মনজুর এ আজিজ: সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়বে বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, গ্যাস সরবরাহ ২ হাজার ৩২২ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে বাড়িয়ে ২ হাজার ৬৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে উন্নীত করতে চাচ্ছে পেট্রোবাংলা। মতান্তরে ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে ৩০ আগস্ট দেশীয় উৎস থেকে ১ হাজার ৬১০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং আমদানিকৃত এলএনজি থেকে ৭১২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ দেওয়া হয়েছে। সেপ্টেম্বরে আমদানিতে থেকে ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহের প্রস্তুতির তথ্য পাওয়া গেছে।
এ জন্য ১০ কার্গো এলএনজি আমদানি করা হবে। ইতোমধ্যে ৮ কার্গো এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত হয়েছে। আরও ২ কার্গো আমদানির জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। একটি ৮ সেপ্টেম্বর, অপরটি ২৫ সেপ্টেম্বরের তালিকায় রাখার কথা জানিয়েছে পেট্রোবাংলা। রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি (আরপিজিসিএল) সূত্র জানিয়েছে, সরবরাহ নিশ্চিত করতে সবগুলো চড়াদামে আমদানি করতে হচ্ছে। ৮ এবং ২৫ সেপ্টেম্বর কার্গো নিশ্চিত করতে পারলে সেপ্টেম্বরে কোন সংকট থাকছে না।
ইতোমধ্যে নিশ্চিত করা ৮ কার্গোর মধ্যে ২ সেপ্টেম্বর সৌদি আরামকো (প্রতি এমএমবিটিইউ ২৩.৯৩ ডলার) ৪ সেপ্টেম্বর বিটিশ পেট্রোলিয়াম (২১.৭৭ ডলার) ১০ সেপ্টেম্বর আরামকো (২৪.৩৫ ডলার), ১৩ সেপ্টেম্বর কোরিয়ান কোম্পানি পসকো ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশন (২৪.৬২ ডলার), মার্কিন কোম্পানি গানভর (২৪.২৯ ডলার) ১৯ সেপ্টম্বর আরামকো (২৪.৩৩ ডলার) যুক্তরাজ্যের টোটাল এনার্জিস গ্যাস অ্যান্ড পাওয়ার লিমিটেড (২৪.২৫ ডলার), আর ২৯ সেপ্টেম্বর গানভর (২৪.২৯ ডলার) এক কার্গো সরবরাহ দেবে।
৮ সেপ্টেম্বরের বিষয়টি নিশ্চিত না হওয়ায় বর্তমানে কমিয়ে গ্যাস সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে। কার্গোটির নিশ্চিয়তা পেলে সরবরাহ বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে পেট্রোবাংলা। আর যদি তা না হয়, তাহলে ১০ তারিখ নাগাদ সরবরাহ অনেকটা উন্নতি হবে। তবে দেশীয় উৎপাদন অনেক কমে যাওয়ায় পূর্বের অবস্থায় ফেরার সুযোগ ক্ষীণ।
ইরান যুদ্ধের পর এমনিতেই সংকটের মধ্যদিয়ে যাচ্ছিল গ্যাস খাত। এরই মধ্যে ২১ জুলাই মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির এফএসআরইউ (ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল)-এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় বেসামাল হয়ে পড়েছে। প্রথমত অগ্নিকান্ডের কারণে সংকট শুরু হয়, কয়েক সপ্তাহ পরে এফএসআরইউ মেরামত হলে শুরু হয় কার্গো সংকট।
এলএনজির নির্ভরযোগ্য উৎস ছিল কাতার এবং ওমান থেকে জিটুজি ভিত্তিতে আমদানি। কিন্তু হরমুজ প্রণালি বন্ধের কারণে কাতার ও ওমান থেকে এলএনজি পাওয়া যাচ্ছে না। যে কারণে স্পর্ট মার্কেট থেকে দ্বিগুন দামে কিনতে হচ্ছে। আগস্টে ডিপিএম পদ্ধতিকে ৪ কার্গো এলএনজি আমদানির আদেশ দেওয়া হয়। যেগুলো কোনটাই দেশে আসেনি, যে কারণে মারাত্মক গ্যাস সংকট চলছে। এতে শিল্প থেকে শুরু করে, আবাসিক, সার ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে ভয়াবহ ঘাটতি বিরাজ করছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে ২ হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে গ্যাস সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে ৭০০ থেকে ৯০০ মিলিয়নের মতো। এ কারণে বিদ্যুতের ভয়াবহ লোডশেডিং শুরু হয়েছে দেশজুড়ে।
একদিকে যখন আমদানি কমেছে, তখন দেড় মাসে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমেছে ৪৬ মিলিয়ন ঘনফুট। যে কারণে আমদানি বাড়লেও সহসা পূর্বের অবস্থায় ফেরা কঠিন মনে করা হচ্ছে।
দেশীয় উৎপাদন কমতে থাকায় ২০১৮ সালে এলএনজি আমদানি শুরু করা হয়। এ জন্য দু’টি এফএসআরইউ (ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল) স্থাপন করা হয়েছে। যা দিয়ে দৈনিক সর্বোচ্চ ১১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব। আরও একাধিক এফএসআরইউ এবং একটি ল্যান্ডবেজড টার্মিনাল স্থাপনের আলোচনা চলছে কয়েক বছর ধরে। সঙ্গে সমান্তরাল পাইপলাইন স্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি।
এলএনজি পাওয়া নিয়ে যখন সংকট, তখন আকাশচুম্বী দর মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে বাংলাদেশকে। জিটুজি ভিত্তিতে কমবেশি ১০ ডলারের আমদানি হতো, সেই এলএনজি এখন ২১ থেকে ২৮ ডলার দিয়ে কিনতে হচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাস (জুন-মার্চ) গড় ক্রয়মূল্য পড়েছে ২৭.৬৪ টাকা। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর (এপ্রিল-জুন ২০২৬) গড় ক্রয়মূল্য উঠেছে ৪৫.৭৯ টাকায়। ওই ৩ মাস গড় বিক্রয়মূল্য ২৩.৬৩ টাকায় বিক্রি করায় প্রতি ঘনমিটারে ঘাটতি হয়েছে ২১.৮২ টাকা। এতে করে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পেট্রোবাংলার ঘাটতি হয়েছে প্রায় ১৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। বাড়তি দামে আমদানির কারণে চলতি অর্থবছরে ভর্তুকি কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা করা হচ্ছে।