শিরোনাম
◈ তারেক রহমানের সম্ভাব্য সফর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে: সাবেক কূটনীতিক ◈ সড়ক আইন ভাঙলে যাত্রী-পথচারীকেও জরিমানা, আসছে নতুন আইন ◈ শুক্রবার থেকে এমপিও শিক্ষকদের বদলির আবেদন, চলবে ২৭ আগস্ট পর্যন্ত ◈ অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে নতুন উদ্যোগ, বাংলাদেশ থেকে বিদেশে কর্মী পাঠানোর পুরো প্রক্রিয়া অনলাইনে করার উদ্যোগ ◈ চোরাচালান ও আটক পণ্য নিষ্পত্তিতে এনবিআরের নতুন আদেশ জারি ◈ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেননি কেউ, ভোট বৃহস্পতিবার: ইসি সচিব ◈ সমাজের সবাই এগিয়ে এলে অনেক বড় সমস্যার সমাধান করা সম্ভব: প্রধানমন্ত্রী ◈ সরকার কেন পাল্টালো অর্থবছরের সময়কাল, কি সুবিধা মিলবে? ◈ সরকারি চাকরি জনগণের সেবা করার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ: আইনমন্ত্রী ◈ কোন-কোন রুটে চলবে পিংক বাস, ভাড়া কত

প্রকাশিত : ১৮ আগস্ট, ২০২৬, ০৯:৩৩ রাত
আপডেট : ১৮ আগস্ট, ২০২৬, ১০:০০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

চুলা থেকে কারখানা: গ্যাস সংকটে বিপর্যস্ত অর্থনীতি ও জনজীবন 

মনজুর এ আজিজ : মারাত্নক গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে দেশের বিভিন্ন খাতে। কোনোভাবেই এ সংকট থেকে রেহাই পাচ্ছেন না দেশের সব শেণি-পেশার মানুষ। রান্নাঘর থেকে শুরু করে শিল্পকারখানা, সিএনজি স্টেশন, বিদ্যুৎকেন্দ্র-সবখানেই এখন গ্যাসের ঘাটতি। কোথাও দিনের বেশির ভাগ সময় চুলা জ্বলে না, কোথাও গাড়ির গ্যাস নিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে, আবার কোথাও জ্বালানি না পেয়ে কারখানার উৎপাদন কমে যাচ্ছে বা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফলে গ্যাসের সংকট ধীরে ধীরে জনদুর্ভোগের পাশাপাশি উৎপাদন ও অর্থনীতির সংকটেও রূপ নিচ্ছে।

রাজধানীর বহু আবাসিক এলাকায় নিয়মিত গ্যাস বিল পরিশোধ করেও গ্রাহকরা কাক্সিক্ষত সেবা পাচ্ছেন না। ভোরে সামান্য গ্যাস মিললেও সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত অনেক এলাকায় চুলায় আগুন থাকছে না। সন্ধ্যায় কিছু সময় চাপ ফিরলেও রাতের দিকে আবার কমে যাচ্ছে। ফলে অনেক পরিবারকে রান্নার জন্য গভীর রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। কেউ বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করছেন, কেউ বাড়তি খরচে বাইরের খাবার কিনছেন। নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর ওপর এই সংকটের চাপ আরও বেশি। বিশেষকরে  সিএনজি চালকরা ভাড়া মারতে না পেরে অনাহারে-অর্ধাহারে দিনতিপাত করছেন।

জানা যায়, গ্যাসের সংকট শুধু রান্নাঘরেই থেমে নেই। রাজধানীর সিএনজি স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন এখন নিত্যদিনের চিত্র। চালকদের অনেকেই দিনে ৪ থেকে ৭ ঘণ্টা পর্যন্ত গ্যাসের জন্য অপেক্ষা করছেন। অথচ ১৪ ঘণ্টার কর্মদিবসের বড় একটি অংশ যদি জ্বালানি সংগ্রহেই চলে যায়, তাহলে যাত্রী পরিবহনের সময় কমে যায়। এতে আয় নেমে আসছে, কিন্তু গাড়ির মালিকের দৈনিক জমা, কিস্তি ও অন্যান্য খরচ একই রাখছে। ফলে গ্যাস সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে চালকদের জীবিকায় এবং যাত্রী পরিবহন ব্যবস্থায়।

শিল্প খাতেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। চট্টগ্রাম অঞ্চলে গ্যাসের প্রকৃত দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে বর্তমানে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে গড়ে ১৯০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় ঘাটতি প্রায় ৪৫ দশমিক ৭১ শতাংশ। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় রড, স্টিল, পোশাক, জাহাজভাঙা ও বিভিন্ন শিল্পকারখানায় উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমেছে। কোনো কোনো কারখানায় উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।

গ্যাসের ঘাটতির কারণে কারখানার নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে একটি সংকট আরেকটি সংকটকে বাড়িয়ে দিচ্ছে গ্যাস না থাকায় কারখানার উৎপাদন কমছে, উৎপাদন কমায় ব্যবসায়িক ক্ষতি বাড়ছে, আবার বিদ্যুৎ উৎপাদনেও চাপ তৈরি হচ্ছে। চট্টগ্রামের কয়েকটি বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে উৎপাদন বন্ধ বা ব্যাপকভাবে কমিয়ে দেওয়ার কথা জানিয়েছে।

এ পরিস্থিতির প্রভাব বিদ্যুৎ খাতেও পড়ছে। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পর্যাপ্ত জ্বালানি না পাওয়ায় সব কেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। একই সময়ে বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়ছে। রাত ১২টার পরও প্রায় ১৮ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ চাহিদার কথা জানিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। সরকার বলছে, এলএনজি টার্মিনাল ও কারিগরি সমস্যার কারণে তৈরি সংকট মোকাবিলায় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি নতুন এফএসআরইউ স্থাপন ও দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।

তবে প্রশ্ন উঠছে, সংকটের তাৎক্ষণিক সমাধান কতটা সম্ভব এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে। এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়িয়ে সাময়িকভাবে সরবরাহ সামাল দেওয়া গেলেও আন্তর্জাতিক বাজারে দাম, আমদানি ব্যয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হয়। এ কারণে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে দ্রুত বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।

অন্যদিকে শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্নের কারণে উৎপাদন কমে গেলে শুধু কারখানার মালিকই ক্ষতিগ্রস্ত হন না; এর সঙ্গে রপ্তানি, কর্মসংস্থান, ব্যাংক ঋণ পরিশোধ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও জড়িয়ে থাকে। চট্টগ্রাম চেম্বার ইতোমধ্যে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ঋণের সুদ ও বিল পরিশোধে বিশেষ সুবিধার দাবি জানিয়েছে।

সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে সংকটের আরেকটি দিক হলো জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি। পাইপলাইনের গ্যাস না থাকায় বিকল্প জ্বালানি কিনতে হচ্ছে, বাইরে থেকে খাবার আনতে হচ্ছে, আবার সিএনজি সংকটে পরিবহন ব্যয়ও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। অর্থাৎ গ্যাসের ঘাটতি সরাসরি মানুষের দৈনন্দিন খরচের ওপর চাপ তৈরি করছে। সব মিলিয়ে বর্তমান গ্যাস সংকটের চিত্রটি একটি বহুমাত্রিক সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। রান্নাঘরে চুলা জ্বলছে না, সিএনজি স্টেশনে গাড়ির সারি দীর্ঘ হচ্ছে, চালকের কর্মঘণ্টা নষ্ট, কারখানার উৎপাদন কম এবং গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রও পড়ছে চাপের মুখে। দ্রুত সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা না গেলে এর প্রভাব জনজীবনের পাশাপাশি উৎপাদন, কর্মসংস্থান, পরিবহন ও বাজারব্যবস্থায় আরও গভীর হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় অংশ গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল। গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়া এসব কেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা কমে গেছে। ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। একই সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায়  পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে গ্যাসের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। অন্যদিকে মজুত কমে যাওয়ায় দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন প্রতিনিয়ত কমছে। ফলে বাড়তি চাহিদা সামাল দিতে কয়েক বছর ধরেই চাপে রয়েছে পেট্রোবাংলা। একসময় দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে দৈনিক প্রায় ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হলেও বর্তমানে তা নেমে এসেছে ১ হাজার ৬২০ মিলিয়ন ঘনফুটে। সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করেছে দেশের অন্যতম বড় গ্যাসক্ষেত্র বিবিয়ানার উৎপাদন কমে যাওয়া।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশের মোট গ্যাস সরবরাহের প্রায় ৪৫ শতাংশ এবং কনডেনসেটের প্রায় ৬৮ শতাংশ বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র থেকে আসে। একসময় এই ক্ষেত্র থেকে দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হলেও গত ১৫ আগস্ট তা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭৪০ মিলিয়ন ঘনফুটে। মজুত কমে যাওয়ায় বিবিয়ানার উৎপাদন দ্রুত কমছে। ফলে যেকোনো সময় দেশীয় গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের ধস নামতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে এক অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎ-গ্যাস সমস্যা সমাধানে দুই বছর সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট এই তিন খাত অর্থনীতির অগ্রগতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই সরকার দ্রুততম সময়ে পরিস্থিতির উন্নতির চেষ্টা করছে।

আমির খসরু বলেন, বর্তমান সরকার যে অর্থনীতি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে, সেখানে আর্থিক খাত, অবকাঠামো, বিদ্যুৎ ও গ্যাসসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমস্যা রয়েছে। এসব সমস্যা ছয় মাস বা এক বছরের মধ্যে সমাধান করা সম্ভব নয়। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ক্ষেত্রে ন্যূনতম দুই বছর সময় লাগতে পারে।

বিদ্যুৎ ও গ্যাসের পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন ও শক্তিশালী ইন্টারনেটকে অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ার লক্ষ্য অর্জন করতে হলে দেশের সব নাগরিকের কাছে প্রযুক্তির সুবিধা পৌঁছাতে হবে। এ জন্য শক্তিশালী ইন্টারনেট অবকাঠামো প্রয়োজন। বিদ্যুৎ খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের সমন্বয়ে একটি জ্বালানি মিশ্রণ নিয়ে সরকার কাজ করছে বলেও জানান অর্থমন্ত্রী। গ্যাসের ক্ষেত্রে এফএসআরইউ ও স্থলভিত্তিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা নিয়ে সিদ্ধান্ত শিগগিরই জানানো হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়