ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পোশাক বাজারে বড় ধরনের পতনের মুখে পড়েছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) ইইউভুক্ত দেশগুলোতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৯.২৬ শতাংশ কমেছে।
একই সঙ্গে কমেছে পোশাক রপ্তানির পরিমাণ এবং ইউনিট প্রাইস বা গড় একক মূল্য।
ইউরোপীয় পরিসংখ্যান অফিস ‘ইউরোস্ট্যাট’-এর সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সামগ্রিকভাবে বিশ্ববাজার থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পোশাক আমদানি কমেছে।
তবে প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের রপ্তানি পতনের হার অনেক বেশি উদ্বেগজনক।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় মোট রপ্তানি আয়, পরিমাণ এবং দামের দিক থেকে বেশ পিছিয়ে পড়েছে বাংলাদেশ।
প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে ইইউ থেকে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ছিল ৫৬৮ কোটি ৭০ লাখ ৬০ হাজার ইউরো, যা ২০২৬ সালের একই সময়ে ১৯ দশমিক ২৬ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৪৫৯ কোটি ১৫ লাখ ৫০ হাজার ইউরোতে। বিপরীতে এই সময়ে প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে চীনের রপ্তানি আয় কমেছে ৭ দশমিক ৯০ শতাংশ এবং তুরস্কের কমেছে ১৮ দশমিক ৯২ শতাংশ।
গত বছরের প্রথম প্রান্তিকে ইইউতে বাংলাদেশ থেকে ৩৬ কোটি ২০ লাাখ কেজি পোশাক রপ্তানি হয়েছিল, সেখানে চলতি বছরের একই সময়ে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ কমে পোশাক রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ৩৩ কোটি ১৮ লাখ ৬০ হাজার কেজিতে। এই তিন মাসে ইইউ-তে চীনের পোশাক সরবরাহের পরিমাণ (কেজিতে) কমেছে ১ দশমিক শুন্য ২ শতাংশ এবং তুরস্কের কমেছে ২০ দশমিক ১৪ শতাংশ।
গত বছরের তুলনায় প্রতি কেজি পোশাকে বাংলাদেশের গড় রপ্তানি মূল্য কমেছে ১১ দশমিক ৯৩ শতাংশ। গত বছর এই সময়ে ইউনিট প্রতি গড় মূল্য ছিল ১৫ দশমিক ৭১ ইউরো, যা এবার কমে দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ৮৪ ইউরোতে। অন্যদিকে, প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে চীনের ইউনিট প্রাইস কমেছে ৬ দশমিক ৯৫ শতাংশ ও ভারতের কমেছে ৬ দশমিক ২৮ শতাংশ; বিপরীতে তুরস্কের ইউনিট প্রাইস বেড়েছে ১ দশমিক ৫২ শতাংশ।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে বিশ্ববাজার থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সামগ্রিক পোশাক আমদানি কমেছে ১১ দশমিক ৬২ শতাংশ। এই সময়ে বিশ্বব্যাপী ইইউ-এর মোট আমদানি ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ১০৮ কোটি ৮৩ লাখ ৮০ হাজার ইউরো। শীর্ষ সরবরাহকারী দেশ চীনের রপ্তানি আয় ৭ দশমিক ৯০ শতাংশ কমলেও (আয় ৬১৪ কোটি ৩৪ লাখ ইউরো), তাদের তুলনায় বাংলাদেশের পতনের হার দ্বিগুণেরও বেশি। একই সময়ে অন্যান্য প্রতিযোগী দেশের মধ্যে ভারতের ১০ দশমিক ১৫ শতাংশ এবং পাকিস্তানের ১৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ রপ্তানি আয় কমেছে। তবে ভিয়েতনাম মাত্র ২ দশমিক ১২ শতাংশ নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির মধ্য দিয়ে নিজেদের অবস্থান অনেকটা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বৈশ্বিক বাণিজ্যের এই সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বাংলানিউজকে বলেন, ‘বিশ্বমন্দা এবং মুদ্রার ওঠানামার (কারেন্সি ফ্লাকচুয়েশন) প্রভাব যে কতটা গভীর, তা ইইউ-এর সামগ্রিক আমদানি কমে যাওয়ার পরিসংখ্যান থেকেই স্পষ্ট। এই ধাক্কা সব দেশের ওপর পড়লেও, উন্নত লজিস্টিকস ও কৌশলগত সুবিধার কারণে চীন ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো ধস সামলে নিজেদের অবস্থান তুলনামূলক ইতিবাচক রাখতে পেরেছে।’
তিনি আরও জানান, ইউরোপের সাথে চীনের যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং লজিস্টিকস কাঠামো অত্যন্ত উন্নত। একই সাথে তারা প্রথাগত ব্যবসা থেকে দ্রুত ই-কমার্সের দিকে নিজেদের শিফট করছে। ঠিক এই শক্তির কারণেই তারা বৈশ্বিক ধসের একটি বড় অংশ নিজেদের অনুকূলে ধরে রাখতে পেরেছে। অন্যদিকে, চীনের মতোই উন্নত সাপ্লাই চেইন ও লজিস্টিকস ব্যবস্থার সুবিধা নিয়ে বিশ্ববাজারে দ্রুত ব্যবসা ধরে রাখছে ভিয়েতনাম।
একক মাসেও হতাশা, বহুমাত্রিক সংকটে বাংলাদেশশুধু সামগ্রিক প্রান্তিকই নয়, একক মাস হিসেবে ২০২৬ সালের মার্চ মাসেও বাংলাদেশের পারফরম্যান্স ছিল অত্যন্ত হতাশাজনক। ২০২৫ সালের মার্চের (২১১ কোটি ৪১ লাখ ইউরো) তুলনায় ২০২৬ সালের মার্চে এককভাবে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আয় ১৯ দশমিক ২৪ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১৭০ কোটি ৭৩ লাখ ইউরোতে।
তৈরি পোশাক খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূলত তিনটি প্রধান কারণে দেশের তৈরি পোশাক খাতে এই বড় চাপ তৈরি হয়েছে:
১. যুদ্ধ ও ভূ-রাজনীতি: চলমান বৈশ্বিক যুদ্ধাবস্থার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং সামগ্রিক বিক্রি (Sales) কমছে।
২. উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি: দেশের অভ্যন্তরে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং পরিবহন লজিস্টিকস খরচ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে।
৩. মুদ্রার ওঠানামা: ইউরো ও ডলারের বিপরীতে স্থানীয় টাকার মানের ক্রমাগত পরিবর্তনের কারণে বিদেশি বায়ার এবং দেশীয় ম্যানুফ্যাকচারার—উভয় পক্ষই আর্থিক ঝুঁকিতে পড়েছেন।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতি কেজি পোশাকের ইউনিট প্রাইস প্রায় ১২ শতাংশ কমে যাওয়া থেকে বোঝা যায় বৈশ্বিক ক্রেতারা হয় বাংলাদেশি পোশাকের দাম কমিয়ে দিচ্ছেন, নয়তো বাংলাদেশ কম দামি পোশাক বেশি রপ্তানি করছে—যা দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় অর্থনীতির জন্য বড় উদ্বেগের কারণ। উৎস: বাংলানিউজ২৪