দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী চামড়াশিল্প এখন খাদের কিনারে। কুরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে যে বিশাল অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ আবর্তিত হতো, তা এখন পঙ্গুত্বের পর্যায়ে।
তীব্র মূলধন সংকটের সঙ্গে মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যসহ নানা কারণে দেশের অন্যতম প্রধান এই জাতীয় সম্পদ রক্ষায় ঈদের এক দিন আগেও নেই কোনো হাঁকডাক।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং চামড়াশিল্প সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কুরবানির কাঁচা চামড়ার বাজারে চরম ধস নামার আশঙ্কার পেছনে মূলত পাঁচটি বড় কারণকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এগুলো হচ্ছে-তীব্র তারল্য ও ব্যাংক ঋণ সংকট, সাভার চামড়া শিল্পনগরীর (বিসিক) ব্যর্থতা, লবণ ও কেমিক্যালের দাম বেড়ে যাওয়া, মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেটের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ এবং মৌসুমি ব্যবসায়ীদের অজ্ঞতা। পর্যাপ্ত ঋণ না পাওয়ায় নগদ টাকার তীব্র সংকটে ভুগছেন চামড়া ব্যবসায়ীরা। কাঁচা চামড়া কেনায় কয়েক বছর ধরেই ব্যাংক ঋণ বিতরণের পরিমাণ কমছে।
এ খাতের বেশির ভাগ ব্যবসায়ী খেলাপি হয়ে পড়ায় ব্যাংকগুলোর ঋণ দিতে অনীহা রয়েছে।
চামড়া খাতের সম্ভাব্য বিপর্যয় ঠেকাতে সরকারের পক্ষ থেকে এবারও নানামুখী তৎপরতা ও কঠোর অবস্থানের কথা জানানো হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় দেশের সব ডিসি, ইউএনও এবং পুলিশ প্রশাসনকে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে, যাতে কেউ চামড়া নিয়ে কারসাজি করতে না পারে। চামড়া পাচার রোধে বিজিবির নজরদারি জোরদার করার কথা বলা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, গত বছর থেকে ২ টাকা বাড়িয়ে এ বছর গরুর কাঁচা চামড়ার দর ঢাকার ভিতরে প্রতি বর্গফুট ৬২ থেকে ৬৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ঢাকার বাইরে গরুর কাঁচা চামড়ার প্রতি বর্গফুটের দাম ৫৭ থেকে ৬২ টাকা। এই হিসাবে গরুর চামড়ার দাম কমবেশি ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হওয়ার কথা। কয়েক বছর ধরে ৩ থেকে ৫০০ টাকার বেশি বিক্রি হচ্ছে না গরুর চামড়া।
অপরদিকে বকরির চামড়া কেউ কিনছেই না। বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন দেশের কাঁচা চামড়া সংগ্রহ ও প্রাথমিক প্রক্রিয়াজাতকারী ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন।
কুরবানির ঈদে সারা দেশ থেকে সংগৃহীত পশুর কাঁচা চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ, ও ট্যানারি মালিকদের কাছে বিক্রির মূল কাজটি এই সংগঠনের সদস্যরা নিয়ন্ত্রণ করেন।
এই সংগঠনের সাবেক সভাপতি আফতাব খান বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশ লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ আন্তর্জাতিক পরিবেশগত সনদ অর্জন করতে পারেনি। পাশাপাশি সাভারের ট্যানারিতে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার পরিপূর্ণভাবে কার্যকর না হওয়ায় এবং সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।
প্রতিবছরই কুরবানির আগে চামড়া কেনার জন্য বিশেষ ঋণ সুবিধা দেওয়ার ঘোষণা দেয়। সিংহভাগ ট্যানারি মালিক এই ঋণ পান না।
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সিনিয়র সহসভাপতি মো. শাখাওয়াত উল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণের অজুহাত দেখিয়ে টাকা দেয় না। সাভারে স্থানান্তরের পর থেকে অধিকাংশ ট্যানারি এমনিতেই লোকসানে চলছে। আড়তদাররা টাকা না পেলে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চামড়া কেনে না। ফলে কুরবানির চামড়ার বাজার অস্থির হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
উল্লেখ্য, এ বছর চামড়া সংরক্ষণে ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২২৮ কোটি টাকা, তবে শেষ পর্যন্ত বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ১০০ কোটির নিচে নেমে আসবে বলে খাতসংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন। সূত্র: যুগান্তর প্রতিবেদন