চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের খৈয়াছড়া ঝরনায় পৃথিবীতে নতুন এক প্রজাতির মেফ্লাই পাওয়া গেছে। এই ক্ষুদ্র জলজ পতঙ্গের আবিষ্কার বাংলাদেশের মিঠাপানির জীববৈচিত্র্যকে আরও সমৃদ্ধ করলেও পর্যটকদের ফেলে যাওয়া প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন ও খাবারের উচ্ছিষ্টে ঝরনার পানি ও আশপাশের পরিবেশ দূষিত হওয়ায় নতুন প্রজাতিটির টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় প্রাকৃতিক আবাসস্থল হুমকিতে পড়ছে।
নতুন এই প্রজাতিটির নাম দেওয়া হয়েছে ইফেমেরা প্রিমিটিভা। গত ৬ আগস্ট আন্তর্জাতিক প্রাণিবিষয়ক সাময়িকী 'জুট্যাক্সা'য় প্রকাশিত এক গবেষণায় প্রজাতিটির বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হয়। গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন চীনের নানজিং নরমাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক চ্যাংফা ঝৌ এবং একই বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অভ মেরিন সায়েন্সেসের সাবেক শিক্ষার্থী শিবলী সাদিক শশী।
পতঙ্গটির পরিচয় নিশ্চিত করতে গবেষকেরা এর বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য, জীবনচক্রের বিভিন্ন পর্যায়ের নমুনা ও ডিএনএ সিকোয়েন্স পরীক্ষা করেছেন। গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে ইফেমেরা গণের এটিই প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে নামকরণ করা প্রজাতি। এর আগে দেশে এই গণের একটি নমুনা পাওয়া গেলেও সেটির আনুষ্ঠানিক প্রজাতিগত পরিচয় নির্ধারণ করা হয়নি।
গবেষকেরা ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত কয়েক ধাপে খৈয়াছড়া ঝরনার নিচের প্রবাহ থেকে নমুনা সংগ্রহ করেন। ঝরনার ভাটিতে বালু ও পাথরযুক্ত তলদেশে পাওয়া যায় পতঙ্গটির নিম্ফ বা অপরিণত দশার নমুনা।
এই প্রজাতির গায়ের রং সাধারণত হালকা হলুদ থেকে সোনালি রঙের। শরীর, ডানা, পা ও উদরে রয়েছে বাদামি থেকে গাঢ় রঙের বিভিন্ন দাগ ও রেখা। পূর্ণাঙ্গ পুরুষ পতঙ্গের শরীরের দৈর্ঘ্য ১২ থেকে ১৫ মিলিমিটার এবং স্ত্রী পতঙ্গের দৈর্ঘ্য ১৩ থেকে ১৫.৫ মিলিমিটার।
পতঙ্গটির পরিচয় নিশ্চিত করতে গবেষকেরা ডানা ও পায়ের গঠন, উদরের দাগ এবং প্রজনন অঙ্গের মতো সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করেন। পাশাপাশি দুটি পুরুষ পতঙ্গের নমুনা থেকে মাইটোকন্ড্রিয়াল সিওআই ডিএনএর একটি অংশ বিশ্লেষণ করা হয়। এশিয়ার আরও আটটি ইফেমেরা প্রজাতির জিনগত তথ্যের সঙ্গে তুলনা করে নতুন প্রজাতিটির স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের প্রমাণ পান গবেষকরা।
পর্যটকদের বর্জ্যে হুমকির মুখে আবাসস্থল
গবেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, নমুনা সংগ্রহের স্থানটি খৈয়াছড়া ঝরনার নিচের দিকে এবং মানুষের বসতি থেকে কিছুটা দূরে। কিন্তু পর্যটকদের আনাগোনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিনের ব্যাগ ও খাবারের উচ্ছিষ্ট জমতে দেখা গেছে। নমুনা সংগ্রহের সময়ও এসব বর্জ্য চোখে পড়েছে।
শিবলী সাদিক শশী টিবিএসকে বলেন, পর্যটকেরা ঝরনার পানিতে প্লাস্টিকের বোতল ও পলিথিন ফেললে সেগুলো স্রোতের সঙ্গে ভেসে পতঙ্গটির আবাসস্থলে পৌঁছাতে পারে। এতে নিম্ফের স্বাভাবিক পরিবেশ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া পানিতে ফেলে দেওয়া খাবারের উচ্ছিষ্ট ও অন্যান্য বর্জ্য জলজ পরিবেশের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
গবেষণাটিতে খৈয়াছড়ার মতো পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে দূষণের কারণে প্রজাতিটির সংখ্যা কতটা কমেছে, কিংবা এটি ইতোমধ্যে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়েছে কি না, তা নির্ধারণের মতো পর্যাপ্ত জনসংখ্যাগত তথ্য গবেষণাপত্রে নেই। ফলে দূষণের সুনির্দিষ্ট প্রভাব ও প্রজাতিটির টিকে থাকার অবস্থা বুঝতে আরও পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।
মেফ্লাইয়ের জীবনচক্রের বড় অংশই কাটে বাংলাদেশে নদী, ছড়া, ঝরনা ও হ্রদের মতো স্বাদুপানির নিচে নিম্ফ অবস্থায়। নিম্ফ অবস্থায় কয়েক মাস থাকার পর পূর্ণাঙ্গ পতঙ্গে রূপ নেয়। পূর্ণাঙ্গ অবস্থায় এদের আয়ু খুবই কম—মাত্র কয়েক দিন। এ সময়ের মধ্যেই প্রজনন সম্পন্ন করে তারা জীবনচক্রের ইতি টানে।
মেফ্লাই স্বাদুপানির বাস্তুতন্ত্রের অংশ। পানির নিচে থাকা অবস্থায় তারা খাদ্যজালের সঙ্গে যুক্ত থাকে এবং অন্য জলজ প্রাণীর খাদ্য হিসেবেও ভূমিকা রাখতে পারে। তাই এদের আবাসস্থলের পরিবর্তন শুধু একটি ক্ষুদ্র পতঙ্গের জন্য নয়, সংশ্লিষ্ট জলজ পরিবেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তবে খৈয়াছড়ায় পাওয়া নতুন প্রজাতিটি স্থানীয় মাছের খাদ্য ও মানুষের খাদ্যনিরাপত্তায় ঠিক কী পরিমাণ ভূমিকা রাখে, তা নির্ধারণে আলাদা গবেষণা প্রয়োজন।
গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে নদী, ছড়া, ঝরনা ও হ্রদের মতো স্বাদুপানির পরিবেশ থাকলেও মেফ্লাই নিয়ে গবেষণা সীমিত। ভারত ও চীনে ইফেমেরা গণের বহু প্রজাতি শনাক্ত হয়েছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আরও নমুনা সংগ্রহ ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ করা গেলে দেশের জলজ পতঙ্গের বৈচিত্র্য সম্পর্কে নতুন তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
গবেষকেরা বলেন, নতুন শনাক্ত হওয়া এই প্রজাতির আবাসস্থল রক্ষা এবং জলজ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য জলাশয়ে প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলা বন্ধ করা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ঘটানো জরুরি।
সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড