শিরোনাম
◈ ঢাকায় ২০ মিলিমিটার বৃষ্টি, বইছে মৃদু তাপপ্রবাহও ◈ ডেঙ্গুতে দেশের প্রায় অর্ধেক মৃত্যু ঢাকা বিভাগে ◈ ইরান যুদ্ধের কারণে বাড়ছে তেলের দাম, যেভাবে লাভবান হচ্ছে দক্ষিণ আমেরিকার গায়ানা ◈ বাবা-মায়ের পর জাতিসংঘে ভাষণ দেবেন তারেক রহমান ◈ একাদশে ভর্তির প্রথম ধাপ থেকে ছিটকে পড়ল ১ লাখ ২৭ হাজার শিক্ষার্থী ◈ অটোরিকশার সঙ্গে সংঘর্ষের পর খাদে বাস, পটুয়াখালীতে প্রাণ গেল ৩ জনের ◈ শিগগিরই ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার কথা ভাবছে সরকার: অর্থমন্ত্রী ◈ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ফিরতে ইরানের ৩ শর্ত, মানলেই যুদ্ধ বন্ধ ◈ পরিবহন মালিক সমিতির জরুরি নির্দেশনা ◈ এবার কমলাপুর রেলস্টেশনে ককটেল বিস্ফোরণ

প্রকাশিত : ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৭:৫৫ সকাল
আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৮:৫২ সকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

৫০ কোটি টাকার ৮ ফুটওভার ব্রিজ, ব্যবহার করছেন না পথচারীরা

প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে রাজশাহী নগরীতে নির্মাণ করা হয়েছে আটটি ফুটওভার ব্রিজ। পথচারীদের নিরাপদ পারাপারের জন্য তৈরি এসব সেতুর অধিকাংশই এখন প্রায় জনশূন্য। নিচ দিয়ে সড়ক পারাপারেই স্বাচ্ছন্দ্য পথচারীদের, আর কোথাও কোথাও সেতুর ব্যবহার সীমিত হয়েছে সেলফি-টিকটক ভিডিওতে।

স্থানীয় বাসিন্দা, শিক্ষার্থী ও পথচারীদের অভিযোগ, প্রয়োজন ও ব্যবহারকারীর চলাচল যথাযথভাবে বিশ্লেষণ না করে সেতুগুলোর স্থান নির্বাচন করা হয়েছে। ফলে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলছে না।

advertisement

বিশেষজ্ঞদের মতে, পথচারীর স্বাভাবিক চলাচলের সঙ্গে সামঞ্জস্য না থাকলে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করে ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহারে মানুষকে অভ্যস্ত করা যায় না।

প্রায় ৫০ কোটি টাকায় ৮ ফুটওভার ব্রিজ

advertisement

রাজশাহী সিটি করপোরেশন (রাসিক) ২০২৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নগরীর আটটি ফুটওভার ব্রিজ সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য খুলে দেয়। ‘সমন্বিত নগর অবকাঠামো উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় দুটি প্যাকেজে এসব ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৫০ কোটি ৭২ লাখ টাকা।

রাসিক সূত্রে জানা যায়, ফুটওভার ব্রিজগুলোর নির্মাণকাজ পেয়েছিল মাসুদ স্টিল ডিজাইন বিডি লিমিটেড এবং এমএসসিএল অ্যান্ড এমএসডিবিএল। প্রতিটি ফুটওভার ব্রিজের উচ্চতা ৫ দশমিক ৮ মিটার এবং প্রস্থ ৩ দশমিক ৬ মিটার।

advertisement

নগরীর নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজ গেট, লক্ষ্মীপুর মিন্টু চত্বর, নওদাপাড়া বাজার, তালাইমারী মোড়, বিনোদপুর মোড়, অগ্রণী স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনে, মনিচত্বর এবং মিশন গার্লস স্কুলের সামনে এসব ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে।

নির্মাণ হয়েছে, ব্যবহার নেই

সরেজমিনে নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ ফুটওভার ব্রিজে পথচারীদের চলাচল খুবই কম। অনেক পথচারী সেতু ব্যবহার না করে সরাসরি সড়কের নিচ দিয়ে পার হচ্ছেন।

স্থানীয়দের ভাষ্য, রাজশাহী নগরীর অনেক সড়কে সবসময় তীব্র যানজট বা অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ থাকে না। ফলে ফুটওভার ব্রিজে উঠে আবার সিঁড়ি দিয়ে নামার চেয়ে নিচ দিয়ে সড়ক পার হওয়াকে তারা সহজ ও সময়সাশ্রয়ী মনে করছেন।

পথচারীরা জানান, অনেক সেতুর সিঁড়ি দীর্ঘ ও খাড়া। এতে বয়স্ক, শিশু, অসুস্থ ব্যক্তি এবং ভারী জিনিস বহনকারীদের জন্য সেতু ব্যবহার করা কষ্টকর। কিছু সিঁড়ি ও চলাচলের স্থানে টাইলস ব্যবহার করা হয়েছে, যা ভেজা অবস্থায় পিচ্ছিল হয়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

তালাইমারী এলাকার কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, তারা নিয়মিত ওই সড়ক ব্যবহার করলেও ফুটওভার ব্রিজে ওঠেন না। তাদের ভাষ্য, মাঝেমধ্যে কিছু শিক্ষার্থী সেতুর ওপর উঠে ছবি তোলেন কিংবা টিকটক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জন্য ভিডিও তৈরি করেন। তবে নিয়মিত পথচারী পারাপারে এর ব্যবহার খুবই কম।

যেখানে দরকার, সেখানে নেই

রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) সামনে নির্মিত ফুটওভার ব্রিজ নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। স্থানীয়দের দাবি, পথচারীদের চলাচলের প্রকৃত প্রবাহ বিবেচনায় নিয়ে সেতুটি তালাইমারী চারমুখী এলাকার সঙ্গে সংযোগ করে নির্মাণ করা হলে বেশি কার্যকর হতে পারত। বর্তমান অবস্থানে এটি সড়কের প্রয়োজনীয় অংশে সরাসরি পথচারী সংযোগ তৈরি করতে পারেনি বলে তাদের অভিযোগ।

রুয়েটের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী তানজিম বলেন, ‘রুয়েটের সামনে কোনো ফুটওভার ব্রিজের প্রয়োজন ছিল না। তারপরও এটি নির্মাণ করা হয়েছে। এই ফুটওভার ব্রিজ কেউ ব্যবহার করেন না। রাস্তাঘাট ভালো থাকায় আমাদের রাস্তা পারাপারে কোনো সমস্যা হয় না। জনগণের অর্থ অপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যয় না করে মানুষের প্রকৃত উপকার হয়—এমন কাজে মনোযোগ দেওয়া উচিত।’

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) বিনোদপুর গেটসংলগ্ন ফুটওভার ব্রিজ নিয়েও শিক্ষার্থীদের অসন্তোষ রয়েছে। তাদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল প্রবেশপথের কাছে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ও পথচারীর নিয়মিত চলাচল থাকলেও সেখানে সরাসরি সেতু নির্মাণ না করে কিছুটা দূরে এটি নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে প্রয়োজনের সময় শিক্ষার্থীরা সেটি ব্যবহার করছেন না।

রাবির ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী তাসনুবা বলেন, ‘বিনোদপুর গেটের পাশে না দিয়ে কিছুটা দূরে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের কারণ আমাদের জানা নেই। আমি কখনো এই ব্রিজ দিয়ে রাস্তা পার হইনি। কারণ এটি বিনোদপুর গেট থেকে অনেক দূরে এবং ব্যবহার করাও সুবিধাজনক নয়।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী সিয়াম বলেন, ‘ফুটওভার ব্রিজটি যেখানে নির্মাণ করা প্রয়োজন ছিল, সেখানে করা হয়নি। ফলে এটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও নগরীর পথচারীদের তেমন কোনো কাজে আসছে না। রাবি শিক্ষার্থী হিসেবে আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে একটি ফুটওভার ব্রিজ। কিন্তু সেখানে না দিয়ে যেখানে প্রয়োজন কম, সেখানে নির্মাণ করা হয়েছে।’

পরিকল্পনায় ঘাটতির কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু যানজট বা দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকলেই কোনো স্থানে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ করা যথেষ্ট নয়। পথচারীর সংখ্যা, যানবাহনের গতি ও চাপ, সড়কের প্রস্থ, আশপাশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক এলাকার অবস্থান, মানুষের স্বাভাবিক চলাচলের পথ এবং সেতুতে ওঠানামার সুবিধাসহ বিভিন্ন বিষয় বিশ্লেষণ করে স্থান নির্বাচন করতে হয়।

রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আবদুল ওয়াকিল বলেন, ‘রাজশাহী নগরীতে ফুটওভার ব্রিজের ব্যবহার দরকার ছিল কি না, সেটি আগে দেখতে হবে। যেটি আমাদের দরকার নেই, সেটি ব্যবহার করার প্রয়োজন হবে না। যখন এগুলোর প্রস্তাবনা দেওয়া হয়, সেখানেই ভুল ছিল। নিজেদের ইচ্ছেমতো পরিকল্পনা করা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ফুটওভার ব্রিজ সাধারণত গুরুত্বপূর্ণ বা ক্রিটিক্যাল পয়েন্টে দরকার হয়। সে ক্ষেত্রে যে পয়েন্টগুলো নির্বাচন করা হয়েছে, সেখানে মানুষ ব্যবহার করবে না—এটা স্বাভাবিক।

আবদুল ওয়াকিল আরও বলেন, ভবিষ্যতে এগুলোর প্রয়োজনীয়তা তৈরি হতে পারে। তবে বর্তমানে সব জায়গায় এগুলোর প্রয়োজন নেই। যেখানে এখন কোনো সমস্যা নেই, সেখানে আগাম সমাধানের নামে অবকাঠামো নির্মাণের যৌক্তিকতা কী—সেটি বিবেচনা করা দরকার।

তিনি বলেন, নির্মাণের সময় পরিকল্পনা ও পরিবহন প্রকৌশল বিশেষজ্ঞদের যথাযথভাবে সম্পৃক্ত করা না হলে এ ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে। এ কারণেই অনেক ফুটওভার ব্রিজ মানুষ ব্যবহার করছে না।

যা বলছেন কর্তৃপক্ষ

তবে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণে স্থান নির্বাচন নিয়ে প্রশ্নের সঙ্গে একমত নন রাজশাহী সিটি করপোরেশনের সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. এবিএম শরীফ উদ্দিন।

তিনি বলেন, আমরা যথাযথ স্থানেই ফুটওভার ব্রিজগুলো নির্মাণ করেছি। ঢাকা শহরে মানুষ এত যানজটের মধ্যেও ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার করে না। যানজট নিরসন হবে, এজন্যই এগুলো বানানো হয়েছে। আমরা মানুষকে এসব ব্যবহারে অভ্যস্ত করতে কাজ করছি। এগুলো ট্রাফিক কন্ট্রোল যারা করেন, তাদেরও বিষয়টি দেখা দরকার। নির্মাণে কোনো সমস্যা থাকলে প্রকৌশল বিভাগ তা ঠিক করে দেবে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, ফুটওভার ব্রিজগুলো ব্যবহারের উপযোগী করতে কী কী প্রয়োজন, সেগুলো যাচাই-বাছাই করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ব্রিজের নিচের অংশে যে টাইলস ব্যবহার করা হয়েছে, সেগুলো আগের ডিজাইন অনুযায়ী করা হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী এগুলোও সংস্কার করা হবে।

সূত্র: জাগো নিউস ২৪ 

  • সর্বশেষ