মনিরুল ইসলাম: রাত পোহালেই আগামীকাল ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল প্রত্যাশিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। ঐতিহাসিক এই নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে একটি নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ দীর্ঘ দুই দশক ধরে গণতান্ত্রিক শাসন থেকে বঞ্চিত ছিল। ২০০৬ সালের ১/১১-এ সেনাসমর্থিত মইন-ফখরুদ্দিনের জরুরি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে দেশ কার্যত গণতন্ত্রহীন হয়ে পড়ে। জরুরি সরকার দেশকে বিরাজনীতিকরণের পথে নিয়ে যায়। ২০০৮ সালে জরুরি সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনকে অনেকেই ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা একসময় বলেছিলেন, ১/১১-এর সরকার ছিল তাদের আন্দোলনের ফসল। পরবর্তীতে সেই সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৮৭ শতাংশ ভোটে বিজয়ী ঘোষণা পায়, যা অনেকের কাছে বিস্ময়কর মনে হয়েছিল। কিছু কেন্দ্রে ১০০ শতাংশ ভোট পড়ার ঘটনাও আলোচিত হয়।
২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারকে বিরোধীরা স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী হিসেবে আখ্যায়িত করে। তাদের অভিযোগ ছিল—গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আইনের শাসন দুর্বল হয়েছে এবং নির্বাচনী ব্যবস্থা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনকে বিরোধীরা ‘বিনা ভোটের নির্বাচন’, ২০১৮ সালের নির্বাচনকে ‘নিশি রাতের ভোট’ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনকে ‘আমি-ডামি নির্বাচন’ বলে উল্লেখ করে থাকে।
তবে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ৩৬ দিনের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে। শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করেন। পরবর্তীতে নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। গত দেড় বছরে বিভিন্ন সংস্কার উদ্যোগের পর ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন আয়োজন করা হচ্ছে।
জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ড. ইউনূস বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি সারা জাতির বহু আকাঙ্ক্ষিত দিন। এই নির্বাচন গণতান্ত্রিক যাত্রার একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হবে। তিনি আরও বলেন, দীর্ঘ ২০ বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশের আকাশে আবার গণতন্ত্রের সূর্য উদিত হতে যাচ্ছে। ১৫ বছরের ‘নির্বাচনি স্বৈরতন্ত্রের’ পর এবারই প্রথম সাধারণ মানুষ তাদের পছন্দের প্রতিনিধি নির্বাচনের সুযোগ পাচ্ছেন।
জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি ‘জুলাই সনদ’ বা সংবিধান সংস্কার বিষয়ে একটি গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে।
এবারের নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে শেরপুর-৩ আসনে একজন প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে ভোট স্থগিত থাকায় ২৯৯টি আসনে ভোটগ্রহণ হবে। মোট ৪২,৯৫৮টি কেন্দ্রে সকাল ৭টা ৩০ মিনিট থেকে বিকেল ৪টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলবে। নির্ধারিত সময়ের পরও লাইনে থাকা ভোটারদের ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকবে।
নির্বাচনে ৫০টি রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ মোট ২,০২৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে ৮১ জন নারী প্রার্থী। দেশে মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখের বেশি। এর মধ্যে প্রায় ৬ কোটি ৪৮ লাখ পুরুষ এবং প্রায় ৬ কোটি ২৮ লাখ নারী ভোটার।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, প্রায় ৫০ শতাংশ কেন্দ্রকে সাধারণ এবং বাকি ৫০ শতাংশ কেন্দ্রকে গুরুত্বপূর্ণ বা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এবার যুক্ত হয়েছে ড্রোন, বডি-ক্যাম ও সিসিটিভি ক্যামেরা। প্রায় ৯ লাখ ৫৮ হাজার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। এছাড়া ২,১০০ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং ৬৫৭ জন বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট মাঠে থাকবেন। প্রায় ২৫ হাজার বডি-ওয়ার্ন ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে এবং ৯০ শতাংশের বেশি কেন্দ্রে সিসিটিভি স্থাপন করা হয়েছে। প্রথমবারের মতো ড্রোন নজরদারিও চালু করা হচ্ছে।
পোস্টাল ভোটের জন্য ৭ লাখ ৩ হাজার ব্যালট ইতোমধ্যে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছেছে। অবশিষ্ট ব্যালটও সময়মতো পৌঁছাবে বলে আশা প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন।
এবারের নির্বাচনে দুটি আলাদা ব্যালট ব্যবহার করা হবে—সাদা ব্যালট জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য এবং গোলাপি ব্যালট গণভোটের জন্য। দুটি ব্যালটের ফলাফল একসঙ্গে গণনা ও প্রকাশ করা হবে, যাতে বিভ্রান্তি এড়ানো যায়।
নির্বাচন পর্যবেক্ষণে থাকছেন প্রায় ৪৫ হাজার পর্যবেক্ষক ও প্রায় ১০ হাজার সাংবাদিক। এর মধ্যে ৪৫,৩৩০ জন দেশীয় পর্যবেক্ষক, প্রায় ৩৫০ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক এবং দেশি-বিদেশি মিলিয়ে ৯,৭০০ জন সাংবাদিক রয়েছেন। তাদের মধ্যে ১৫৬ জন বিদেশি সাংবাদিক।
ভোটকেন্দ্রে সাংবাদিকরা ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে পারবেন। তবে গোপন কক্ষে প্রবেশ, লাইভ সম্প্রচার এবং ভোটার সাক্ষাৎকার গ্রহণ নিষিদ্ধ। ভোটারদের জন্য গোপন কক্ষে মোবাইল ফোন ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।