শিরোনাম
◈ ফরিদপুরে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা: উদ্ধারকাজ চলাকালে বাসচাপায় নিহত ৫ ◈ আইনি জটিলতায় এমবাপ্পে, হতে পারে তিন বছরের কারাদণ্ড ◈ ছয় মাসের পারফরম্যান্স পর্যালোচনা: দায়িত্ব কমতে পারে কয়েকজন মন্ত্রীর, নতুন মুখ আসতে পারেন মন্ত্রিসভায় ◈ বাংলাদেশিদের অভিবাসী ভিসা স্থগিতের কারণ জানাল মার্কিন দূতাবাস ◈ রাজস্ব ও ব্যাংকিং সংস্কারে জোর, নতুন ঋণ নিয়ে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা শুরু ◈ বন্যা পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ৭ দফা নির্দেশনা, প্রয়োজনে ছুটি বাতিল ◈ বন্যা মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর সমন্বিত পরিকল্পনা, সেনাবাহিনী ও বিজিবি মোতায়েন ◈ মার্কিন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত রেলসেতু ২৪ ঘণ্টায় সচল করল ইরান ◈ সরকারি কর্মচারীদের জন্য সুখবর, রেশন সুবিধার আওতায় আসছেন যাঁরা ◈ চট্টগ্রাম বোর্ডের এইচএসসি পরীক্ষা ১৬ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত

প্রকাশিত : ১১ জুলাই, ২০২৬, ০৮:৪৪ রাত
আপডেট : ১১ জুলাই, ২০২৬, ১০:০০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

যেভাবে বাংলাদেশের বন থেকে বিলুপ্ত হলো গন্ডার

একসময় বাংলাদেশের বন-জঙ্গল, নদীঘেরা তৃণভূমি আর জলাভূমিতে গন্ডারের অবাধ বিচরণ ছিল। সিলেটের হাওড়াঞ্চল, বৃহত্তর ময়মনসিংহ, ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বন, সুন্দরবন ছিল তাদের নিরাপদ আবাস। কিন্তু আজ দেশের কোনো বনেই আর বন্যগন্ডারের অস্তিত্ব নেই। কয়েক দশকের নির্বিচার শিকার, বনভূমি ধ্বংস এবং মানুষের দখলদারির কারণে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ইতিহাস থেকে চিরতরে হারিয়ে গেছে এ বিশালদেহী স্তন্যপায়ী প্রাণী।

তথ্যানুযায়ী, বিশ্বে বর্তমানে পাঁচ প্রজাতির গন্ডার টিকে আছে। এর মধ্যে বাংলাদেশে তিন প্রজাতির গন্ডারের আবাস ছিল। এগুলো হলো-ভারতীয় এক শিংওয়ালা গন্ডার, বিশাল আকৃতির জাভান গন্ডার এবং সুমাত্রান গন্ডার। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থার (আইইউসিএন) সর্বশেষ লাল তালিকা অনুযায়ী বাংলাদেশ থেকে তিন প্রজাতির গন্ডারই আঞ্চলিকভাবে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

গবেষকদের মতে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বিস্তৃত গন্ডার ছিল ভারতীয় এক শিংওয়ালা গণ্ডার। এটি ব্রহ্মপুত্র, যমুনা ও সুরমা অববাহিকার বিস্তীর্ণ তৃণভূমি, জলাভূমি ও নদীর তীরবর্তী বনে বিচরণ করত। অন্যদিকে জাভান গণ্ডারের আবাসস্থল ছিল সুন্দরবন, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বনাঞ্চলে। এছাড়া দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ি বনে সুমাত্রান গন্ডার বিচরণ করত বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক নথিতে উল্লেখ আছে। বর্তমানে বাংলাদেশের বন্য পরিবেশে আর কোনো গণ্ডারের অস্তিত্ব নেই।

ঐতিহাসিক নথি বলছে, উনিশ শতক ছিল বাংলাদেশের গন্ডারের জন্য সবচেয়ে ভয়াবহ সময়। ব্রিটিশ শাসনামলে ইউরোপীয় শিকারিদের কাছে গন্ডার ছিল ট্রফি শিকারের অন্যতম আকর্ষণ। ট্রফি শিকার হলো নিজের বীরত্ব জাহির করা ও বিনোদনের নামে প্রাণী শিকার। তখন শিং, চামড়া ও হাড়ের জন্যও ব্যাপকহারে শিকার চলতে থাকে। একই সময়ে নদীঘেরা তৃণভূমি ও বনভূমি দ্রুত কৃষিজমি ও বসতিতে রূপান্তরিত হয়। ফলে গন্ডারের খাদ্য ও আবাসস্থল একসঙ্গে সংকুচিত হতে থাকে। বিচ্ছিন্ন ছোট ছোট দলে পরিণত হওয়ায় তাদের স্বাভাবিক প্রজননও ব্যাহত হয়। আইইউসিএন বাংলাদেশ-এর তথ্যানুযায়ী তিন প্রজাতির গন্ডারই বিংশ শতকের প্রথম ভাগের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে কার্যত হারিয়ে যায় এবং ১৯৩০-এর দশকের পর এ দেশে গন্ডারের দেখা পাওয়ার কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই।

তবে ইতিহাসে একটি ব্যতিক্রমী ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। সুমাত্রান গন্ডারের একটি স্ত্রী সদস্যকে ১৮৬৮ সালে চট্টগ্রামের বন থেকে জীবিত ধরে লন্ডনের চিড়িয়াখানায় পাঠানো হয়েছিল। ‘বেগম’ নামে পরিচিত সেই গন্ডারটি ১৯০০ সালে মারা যায়। এ ঘটনাটি বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়।

ব্রিটিশ আমলে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ও আশপাশের অঞ্চলে নির্বিচারে গন্ডার হত্যার নির্মম ও রোমহর্ষক অনেক ঘটনা উঠে এসেছে ঐতিহাসিক নানান দলিলে। ১৮৭৬ সালের ‘ওরিয়েন্টাল স্পোর্টিং ম্যাগাজিন’- এর একটি রেকর্ড অনুযায়ী, তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার ডুয়ার্স অঞ্চলে (যা বৃহত্তর রংপুর ও কোচবিহার সংলগ্ন বনাঞ্চল) এক ইউরোপীয় শিকারি এক দিনে ছয়টি গন্ডারকে গুলি করে হত্যা করেন এবং ২৫টির বেশি গন্ডারকে মারাত্মকভাবে আহত করেন।

১৮২৮ সালে ফরাসি প্রকৃতিবিদ ও শিকারি এফ ভি ল্যামারেপিকুয়া সুন্দরবনে প্রথম একটি জাভান গন্ডারকে গুলি করে হত্যা করেন। তিনি সেই গন্ডারের শরীরের বিভিন্ন অংশ ও চামড়া ট্রফি হিসেবে ফ্রান্সে নিয়ে যান। ১৮৯২ সালের পর সুন্দরবনে আর কোনো গন্ডারের দেখা মেলেনি।

১৮৭০-এর দশক থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিক পর্যন্ত বৃহত্তর রংপুর, দিনাজপুর এবং ভারতের কোচবিহার সংলগ্ন বনাঞ্চলে ব্রিটিশ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, লর্ড এবং ইউরোপীয় ব্যবসায়ীদের জন্য রাজকীয় শিকার ক্যাম্পের আয়োজন করা হতো। কোচবিহারের মহারাজা নৃপেন্দ্র নারায়ণের ‘গেম বুক’ (১৯০৮)-এর রেকর্ড অনুযায়ী, ব্রিটিশ অভিজাতদের খুশি করতে প্রতি বছর শত শত হাতি নিয়ে বনে গিয়ে গন্ডার ও বাঘ শিকার করা হতো। সাহসিকতার প্রতীক হিসেবে গন্ডারের মাথা ও শিং কেটে নিয়ে লন্ডনের বিভিন্ন ড্রয়িংরুমে বা জাদুঘরে রাখা হতো, যা বাংলাদেশে গন্ডার বিলুপ্তির অন্যতম প্রধান কারণ।

১৮০০ শতকের মাঝামাঝি সময়ে সিলেট, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহের পাহাড়ি বনাঞ্চলে ব্রিটিশ মিলিটারি অফিসার ও চা-বাগানের কর্মকর্তারা শখের বশে গন্ডার শিকার করতেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তাদের ডায়েরি এবং প্রশাসনিক রিপোর্টে দেখা যায়, গন্ডারের চামড়া দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রের ঢাল এবং শিং দিয়ে বিলাসবহুল পানপাত্র তৈরি করা হতো।

এসব ঘটনাই সাক্ষ্য দেয়, কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয় নয়, বরং ব্রিটিশ আমলের ‘ট্রফি হান্টিং’ এবং চামড়া-শিংয়ের তীব্র লোভই বাংলাদেশের বনাঞ্চল থেকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে গন্ডার নামক বিশালদেহী সুন্দর প্রাণীটিকে। অন্যদিকে প্রতিবেশী ভারতে কঠোর শিকারবিরোধী ব্যবস্থা, সংরক্ষিত তৃণভূমি এবং বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার ফলে আসামের কাজিরাঙা ও অন্যান্য সংরক্ষিত এলাকায় এক শিংওয়ালা গন্ডারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বর্তমানে ভারত ও নেপালে এ প্রজাতির সংখ্যা চার হাজারের বেশি, যা বিশ্বের অন্যতম সফল বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের উদাহরণ।

প্রাণিবিজ্ঞানীদের মতে, গন্ডার শুধু একটি প্রাণী নয়; এটি একটি ‘ইকোসিস্টেম ইঞ্জিনিয়ার’। ঘাস খেয়ে তৃণভূমির ভারসাম্য রক্ষা, ঝোপঝাড় নিয়ন্ত্রণ এবং বীজ ছড়িয়ে বন পুনর্জন্মে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই গন্ডারের বিলুপ্তি শুধু একটি প্রজাতির হারিয়ে যাওয়া নয়, বরং পুরো বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্যে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব। তারা বলছেন, বাংলাদেশের বনাঞ্চলে এখন গন্ডার ফিরিয়ে আনার মতো আবাসস্থল নেই। তবে হাতি, চিতা, বনরুইসহ যেসব স্তন্যপায়ী এখনো ধুকে ধুকে টিকে আছে, তাদের রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ না নিলে এ প্রাণীগুলোও ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে।

সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়