ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত গোটা বাংলাদেশ। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটাধিকার প্রয়োগ করবে বাংলাদেশিরা। সরকার ও নির্বাচন কমিশন (ইসি) দাবি করছে, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন, প্রশাসনিক প্রস্তুতি ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতি সুশৃঙ্খল নির্বাচন প্রক্রিয়ার ইঙ্গিতই দিচ্ছে।
এই দৃশ্যমান শৃঙ্খলার আড়ালে একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যায়, এই নির্বাচন কি সত্যিই সব নাগরিকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারছে।
মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, ভোটারদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ভোট দিতে পারবে না। বিশেষ করে দেশের অভ্যন্তরে স্থানান্তর হওয়ারা। এর মধ্যে রয়েছে কাজের উদ্দেশে বাড়ি ছাড়া নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী, পড়ালেখার উদ্দেশ্যে বাড়ি ছাড়া শিক্ষার্থী ও জলবায়ু পরিবর্তনে স্থানান্তর হওয়া বাংলাদেশিরা।
রাজধানীর পূর্ব রাজাবাজার মসজিদ এলাকায় বাস করেন ৪৫ বছর বয়সী আসমা বেগম। কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জের এই নারী রাজধানীতে থাকেন স্বামী ও তিন মেয়েকে নিয়ে। বাসাবাড়িতে কাজ করেন আসমা। আর তার স্বামী চালান রিকশা। তবে, শারীরিক অসুস্থতার জন্য দীর্ঘসময় রিকশা চালাতে পারেন না তিনি।
ভোট নিয়ে তার কাছে জিজ্ঞাসা করা হলে আসমা বলেন, “ভোট দিতে হলে গ্রামের বাড়িতে যেতে হবে। পাঁচ জনের গ্রামের বাড়িতে যেতে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা লাগবে। আমাদের মতো পরিবারগুলোর এ টাকা খরচ করা অসম্ভব।”
এই নারী আরও বলেন, “পরিবার দৈনন্দিন খরচ চালাতে প্রায়শ হিমশিম খেতে হয়। আর ঢাকায় সন্তানদের রেখে একা যাওয়া আমার পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়।” ভোট আমাদের কোনও পরিবর্তন আনবে না জানিয়ে আসমা বলেন, “সরকার আসে সরকার যায়, কিন্তু আমাদের মতো মানুষদের অবস্থা একই থাকে। প্রার্থীরা নির্বাচনের আগে অনেক প্রতিশ্রুতি দিলেও পরে তারা পূরণ করে না।”
কাজের জন্য ময়মনসিংহের বাসিন্দা আব্দুল কাইয়ুম থাকেন রাজধানী ঢাকায়। রিকশা চালানো এ ব্যক্তির স্ত্রী ও তিন সন্তান থাকেন গ্রামের বাড়িতেই। খরচ কমাতেই স্ত্রী ও সন্তানদের গ্রামের বাড়ি রেখেছেন তিনি। ভোট দিতে যাবেন কিনা এখনও তা নির্ধারণ করতে পারেননি কাইয়ুম। তিনি বলেন, “ভোটের দিন ঢাকায় যাত্রীর সংখ্যা বাড়ে। আয়ও বেশি হয়। যদি আমি বাড়ি যাই আমার যাওয়ার খরচ কে দেবে। একদিনের আয়ও পাবো না।”
কাইয়ুম জানান, অনেক দিন পর পর তিনি বাড়িতে যান। আর বাড়িতে গেলে সবার জন্য কিছু না কিছু ও টাকা নিয়ে যেতে হয়। ঈদ বাদে তিনি তেমন বাড়িতে যান না।
অনেক দিনমজুরের কাছে ভোট দেওয়ার নাগরিক দায়িত্ব কঠিন সমঝোতার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সিলেটে প্রাণ আরএফএল গ্রুপে চাকরি করা চুয়াডাঙ্গার একজন জানান, ভোট দিতে হলে অন্তত দু’দিনের ছুটি প্রয়োজন তার। কিন্তু নিয়োগকর্তা এ ছুটি দেবেন কিনা সংশয় রয়েছে। বেসরকারি এ চাকরিজীবী বলেন, “যদি দেশের অভ্যন্তরে পোস্টাল ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা থাকতো তাহলে অবশ্যই আমি ভোট দিতাম। তবে, এই সুযোগ নেই।”
রাজশাহীর ভোটার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শামসুদ্দোজা। থাকেন ঢাকায়। প্রথমবারের মতো ভোটার হওয়া এ শিক্ষার্থী ভোট দিতে পারবেন না অ্যাকাডেমিক কারণে। শামসুদ্দোজা বলেন, “ফেব্রুয়ারির ১০ তারিখ পর্যন্ত আমার ক্লাস ও পরীক্ষা ছিল। ভোট দিতে যাওয়ার জন্য যে অর্থ খরচ হবে সেটি ব্যয় করা আমার পক্ষে সম্ভব না। এসব সমস্যা আমাকে ভোটের অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে।”
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এভাবে তরুণ ভোটারদের বঞ্চনা করা হলে এটি দীর্ঘমেয়াদি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াগুলোতে তাদের অংশগ্রহণ কমিয়ে দিতে পারে।
এদিকে, কিছু পোশাক কারখানা ও শিল্প ইউনিট নির্বাচনের সময়ের আশপাশে বন্ধ রাখার ঘোষণা করেছে। তবে মজুরি, হাজিরা ও চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে শ্রমিকদের। খরচ বা বরখাস্তের ভয়ে অনেক শ্রমিক ভোট দিতে বাড়ি যাওয়ার বদলে শহরে থাকাকেই বেছে নিচ্ছেন।
বরিশালের ভোলার বাসিন্দা সোনিয়া বেগম থাকের রাজধানী আদাবরের ৯ নম্বর রোডে। গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করা এ নারী জানান, ভোট দিতে বাড়িতে যাওয়ার মতো খরচ করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি বলেন, “আমরা গরিব মানুষ। ভোট না দিলে আর কি হবে। আমি শুধু ঈদেই বাড়ি যাই।
আদাবরের শনিরবিল বস্তিতে থাকেন মানিক মিয়া। সবজি বিক্রি করা এই ব্যক্তি ও তার স্ত্রী ময়মনসিংহের ভোটার। ভোটের জন্য এ দম্পতিও বাড়ি যাবে না। মানিক মিয়া বলেন, “ভোটকেন্দ্র নিয়ে ভয়ে আছি। ভোট দিতে বাড়িতে যেতে অনেক টাকা খরচ হবে। ভোটের দিন ঘরেই থাকবো। কী হবে কে জানে।”
একই ধরনের কথা জানিয়েছেন আদাবরের চা বিক্রেতা আক্কাস আলি। দিনাজপুরের এ বাসিন্দা বলেন, “বাড়িতে যেতে অন্তত এক হাজার টাকা খরচ হবে। শুধুমাত্র ভোট দিতে এত টাকা খরচ করবো? আমার তিন সন্তান। যদি একদিন আয় বন্ধ করি তাদের খাওয়াবো কী।”
আক্কাস আরও বলেন, “নির্বাচনের আগে অনেক প্রার্থীর বক্তব্য শুনি, এমপি-মন্ত্রী হলে তারা কী করবে। কিন্তু ভোটের পর তারা আর কেউ আমাদের মনে রাখে না।”
অর্থনীতিবিদদের মতে, নির্বাচনের মূল্যায়ন কেবল শান্তিপূর্ণ পরিবেশের ভিত্তিতে করা উচিত নয়। পাশাপাশি অন্তর্ভুক্তি নির্বাচন নিশ্চিত করাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
বিদেশে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশি ও সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য পোস্টাল ব্যালট চালু করা হলেও দেশের অভ্যন্তরে স্থানান্তর হওয়া লাখ লাখ লোকের ভোটাধিকার প্রয়োগ নিয়ে সরকার কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। একজন অর্থনীতিবিদ বলেন, “এটা শুধুমাত্র লজিস্টিক গ্যাপ না। এটি নীতিগত দূরদর্শিতার অভাবকে প্রতিফলিত করছে।”
এর আগে ব্র্যাকের অভিবাসন প্রোগ্রাম এক নোটে জানিয়েছিল, বাংলাদেশের ত্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ অভিবাসন ভোটার নিবন্ধন ও ভোট প্রদানের ব্যবস্থার তাৎক্ষণিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা পরিলক্ষিত করে। সংস্থাটি বলেছিল, “নির্বাচনি ব্যবস্থার ফাঁকফোকরে নাগরিকদের একটি বড় অংশ রাজনৈতিক অংশগ্রহণ থেকে কাঠামোগতভাবে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।”
টিআইবির সিনিয়র রিচার্স ফেলো শাহাজাদ এম আকরাম বলেন, “ভোটারদের অংশগ্রহণ বাড়াতে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থায় পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। এটি একটি ভালো উদ্যোগ, তবে আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় এখনও সীমিত। ভবিষ্যতে এই ব্যবস্থাটি অভ্যন্তরীণ স্থানান্তর ভোটারদের ক্ষেত্রেও সম্প্রসারিত করা উচিত, যাতে নাগরিকরা দেশের যেকোনও স্থান থেকে ভোট দিতে পারে।” সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন