এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার : ভোরের আলো ফোটার আগেই প্রস্তুত অটোভ্যান। তাতে সাজানো পুষ্টিকর খাবারের প্যাকেট। গন্তব্য সুন্দরবনসংলগ্ন বাগেরহাটের শরণখোলার একের পর এক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। কোথাও পাকা সড়ক, কোথাও কাদামাখা কাঁচা রাস্তা। আবার কোনো কোনো বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে পাড়ি দিতে হয় খাল-বিল, যেতে হয় নৌকায়। কোথাও ভ্যান থেকে নেমে খাবারের বাক্স মাথায় নিয়ে হাঁটতে হয় দীর্ঘ পথ।
বর্ষার বৈরী আবহাওয়া ও দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থার মধ্যেও এভাবেই প্রতিদিন বিদ্যালয়ে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে শিশুদের স্কুল ফিডিং কর্মসূচির খাবার। দুধ, বনরুটি, ডিম, কলা ও বিস্কুটের পুষ্টিকর টিফিন হাতে পেয়ে আনন্দে মেতে উঠছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বাড়ানো, ঝরে পড়া রোধ এবং শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রাখতে কর্মসূচিটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের শিশুদের বিদ্যালয়ে পাঠানোর আগ্রহ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষক ও অভিভাবকরা।
৭০-৭৫ শতাংশ থেকে উপস্থিতি ৯০ শতাংশের ওপরে
শরণখোলা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মুনীর আহমেদ জানান, উপজেলার ১১৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১১ হাজার ৮৩৪ জন শিক্ষার্থী স্কুল ফিডিং কর্মসূচির আওতায় পুষ্টিকর খাবার পাচ্ছে।
তিনি বলেন, কর্মসূচি চালুর আগে বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার ছিল প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ। বর্তমানে তা ৯০ শতাংশের ওপরে উঠেছে। কর্মসূচি চালুর পর বিভিন্ন বিদ্যালয়ে প্রায় ৪৫০ জন শিক্ষার্থী নতুন করে ভর্তি হয়েছে বলেও জানান তিনি।
মুনীর আহমেদ বলেন, “শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন উপস্থিতি, শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ এবং ঝরে পড়ার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। এতে শিশুদের পুষ্টির ঘাটতি কমার পাশাপাশি বিদ্যালয়ে উপস্থিতি, ভর্তি এবং শিক্ষার ধারাবাহিকতা আরও শক্তিশালী হবে।”
দুর্গম পথেও থেমে নেই খাবার পৌঁছে দেওয়া
শরণখোলার দক্ষিণখালী ইউনিয়নের কয়েকটি এলাকার কাঁচা রাস্তা বর্ষায় কর্দমাক্ত হয়ে পড়ে। কোথাও হাঁটুসমান কাদা, কোথাও রাস্তা চলাচলের অনুপযোগী। এসব পথ পেরিয়েই বিদ্যালয়ের জন্য খাবার নিয়ে যেতে হয় সরবরাহকারীদের।
স্কুল ফিডিংয়ের রুটি, ডিম ও কলা সরবরাহকারী সংস্থা ওসাকার প্রোগ্রাম ম্যানেজার আলিম আল রাজী মুক্তি বলেন, প্রতিদিন অটোভ্যান, পায়ে হেঁটে, মাথায় করে কিংবা নৌকায় করে বিদ্যালয়ে খাবার পৌঁছে দিতে হয়।
তিনি বলেন, “যোগাযোগব্যবস্থা যতই কঠিন হোক, নির্ধারিত সময়ে বিদ্যালয়ে খাবার পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।”
একইভাবে আকিজ কোম্পানি প্যাকেটজাত দুধ এবং প্রাণ কোম্পানি বিস্কুট সরবরাহ করছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
দরিদ্র পরিবারের শিশুদের আগ্রহ বাড়ছে
শরণখোলার বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকরা জানান, স্কুল ফিডিং কর্মসূচি চালুর পর শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি বেড়েছে। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের শিশুদের বিদ্যালয়ে পাঠানোর আগ্রহ বৃদ্ধি পেয়েছে।
সাউথখালী ইউনিয়নের এস বি তাফালবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি মো. বেলায়েত হোসেন, বকুলতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবুল বশার খান, উত্তর মালিয়া রাজাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাসির উদ্দিন মুক্তা, পশ্চিম কদমতলা কেএম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এফ এম শামীম আহসান, মধ্য নলবুনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নজরুল ইসলাম রুবেল, উত্তর খোন্তাকাটা মুকুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহ জামাল জুয়েল এবং ধানসাগর নলবুনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. হারুন অর রশীদ কর্মসূচির ইতিবাচক প্রভাবের কথা জানিয়েছেন।
তাঁদের ভাষ্য, টিফিনের সময় বিদ্যালয়ের আশপাশের দোকান থেকে অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার প্রবণতাও কমেছে। পুষ্টির ঘাটতি থাকা শিশুরা বিদ্যালয়ে খাবার পাওয়ার পর শ্রেণিকক্ষে তুলনামূলক বেশি মনোযোগী থাকছে।
নৌকায়ও যাচ্ছে শিশুদের খাবার
সুন্দরবনসংলগ্ন শরণখোলার অনেক বিদ্যালয় খাল ও নদীঘেরা এলাকায় অবস্থিত। বর্ষায় এসব এলাকার যোগাযোগ আরও কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে খাবার সরবরাহকারীদের কখনো নৌকায়, কখনো পায়ে হেঁটে দুর্গম পথ পাড়ি দিতে হয়।
বাংলাদেশ স্কাউট শরণখোলা উপজেলা কমিশনার মো. সোহরাব হোসেন ও উপজেলা কাব লিডার শিক্ষক নেতা মিজানুর রহমান বলেন, কর্মসূচির ফলে বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বেড়েছে। শিশুদের মধ্যে বিদ্যালয়মুখী হওয়ার আগ্রহও তৈরি হয়েছে।
শ্রেণিকক্ষে বাড়ছে মনোযোগ
শিক্ষকরা জানান, ক্ষুধা বা পুষ্টির ঘাটতি শিশুদের মনোযোগে প্রভাব ফেলতে পারে। বিদ্যালয়ে নির্ধারিত সময়ে পুষ্টিকর খাবার পাওয়ায় অনেক শিশু টিফিনের পরও শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ ধরে রাখতে পারছে।
শিক্ষকদের মতে, দরিদ্র পরিবারের যেসব শিশু অনেক সময় টিফিন ছাড়াই বিদ্যালয়ে থাকত, তাদের জন্য এই খাবার বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করেই সরবরাহ
বর্ষার দিনে কখনো বৃষ্টি, কখনো কাদা, আবার কখনো খালের পানি বেড়ে যাওয়ায় খাবার পরিবহন আরও কঠিন হয়ে পড়ে। তবু নির্ধারিত সময়ে খাবার পৌঁছে দিতে সরবরাহকারীদের প্রতিদিনই নতুন করে পথ খুঁজতে হয়।
কখনো অটোভ্যান কাঁচা রাস্তায় আটকে গেলে পায়ে হেঁটে খাবার নিয়ে যেতে হয়। আবার কোথাও সড়ক যোগাযোগ না থাকায় নৌকাই একমাত্র ভরসা।
এই বাস্তবতার মধ্যেও বিদ্যালয়ে টিফিন পৌঁছানোর কাজ চালু থাকায় শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টরা কর্মসূচির ধারাবাহিকতাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন।
শিশুদের হাতে পুষ্টির টিফিন, মুখে হাসি
দুপুরের টিফিনের সময় বিদ্যালয়ের পরিবেশও বদলে যায়। খাবারের প্যাকেট হাতে পেয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেখা যায় আনন্দ-উচ্ছ্বাস। কেউ দুধ হাতে নেয়, কেউ ডিম-বনরুটি বা কলা নিয়ে বসে পড়ে সহপাঠীদের সঙ্গে।
শিক্ষকরা বলছেন, বিদ্যালয়ে খাবার পাওয়ার বিষয়টি শিশুদের কাছে যেমন আনন্দের, তেমনি অভিভাবকদের কাছেও এটি স্বস্তির।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সুন্দরবনসংলগ্ন দুর্গম জনপদে শিশুদের বিদ্যালয়মুখী রাখা, পুষ্টির ঘাটতি কমানো এবং শিক্ষার ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে স্কুল ফিডিং কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
শরণখোলার কাদামাখা পথ, নদী-খাল আর বর্ষার বৈরী আবহাওয়ার বাধা পেরিয়ে প্রতিদিন যখন অটোভ্যান, নৌকা কিংবা মানুষের মাথায় করে বিদ্যালয়ে পৌঁছে যায় শিশুদের খাবার—তখন সেই খাবারের সঙ্গে পৌঁছে যায় আরেকটি বার্তা: দুর্গমতার কারণে যেন কোনো শিশুর শিক্ষা ও পুষ্টির অধিকার থেমে না থাকে।