প প্রতিষ্ঠান হচ্ছে ১০৭টি। এর মধ্যে বুড়িগঙ্গায় ৮১টি আর তুরাগে বর্জ্য ফেলছে ২৬টি।
>>ঢাকা ওয়াসার ৫৭টি পয়েন্টের বর্জ্য পড়ছে বুড়িগঙ্গায়, আর তুরাগে ৯টি।
>> ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১৯টি পয়েন্টের বর্জ্য পড়ছে বুড়িগঙ্গায়।
>> ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের একটি পয়েন্টের বর্জ্য পড়ছে বুড়িগঙ্গায়, আর তুরাগে ১৫টি।
>> তুরাগ নদীতে যেসব বর্জ্যের উৎসমুখ রয়েছে, তার মধ্যে ৩টি গাজীপুর সিটি করপোরেশনের, ৩টি কাউন্দিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ও ১টি পানি উন্নয়ন বোর্ডের। বুড়িগঙ্গায় যেসব বর্জ্যের উৎসমুখ রয়েছে, তার মধ্যে ৩টি কুতুবপুর ইউনিয়ন পরিষদের, জিনজিরা ইউনিয়ন পরিষদের একটি, কালিন্দী ইউনিয়ন পরিষদের ২টি এবং শাক্তা ইউনিয়ন পরিষদের ২টি উৎস মুখ রয়েছে।
নৌবাহিনীর ঢাকা অঞ্চলের কমান্ডার রিয়ার অ্যাডমিরাল আবদুল্লাহ আল মাকসুস ১৩ অগাস্ট পরিবেশ অধিদপ্তরে গবেষণা তথ্য তুলে ধরে বলেন, বুড়িগঙ্গা-তুরাগে দূষণের ৮০ শতাংশের জন্য দায়ী শিল্প ও জৈব বর্জ্য। এর মধ্যে শিল্পবর্জ্য, রং, রাসায়নিক বর্জ্য ও ভারী ধাতুর দায় ৫৫ শতাংশ। আর ২৫ শতাংশ দায় জৈববর্জ্য, রোগজীবাণু ও অ্যামোনিয়ার।
সরকার কী উদ্যোগ নিচ্ছে
পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম জানান, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তারের নেতৃত্বে দুটি টিম করা হয়েছে।
“একটা হচ্ছে মনিটরিং টিম। আরেকটা হচ্ছে কার্যকর বা বাস্তবায়ন যারা করবে, তাদের টিম। নৌবাহিনী এবং সিটি করপোরেশন, পরিবেশসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় প্রতিনিধিরা থাকবে।”
ইতোমধ্যে শিল্পমালিক ও ব্যবসায়ী নেতাদের প্রতিনিধিদের নিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের বৈঠকে সমস্যা ও সমাধানে করণীয় তুলে ধরা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, “বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও অন্যদের প্রতিনিধি সবাই ছিলেন। উনাদের যে সমস্যাগুলো আছে, সেগুলো তুলে ধরেছে।
“ইতিবাচক সাইন হচ্ছে—সবাই একটা জিনিস একমত হয়েছেন, যাদের ইটিপি নাই বা যারা অবৈধ; তাদের ব্যাপারে কোনো সুপারিশ করবে না সংগঠনগুলো। একই সঙ্গে যাদের ইটিপি নেই, যারা বর্জ্য ছাড়ছে; তাদের যেন ব্ল্যাকমেইল না করা হয়—সে বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।”
প্রতিমন্ত্রী ফরিদুল বলেন, “এই ধরনের একটা জিনিসে তারা কথা বলেছে, তাদের সাথে একমত পোষণ করেছি।”
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর থেকে ধারাবাহিকভাবে অংশীজনদের সঙ্গে এ ধরনের আলোচনা, মতবিনিময় চলছে বলে জানান পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী।
শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, “এখন আশা করছি, হয়তো আগামী সপ্তাহের ভেতরে একটা নির্দেশনা চলে আসবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে বৈঠকের পর থেকে আমরা পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে কন্টিনিউ অভিযান চালাচ্ছি এবং তাদেরকে সতর্ক করছি। যাদের ইটিপি নেই, না থাকলেও চালিয়ে যাচ্ছে—প্রতিনিয়ত এগুলো নিয়ে কাজ করা হচ্ছে।
“হয়তো নেক্সট মান্থে জরিমানা বা যারা (ইটিপি স্থাপন) করছে না, তাদের ফ্যাক্টরি বন্ধ—এগুলোর পর্যায়ে আমাদের চলে যেতে হবে। এখন আপাতত আমরা তাদেরকে স্পেস দিচ্ছি, একটা সার্টেইন টাইম দিচ্ছি মাস খানেকের মতো—এর ভেতরে যাদের নাই তারা লাগিয়ে (স্থাপন) নেন। আর যাদের ইতিপূর্বে লাগানো হয়েছে বা চালাচ্ছে না, সেগুলোর ব্যাপারে আমরা কথা বলছি—যেন তারা চালু করে।”
শিল্প-কারখানার ক্ষতিকর বর্জ্য ও রাসায়নিক মিশ্রিত তরল পানি নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব করতে ইটিপি বা ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপন করা হয়। এর মাধ্যমে কারখানা থেকে বের হওয়া বিষাক্ত পানি পরিশোধন করে প্রকৃতিতে ফেলা বা পুনর্ব্যবহারের উপযোগী করা হয়।
মালিকদের প্রতি সরকারের আশ্বাস
পরিবেশ অধিদপ্তরে ১৩ অগাস্ট বৈঠকে অংশ নিয়ে বিজিএমইএ’র সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ইনামুল হক খান বলেন, “পরিবেশ অধিদপ্তর, মন্ত্রণালয়ের সবাই যদি নেভির সহযোগিতায় আমরা এই কাজগুলো করতে পারি, আমি মনে করি এটা অনেক ভালো হবে, আর নদীর নিয়ন্ত্রণটাও অনেক ভালো হবে। আমরা পূর্ণ সহযোগিতা করব।”
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন “এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে অনুরোধ, যেন ইটিপি পরিচালনার যতো মেটেরিয়াল আছে, এগুলি ডিউটি ফ্রি করে হয়। অন্তত খালের মুখগুলোর মধ্যে যদি সেন্ট্রাল ইটিপি বসানো যায় এই পরিবেশ ও নদী দূষণ থেকে রক্ষা পাবে।”
প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার বলেন, “আমরা বেশ কয়েকটি মিটিং করেছি, সভা করেছি এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ১৪টি সংস্থার সঙ্গে কথা বলেছি।
“সর্বশেষ বাংলাদেশ নৌবাহিনী তাদের উপস্থাপনার মাধ্যমে আমাদের একটি স্বপ্ন দেখিয়েছে। এখন আমি আশাবাদী—আপনাদের সহযোগিতা পেলে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, ধলেশ্বরী ও শীতলক্ষ্যা নদীকে যাতে টেমস করা যায়।”
মুখ্য সচিব বলেন, “বর্তমান বুড়িগঙ্গার চিত্র একদিকে, আর আমরা যে বুড়িগঙ্গা তৈরি করতে চাই—তার চিত্র অন্যদিকে। এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমি আপনাদের সহযোগিতা চাই।”
উপস্থিত ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “আমরা অতীত ভুলে যেতে চাই। আমরা নতুন করে স্বপ্ন দেখতে চাই—একটি দুর্নীতিমুক্ত, পরিবেশবান্ধব এবং বেসরকারি ব্যবসাবান্ধব সমাজ গড়ে তুলতে চাই।
“মিল-কারখানায় ইটিপি স্থাপনের ক্ষেত্রে আমরা আপনাদের পাশে দাঁড়াতে চাই। …আমরা চেষ্টা করব, ইটিপি ও এসটিপির প্রয়োজনীয় কেমিক্যালের ওপর কর একেবারে শূন্যে নামিয়ে আনা যায় কি না।”
যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
বর্জ্যের উৎসমুখের প্রসঙ্গ টেনে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক এ কে এম সাইফুল ইসলাম বলেন, সরকারের পদক্ষেপের পাশাপাশি জনসচেনতারও দরকার।
“এই ব্যাপারটা দুই পক্ষেই আসতে হবে। সামাজিকভাবেও একটা করতে হবে; সোসাইটিতেও একটা আপগ্রেডেশন করতে হবে। জেল-জরিমানা দিয়ে চোর-পুলিশ খেলা চললে হবে না।”
এ পানি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ বলেন, “দূষণকারীদের সতর্ক করার পাশাপাশি ইনসেন্টিভ দেওয়া যেতে পারে। যেসব ইন্ডাস্ট্রিগুলা ভালো কাজ করছে, দূষণ নাই পিরিয়ডিক্যালি চেক করে করে সেগুলাকে রিওয়ার্ডিং করা যেতে পারে।”
অধ্যাপক সাইফুল বলেন, “যেসব কারখানা এ প্লাস, তাদের ট্যাক্স কমাতে পারে, তাদের কারখানায় সার্টিফিকেটের মত—ঢুকতেই তাদের পণ্যে একটা সিল থাকবে যে এ প্লাস; তাদের দূষণ নেই।
“ম্যাজিস্ট্রেট দেখে জরিমানা করে লাভ হচ্ছে না কিন্তু; রিওয়ার্ডও দেওয়া যেতে পারে। যারা এ প্লাস, তাদের ৫% ট্যাক্স কম হবে। সামাজিকভাবে এই পজিটিভ মাইন্ডসেটটা গ্রো করতে হবে।”
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নদী দূষণমুক্ত করার পরিকল্পনা করা হলেও তা পরবর্তীতে বাস্তবায়ন হয়নি জানিয়ে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক মো. শাহজাহান বলেন, “প্রাথমিকভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছিল যদি এক ফিট পরিমাণ ড্রেজিং এবং ডাম্পিং করা হয়, তবে প্লাস্টিক মেটেরিয়ালস ও অন্যান্য বর্জ্য সব কিছু সরে গিয়ে নদীর পানি নতুনভাবে প্রবাহিত হতে পারবে। এর সাথে সাথে যদি ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়েস্টেজ বন্ধ করা যায়, তবে ফ্রেশ পানি পাওয়া যাবে।”
পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী ফরিদুল ইসলাম বলেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পরিবেশটাকে খুবই গুরুত্ব দিচ্ছেন এবং নির্বাচন ইশতেহারে পরিবেশটাকে উপরে রাখছেন বলা চলে আরকি এবং প্রতিনিয়ত এটা নিয়ে উনি আলোচনা করছেন, মিটিং করছেন বা আমাদের সাথে বসছেন। তো উনিও চাচ্ছেন যে, যেকোনো মূল্যে বুড়িগঙ্গাকে উদ্ধার করার জন্য।
“এখানে তুরাগ, শীতলক্ষ্যাসহ আমাদের চারপাশে নদীর যে বেল্টটা আছে, এটায় ওয়াটার বাস চালু করা। পাশাপাশি এই পানির যে কোয়ালিটি, এটাকে ঠিক করা এবং এই যে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মধ্যে দিয়ে এটাকে একটা পর্যায়ে আনা।”
জনসচেতনতা বাড়ানোরও উদ্যোগ নেওয়া হবে জানিয়ে তিনি বলেন, “মানুষকে অ্যাওয়ারনেসও পাশাপাশি বাড়াতে হবে এবং আমাদের পরিবেশ-প্রতিবেশের সুরক্ষার জন্য এই নদীটাকে, জীবনটা সেটাকে ফিরিয়ে আনতে হবে। এ লক্ষ্যে এখন সবার সহযোগিতা দরকার।”
(এ প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন আয়েন উদ্দীন ও রূপক নকরেক)
সূত্র: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম